শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “তারপর ইন্দ্র, বায়ু প্রভৃতি দেবতারা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীহরির পরম কৃপায় পুনরুজ্জীবিত হয়েছিলেন। এইভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে দেবতারা যে সমস্ত অসুরেরা পূর্বে তাঁদের পরাস্ত করেছিল, তাদের প্রচণ্ডভাবে আঘাত করতে শুরু করেছিলেন। পরম শক্তিমান ইন্দ্র যখন ক্রুদ্ধ হয়ে বলি মহারাজকে হত্যা করার জন্য তাঁর হস্তে বজ্র গ্রহণ করেছিলেন, তখন অসুরেরা ‘হায়, হায়!’ বলে বিলাপ করতে শুরু করেছিল। মনস্বী এবং রণসজ্জায় সুসজ্জিত বলি মহারাজ যখন মহান যুদ্ধক্ষেত্রে ইন্দ্রের সম্মুখে উপস্থিত হয়েছিলেন, তখন বজ্রপাণি ইন্দ্র বলি মহারাজকে তিরস্কার করে বলেছিলেন, ‘ওর মূঢ়, কপট ব্যক্তি যেমন শিশুর চোখ বেঁধে তার ধন অপহরণ করে নেয়, তেমনই তুই মায়ার দ্বারা আমাদের পরাস্ত করার চেষ্টা করছিস, যদিও তুই জানিস যে আমরা ঐ সমস্ত মায়ার অধীশ্বর। যে সমস্ত মূর্খেরা যোগশক্তি অথবা জড় উপায়ের দ্বারা স্বর্গলোকে উন্নীত হতে চায়, অথবা স্বর্গলোক অতিক্রম করে চিজ্জগৎ প্রাপ্ত হতে চায় অথবা মুক্তিলাভ করতে চায়, আমি তাদের পাতাল থেকেও অধঃলোকে নিক্ষেপ করি। আজ, সেই শক্তিমান পুরুষ আমি শতপর্ব সমন্বিত বজ্রের দ্বারা তোর দেহ থেকে তোর মস্তক ছিন্ন করব। যদিও তুই বহু মায়া সৃষ্টি করতে পারিস, তবুও তুই মন্দবুদ্ধি। এখন তোর জ্ঞাতিবর্গ এবং বন্ধুবান্ধব সহ এই যুদ্ধক্ষেত্রে থাকার চেষ্টা কর।’ ”
বলি মহারাজ উত্তর দিলেন- “এই যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত সকলেই কালের নিয়ন্ত্রণাধীন এবং তাদের কর্ম অনুসারে তারা কীর্তি, জয়, পরাজয় এবং মৃত্যু ক্রমে ক্রমে প্রাপ্ত হবে। কালের গতি দর্শন করে বিবেকী ব্যক্তিরা বিভিন্ন পরিস্থিতির জন্য হরষিত হন না অথবা শোক করেন না। তাই, তুমি যেহেতু তোমার জয়ের কারণে হরষিত হচ্ছ, তাই তোমাকে খুব একটা বিচক্ষণ বলে মনে হয় না। তোমরা দেবতারা মনে কর যে তোমরাই হচ্ছ জয় এবং পরাজয়ের কারণ। তোমাদের এই মূর্খতায় সাধুরা তোমাদের জন্য শোক করেন। তাই তোমার বাক্য মর্মপীড়াদায়ক হলেও আমি তা গ্রাহ্য করি না।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “এইভাবে দেবরাজ ইন্দ্রকে তিরস্কার করে বীরমর্দন বলি মহারাজ নারাচ নামক বাণ তাঁর কর্ণ পর্যন্ত আকর্ষণ করে ইন্দ্রকে আঘাত করেছিলেন। তারপর তিনি পুনরায় কঠোর বাক্যে ইন্দ্রকে তিরস্কার করেছিলেন। যেহেতু বলি মহারাজের সেই তিরস্কার বাক্য ছিল সত্য, তাই দেবরাজ ইন্দ্র দুঃখিত না হয়ে, অঙ্কুশ-আহত হস্তীর মতো তাঁর সেই তিরস্কার সহ্য করেছিলেন। শত্রুদমনকারী ইন্দ্র যখন বলি মহারাজকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে অব্যর্থ বজ্রদণ্ড নিক্ষেপ করেছিলেন, তখন বলি মহারাজ ছিন্নপক্ষ পর্বতের মতো তাঁর বিমান সহ ভূতলে পতিত হয়েছিলেন। জম্ভাসুর যখন দেখল, তার সখা বলি ভূপতিত হয়েছে, তখন সে তার বন্ধুর প্রতি সৌহার্দ্য আচরণ করার জন্য তার শত্রু ইন্দ্রের সম্মুখে উপস্থিত হয়েছিল। মহাবলবান, সিংহবাহন জম্ভাসুর ইন্দ্রের সম্মুখে আগমন করে তার গদার দ্বারা ইন্দ্রের কন্ঠমূলে প্রবল আঘাত করেছিল। সে ইন্দ্রের হস্তীকেও প্রহার করেছিল। জম্ভাসুরের গদার আঘাতে ইন্দ্রের হস্তী অত্যন্ত ব্যথিত এবং ব্যাকুলিত হয়ে জানুর দ্বারা পৃথিবী স্পর্শ করে মূর্ছা প্রাপ্ত হয়েছিল। তারপর ইন্দ্রের সারথি মাতলি সহস্র অশ্ব যোজিত ইন্দ্রের রথ নিয়ে এসেছিল। ইন্দ্র তখন তাঁর হস্তী পরিত্যাগ করে রথে আরোহন করেছিলেন। মাতলির সেবার প্রশংসা করে অসুরশ্রেষ্ঠ জম্ভাসুর হেসেছিল। তবুও সে তার জ্বলন্ত শূলের দ্বারা মাতলিকে আঘাত করেছিল। সেই বেদনা দুঃসহ হলেও মাতলি ধৈর্য অবলম্বন করে সেই আঘাত সহ্য করেছিল, কিন্তু ইন্দ্র অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে বজ্রাঘাতে জম্ভাসুরের মস্তক ছিন্ন করেছিলেন।”
“নারদ মুনি যখন জম্ভাসুরের আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুবান্ধবদের জম্ভাসুরের মৃত্যু সংবাদ প্রদান করেছিলেন, তখন নমুচি, বল এবং পাক নামক তিনজন অসুর শ্রীঘ্রই সেই যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হয়েছিল। কর্কশ নিষ্ঠুর বাক্যের দ্বারা ইন্দ্রের মর্মস্থল বিদ্ধ করে সেই অসুরেরা বর্ষার ধারা যেভাবে পর্বতকে আচ্ছাদিত করে, ঠিক সেইভাবে বাণ বর্ষণ করে ইন্দ্রকে আচ্ছন্ন করেছিল। বল অসুর ক্ষিপ্র হস্তে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি সামলে নিয়ে, ইন্দ্রের এক হাজার অশ্বকে একই সময়ে ততগুলি বাণের দ্বারা বিদ্ধ করে আহত করেছিল। পাক নামক আর এক অসুর দুইশত বাণ যুগপৎ ধনুকে যোজন করে এবং মোচন করে সমস্ত সাজ-সরঞ্জাম সহ রথ এবং মাতলি উভয়কে পৃথকভাবে আবৃত করেছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে সেই ঘটনাটি বস্তুতই অত্যন্ত অদ্ভুত হয়েছিল। তারপর নমুচি নামক আর একটি অসুর জলপূর্ণ মেঘের মতো গর্জনকারী এবং অত্যন্ত শক্তিশালী পনেরটি স্বর্গপক্ষযুক্ত বাণের দ্বারা ইন্দ্রকে আঘাত করেছিল। অন্য অসুরেরা নিরন্তর বাণ বর্ষণের দ্বারা ইন্দ্রকে তাঁর রথ এবং সারথি সহ বর্ষাকালের সূর্যের মতো আচ্ছন্ন করেছিল। দেবতারা তাঁদের শত্রুর দ্বারা প্রবলভাবে প্রতিহত হয়ে এবং ইন্দ্রকে যুদ্ধক্ষেত্রে না দেখতে পেয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন। তাঁরা মাঝসমুদ্রে নায়কবিহীন ভগ্নপোত বণিকদের মতো বিলাপ করতে লাগলেন। তারপর ইন্দ্র নিজেকে শরজালের পঞ্জর থেকে মুক্ত করে তাঁর রথ, অশ্ব, ধ্বজা এবং সারথি সহ নির্গত হয়ে, রাত্রিশেষে সূর্যের মতো স্বীয় তেজে আকাশ, পৃথিবী এবং সমস্ত দিক বিকশিত করে