শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “ভগবান যখন গজেন্দ্রকে উদ্ধার করেছিলেন, তখন ব্রহ্মা, শিব আদি দেবতাগণ, ঋষিগণ এবং গন্ধর্বগণ ভগবানের এই কার্যের প্রশংসা করে ভগবান এবং গজেন্দ্র উভয়েরই উপর পুষ্পবর্ষণ করেছিলেন। তখন স্বর্গের দুন্দুভি বেজে উঠেছিল, গন্ধর্বেরা নৃত্যগীত করতে শুরু করেছিল এবং ঋষি, চারণ এবং সিদ্ধগণ পুরুষোত্তম ভগবানের স্তব করতে শুরু করেছিলেন। দেবল মুনির অভিশাপে গন্ধর্বশ্রেষ্ঠ রাজা হূহূ একটি কুমিরে পরিণত হয়েছিলেন। এখন, ভগবানের দ্বারা মুক্ত হওয়ার ফলে, তিনি এক অতি সুন্দর গন্ধর্বরূপ ধারণ করেছেন। কার কৃপায় তা হয়েছে তা বুঝতে পেরে, তিনি তৎক্ষণাৎ তাঁর মস্তকের দ্বারা প্রণতি নিবেদন করে উত্তমশ্লোক পরম নিত্য ভগবানের গুণকীর্তন করতে লাগলেন। ভগবানের অহৈতুকী কৃপায় তাঁর পূর্ব রূপ ফিরে পেয়ে, রাজা হূহূ ভগবানকে প্রদক্ষিণ করে এবং প্রণতি নিবেদন করে, ব্রহ্মা আদি দেবতাদের সমক্ষে গন্ধর্বলোকে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। তিনি তাঁর সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। ভগবানের করকমলের স্পর্শে গজেন্দ্র তৎক্ষণাৎ অজ্ঞানের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। তার ফলে তিনি ভগবানেই মতো পীতবাস এবং চতুর্ভুজ সমন্বিত হয়ে সারূপ্য মুক্তি লাভ করেছিলেন। এই গজেন্দ্র পূর্বজন্মে দ্রবিড় প্রদেশের অন্তর্গত পাণ্ড্য দেশের ইন্দ্রদ্যুম্ন নামক বৈষ্ণব রাজা ছিলেন। ইন্দ্রদ্যুম্ন মহারাজ গৃহস্থ-আশ্রম থেকে অবসর গ্রহণ করে মলয় পর্বতে গমন করেছিলেন এবং সেখানে একটি ছোট কুটির নির্মান করে তিনি তাঁর আশ্রম স্থাপন করেছিলেন। তিনি জটাধারী হয়ে সর্বদা তপস্যায় রত ছিলেন। এক সময় তিনি যখন মৌনব্রত অবলম্বন করে ভগবানের আরাধনা করছিলেন, তখন তিনি ভগবৎ প্রেমানন্দে পূর্ণরূপে মগ্ন হয়েছিলেন। মহারাজ ইন্দ্রদ্রুম্ন যখন ভগবানের পূজা করার সময় ধ্যানমগ্ন হয়েছিলেন, তখন অগস্ত্য মুনি শিষ্যপরিবৃত হয়ে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। যখন তিনি দেখলেন যে, মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্ন শিষ্টাচার অনুসারে তাঁকে অভ্যর্থনা না করে নির্জন স্থানে মৌন অবলম্বন করে বসে রয়েছেন, তখন তিনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন।”
অগস্ত্য মুনি তখন এইভাবে রাজাকে অভিশাপ দিয়েছিলেন- “এই রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন অসাধু, দুরাত্মা, অশিক্ষিত এবং ব্রাহ্মণের অবমাননাকারী। সুতরাং সে অজ্ঞানের অন্ধকারে প্রবেশ করুক এবং স্থূলবুদ্ধি হস্তীযোনি প্রাপ্ত হোক।