শোভা পেতে লাগলেন। বজ্রধর ইন্দ্র তাঁর সৈন্যদের যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুদের দ্বারা অত্যন্ত নিপীড়িত দর্শন করে, অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে শত্রুদের হত্যা করার জন্য বজ্র উত্তোলন করেছিলেন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, দেবরাজ ইন্দ্র তাঁর বজ্রের দ্বারা বল এবং পাকের মস্তক তাদের আত্মীয়স্বজন ও অনুগামীদের সমক্ষে ছেদন করেছিলেন। তার ফলে সেই যুদ্ধক্ষেত্রে অত্যন্ত ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। হে রাজন্, বল এবং পাকের মৃত্যু দর্শন করে আর এক অসুর নমুচি অত্যন্ত শোকান্বিত ও বিদ্বেষযুক্ত হয়েছিল। তার ফলে সে ক্রোধান্বিত হয়ে ইন্দ্রকে বধ করার বহু চেষ্টা করতে লাগল। ক্রুদ্ধ হয়ে সিংহের মতো গর্জন করতে করতে নমুচি অসুর ঘন্টাযুক্ত লৌহময় শূল গ্রহণপূর্বক চিৎকার করে বলেছিল, ‘তুই এখন নিহত হলি!’ এইভাবে ইন্দ্রকে বধ করার জন্য তাঁর সম্মুখে উপস্থিত হয়ে তাঁর প্রতি তার অস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল।”
“হে রাজন্, দেবরাজ ইন্দ্র যখন সেই অত্যন্ত শক্তিশালী শূলটিকে জ্বলন্ত উল্কার মতো পতিত হতে দেখলেন, তখন তিনি তাঁর বাণের দ্বারা সেটি খণ্ড খণ্ড করেছিলেন। তারপর অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে তিনি তাঁর বজ্রের দ্বারা নমুচির মস্তক ছিন্ন করার জন্য তার গ্রীবাদেশে আঘাত করেছিলেন। দেবরাজ ইন্দ্র যদিও মহাবেগে সেই বজ্র নমুচির প্রতি নিক্ষেপ করেছিলেন, তবুও তার ত্বক পর্যন্ত তা ভেদ করতে পারেনি। যে বজ্র বৃত্রাসুরের দেহও ভেদ করেছিল, তা যে নমুচির গলার ত্বক পর্যন্ত ভেদ করতে পারল না, তা অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয়। ইন্দ্র তাঁর বজ্রকে শত্রুর দ্বারা প্রতিহত হয়ে ফিরে আসতে দেখে অত্যন্ত ভীত হয়েছিলেন। তিনি অত্যন্ত আশ্চর্যান্বিত হয়ে ভাবতে লাগলেন তা কোনও দৈব শক্তির প্রভাবে ঘটেছিল কি না।”
ইন্দ্র ভাবলেন- “পূর্বে, অনেক পর্বত যখন তাদের পাখার সাহায্যে আকাশে উড়ত এবং ভূতলে প্রবিষ্ট হয়ে প্রজাদের বিনাশ সাধন করত, তখন আমি এই বজ্রের দ্বারা তাদের পক্ষচ্ছেদন করেছিলাম। বৃত্রাসুর ছিলেন ত্বষ্টার তপস্যার সারস্বরূপ, তবুও এই বজ্র তাঁকে সংহার করেছিল। বস্তুতপক্ষে, কেবল তিনিই নন, অন্য বহু বীর যাঁদের ত্বক পর্যন্ত অন্য কোন অস্ত্রের দ্বারা আহত হত না, তাঁরা সকলেই এই বজ্রের দ্বারা নিহত হয়েছেন। কিন্তু এখন, সেই বজ্র এক তুচ্ছ অসুরের প্রতি নিক্ষিপ্ত হয়ে প্রতিহত হল। সুতরাং ব্রহ্মাস্ত্রের মতো হলেও তা এখন একটি সাধারণ দণ্ডের মতো অকিঞ্চিৎকর হয়েছে। তাই আমি আর এই বজ্র গ্রহণ করব না।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “ইন্দ্র যখন এইভাবে বিষাদগ্রস্ত হয়ে শোক করছিলেন, তখন একটি দৈববাণী হয়েছিল, “এই অসুর নমুচি কোন শুষ্ক অথবা আর্দ্র বস্তুর দ্বারা নিহত হবে না।”