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্, এইভাবে মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্নকে অভিশাপ দিয়ে, অগস্ত্য মুনি তাঁর শিষ্যগণ সহ সেই স্থান ত্যাগ করেছিলেন। রাজা যেহেতু ছিলেন ভগবদ্ভক্ত, তাই তিনি অগস্ত্য মুনির অভিশাপকে ভগবানের ইচ্ছা বলে বিবেচনা করে তা গ্রহণ করেছিলেন। তাই যদিও পরবর্তী জীবনে তিনি একটি হস্তী শরীর প্রাপ্ত হয়েছিলেন, তবুও ভগবান শ্রীহরির অর্চনার প্রভাবে তাঁর স্মরণ হয়েছিল কিভাবে ভগবানের পূজা করতে হয় এবং স্তব করতে হয়। কুমিরের আক্রমণ থেকে এবং কুমিরসদৃশ জড় জগতের বন্ধন থেকে গজেন্দ্রকে মুক্ত করে, ভগবান তাকে সারূপ্য মুক্তি প্রদান করেছিলেন। ভগবানের মহিমা কীর্তনকারী গন্ধর্ব, সিদ্ধ এবং অন্যান্য দেবতাদের সমক্ষে ভগবান গজেন্দ্রকে নিয়ে গরুড়ে আরোহণ করে তাঁর অতি অদ্ভুত ধামে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, আমি আপনার কাছে ভগবানের অদ্ভুত প্রভাবের কথা বর্ণনা করলাম, যা তিনি গজেন্দ্র-মোক্ষণের সময় প্রদর্শন করেছিলেন। হে কুরুশ্রেষ্ঠ, যাঁরা এই বর্ণনা শ্রবণ করেন, তাঁরা স্বর্গলোকে উন্নীত হওয়ার যোগ্য হন। এই বর্ণনা শ্রবণ করার ফলে তাঁরা ভক্তের খ্যাতি লাভ করেন, কলিযুগের কলুষ থেকে মুক্ত হন এবং তাঁরা আর কখনও দুঃস্বপ্ন দেখেন না। অতএব, দ্বিজাতি ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্যদের, বিশেষ করে ব্রাহ্মণ বৈষ্ণবদের মঙ্গলের জন্য সকালে ঘুম থেকে উঠে দুঃস্বপ্ন আদি অশুভের নিবৃত্তি সাধনের জন্য যথাযথভাবে এই গজেন্দ্র-মোক্ষণ লীলা কীর্তন করা উচিত। হে কুরুশ্রেষ্ঠ, সকলের পরমাত্মা পরমেশ্বর ভগবান এইভাবে প্রসন্ন হয়ে, সকলের সমক্ষে গজেন্দ্রকে আশীর্বাদ করে বলেছিলেন, যারা রাত্রির শেষে, খুব সকালে শয্যাত্যাগ করে সংযত ও একাগ্রচিত্ত হয়ে আমার এবং তোমার রূপ, এই সরোবর, এই পর্বত, গুহা, কানন, বেত্র, কীচক এবং বেণুগুল্ম, দেবদারু বৃক্ষ, ত্রিকূট পর্বতের স্বর্ণ, রৌপ্য এবং লৌহনির্মিত শৃঙ্গ যেগুলি আমার, ব্রহ্মার এবং শিবের আবাসস্থল, আমার প্রিয় ধাম ক্ষীর সমুদ্র, চিন্ময় কিরণে সর্বদা উদ্ভাসিত শ্বেতদ্বীপ, আমার শ্রীবৎস চিহ্ন, কৌস্তুভ মণি, বৈজয়ন্তী মালা, কৌমোদকী গদা, সুদর্শন চক্র ও পাঞ্চজন্য শঙ্খ, আমার বাহন পক্ষীরাজ গরুড়, আমার শয্যা শেষনাগ, আমার শক্তিরূপিণী লক্ষ্মীদেবী, ব্রহ্মা, নারদ মুনি, শিব, প্রহ্লাদ এবং মৎস, কূর্ম, বরাহ আদি আমার অবতার, আমার সর্ব-মঙ্গলময় অনন্ত লীলা যা শ্রবণকারীকে পবিত্রতা প্রদান করে, সূর্য, চন্দ্র, অগ্নি, ওঁকার মন্ত্র, পরম সত্য, মায়া, গো, ব্রাহ্মণ, ভক্তি, সোম ও কশ্যপের ধর্মপত্নী দক্ষকন্যাগণ, গঙ্গা, সরস্বতী, নন্দা ও যমুনা (কালিন্দী) নদী, ঐরাবত, ধ্রুব মহারাজ, সপ্তর্ষি এবং পুন্যবান মানবগণকে স্মরণ করে, তারা সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হয়। হে প্রিয় ভক্ত, যারা নিশান্তে শয্যাত্যাগ করে তোমার দ্বারা অর্পিত এই স্তোত্রের মাধ্যমে আমাকে স্তব করে, আমি তাদের জীবনান্তে আমার চিন্ময় ধামে তাদের নিত্য স্থিতি প্রদান করি।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “এই উপদেশ প্রদান করে ভগবান হৃষীকেশ তাঁর পাঞ্চজন্য শঙ্খ বাজিয়ে, ব্রহ্মা আদি দেবতাদের আনন্দিত করে গরুড়ের উপর আরোহন করলেন।”
চতুর্থ অধ্যায়- গজেন্দ্রের বৈকুন্ঠে প্রত্যাবর্তন
19 Feb 2026 Leave a comment
in অমল পুরান, অষ্টম স্কন্ধ- সৃষ্টির সংবরণ