সেই কন্ঠস্বর বলল, “হে ইন্দ্র, যেহেতু আমি এই অসুরকে বর দিয়েছি যে শুষ্ক অথবা আর্দ্র কোন অস্ত্রের দ্বারা তার মৃত্যু হবে না, তাই তাকে হত্যা করার জন্য তোমাকে অন্য কোন উপায় চিন্তা করতে হবে।”
“সেই দৈববাণী শুনে, কিভাবে সেই অসুরকে বধ করা যায় সেই কথা ইন্দ্র সমাহিত চিত্তে চিন্তা করতে লাগলেন। তখন তিনি দেখলেন যে, ফেনা হচ্ছে তার উপায়, কারণ তা শুষ্কও নয় এবং আর্দ্রও নয়। এইভাবে দেবরাজ ইন্দ্র শুষ্কও নয় এবং আর্দ্রও নয় এই প্রকার ফেনার অস্ত্রের দ্বারা নমুচির মস্তক ছেদন করেছিলেন। তখন সমস্ত ঋষিরা সেই মহাপুরুষ ইন্দ্রের প্রতি প্রসন্ন হয়ে পুষ্প বর্ষণ করেছিলেন এবং মালার দ্বারা তাঁকে আচ্ছাদিত করেছিলেন। বিশ্বাবসু এবং পরাবসু নামক দুই গন্ধর্ব-প্রধান পরম আনন্দে গান করতে লাগলেন, দেবদুন্দুভি বাজতে লাগল এবং অপ্সরাগণ মহা আনন্দে নৃত্য করতে লাগলেন। সিংহ যেভাবে মৃগসমূহকে বিনাশ করে, সেইভাবে বায়ু, অগ্নি, বরুণ প্রভৃতি দেবতারা প্রতিপক্ষ অসুরদের বধ করতে লাগলেন। হে রাজন্, ব্রহ্মা যখন দেখলেন যে, দানবকূল সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট হতে চলেছে, তখন তিনি দেবর্ষি নারদকে পাঠিয়েছিলেন। নারদ দেবতাদের দানব বিনাশ থেকে নিবৃত্ত করেছিলেন।”
দেবর্ষি নারদ বললেন- “তোমরা দেবতারা নারায়ণের বাহুর দ্বারা সুরক্ষিত এবং তাঁর কৃপায় তোমরা অমৃত লাভ করেছ। লক্ষ্মীদেবীর কৃপায় তোমরা সর্বতোভাবে যশস্বী হয়েছ। অতএব এই যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত হও।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “শ্রীনারদ মুনির বাণী মেনে নিয়ে দেবতারা তাঁদের ক্রোধ সংবরণ করে যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত হয়েছিলেন। তারপর তাঁদের অনুগামীদের দ্বারা প্রশংসিত হয়ে তাঁরা স্বর্গলোকে ফিরে গিয়েছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে যে সমস্ত অসুরেরা অবশিষ্ট ছিল, তারা নারদ মুনির আদেশে মরণাপন্ন বলি মহারাজকে অস্তগিরি নামক পর্বতে নিয়ে গিয়েছিল। যে সমস্ত দানব সৈন্যের মস্তক, দেহ এবং অঙ্গ একেবারে বিনষ্ট হয়নি, সেই পর্বতে শুক্রাচার্য তাদের সঞ্জীবনী মন্ত্রের দ্বারা পুনর্জীবিত করেছিলেন। বলি মহারাজ জগতের কার্যকলাপ সম্বন্ধে বিশেষভাবে বিচক্ষণ ছিলেন। তিনি যখন শুক্রাচার্যের কৃপায় তাঁর ইন্দ্রিয় এবং স্মৃতি ফিরে পেয়েছিলেন, তখন তিনি বুজতে পেরেছিলেন কি হয়েছিল। তাই যুদ্ধে পরাজিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি বিষাদগ্রস্ত হননি।”
একাদশ অধ্যায়- দেবরাজ ইন্দ্রের দৈত্যকুল সংহার
02 Mar 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, অষ্টম স্কন্ধ- সৃষ্টির সংবরণ