শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্, সপ্তর্ষিমণ্ডলের ১৩,০০,০০০ যোজন ঊর্ধ্বে যে স্থান রয়েছে, পণ্ডিতেরা তাকে ভগবান শ্রীবিষ্ণুর পরম পদ বলেন। সেখানে উত্তানপাদের পুত্র মহাভাগবত ধ্রুব কল্পান্ত পর্যন্ত যাঁরা জীবিত থাকেন, সেই সমস্ত জীবদের জীবনরূপে এখনও অবস্থান করছেন। অগ্নি, ইন্দ্র, প্রজাপতি, কশ্যপ এবং ধর্ম সকলে সেখানে সমবেতভাবে বহু সম্মান সহকারে তাঁকে দক্ষিণে রেখে প্রদক্ষিণ করেন। ধ্রুব মহারাজের কার্যকলাপের মহিমা আমি পূর্বেই (চতুর্থ স্কন্ধে) বর্ণনা করেছি। ভগবানের পরম ইচ্ছার প্রভাবে ধ্রবলোক সমস্ত গ্রহ এবং নক্ষত্রের অবলম্বন স্তম্ভরূপে নিরন্তর নিশ্চলভাবে বিরাজ করছেন। অবিশ্রান্ত, অব্যক্ত পরম শক্তিমান কাল এই সমস্ত জ্যোতিষ্কদের নিরন্তর ধ্রুবলোকের চতুর্দিকে ভ্রমণ করাচ্ছেন। ধান মাড়াই করার সময় বলদদের যেমন মেটীস্তম্ভে, একটিকে স্তম্ভের নিকটে, একটিকে মধ্যে এবং তৃতীয়টিকে দূরবর্তী স্থানে সংযোজিত করা হয় এবং সেই পশুগুলি তাদের নিজ নিজ স্থান অতিক্রম না করে স্তম্ভের চতুর্দিকে মণ্ডলাকারে পরিভ্রমণ করে, তেমনই, শত সহস্র গ্রহ-নক্ষত্র ঊর্ধ্ব ও অধঃস্থান বিভাগ অনুসারে তাঁদের নিজ নিজ কক্ষপথে ধ্রুবলোকের চতুর্দিকে পরিভ্রমণ করেন। তাঁরা তাঁদের কর্মফল অনুসারে ভগবানের দ্বারা জড়া প্রকৃতিরূপ যন্ত্রে সংযোজিত হয়ে, ধ্রুবকে অবলম্বনপূর্বক বায়ুর দ্বারা সঞ্চালিত হয়ে কল্পান্ত কাল পযন্ত ধ্রুবলোকের চতুর্দিকে পরিক্রমা করেন, ঠিক যেমন আকাশে শত শত টন জল সমন্বিত মেঘ ভেসে বেড়ায় অথবা বিশাল শ্যেন পাখি তাদের কর্ম অবলম্বন করে নভোমণ্ডলে বিচরণ করে অথচ কখনও পতিত হয় না।”
“গ্রহ এবং নক্ষত্র সমন্বিত এই বিশাল যন্ত্রটি শিশুমার (শুশুক) নামক জলজন্তুর আকৃতির সদৃশ। তাঁকে কখনও কখনও অবতার বলে মনে করা হয়। মহান যোগীরা বাসুদেবের এই রূপের উপর ধ্যান করেন, কারণ তাঁর এই রূপটি দেখা যায়। সেই শিমুমারের মস্তক অধঃমুখে এবং দেহ কুণ্ডলীভূত। তাঁর পুচ্ছাগ্রে ধ্রুব, লাঙ্গুলে প্রজাপতি, অগ্নি, ইন্দ্র, ধর্ম এবং পুচ্ছমূলে ধাতা ও বিধাতা। কটিদেশে বসিষ্ঠ, অঙ্গিরা আদি সপ্তর্ষি। শিশুমারের শরীর দক্ষিণাবর্তে কুণ্ডলীভূত অবস্থায় রয়েছে। তাঁর ডান পাশে অভিজিৎ থেকে পুনর্বসু পর্যন্ত চৌদ্দটি নক্ষত্র এবং বাম পাশে পুষ্যা থেকে উত্তরাষাঢ়া পর্যন্ত চৌদ্দটি নক্ষত্র রয়েছে। কুণ্ডলীভূত দেহবিশিষ্ট শিশুমারের উভয় পার্শ্বে সমান সংখ্যক নক্ষত্র থাকার ফলে তাঁর ভারসাম্য বজায় থাকে। শিশুমারের পৃষ্টদেশে অজবীথী এবং তাঁর উদরে আকাশগঙ্গা বর্তমান। পুনর্বসু এবং পুষ্যা যথাক্রমে শিশুমারের দক্ষিণ ও বাম শ্রোণীদেশে আর্দ্রা ও অশ্লেষা দক্ষিণ ও বাম পদে, অভিজিৎ ও উত্তরাষাঢ়া দক্ষিণ ও বাম নাসিকায়, শ্রবণা ও পূর্বাষাঢ়া দক্ষিণ ও বাম চক্ষে, ধনিষ্ঠা ও মূল দক্ষিণ ও বাম কর্ণে, মঘা থেকে অনুরাধা পর্যন্ত দক্ষিণায়নে আটটি নক্ষত্র বাম পার্শ্বের অস্থিসমূহে এবং মৃগশীর্যা থেকে পূর্বভদ্র পর্যন্ত উত্তরায়ণের আটটি নক্ষত্র ডান পার্শ্বের অস্থিতে এবং শতভিষা ও জ্যেষ্ঠা তাঁর দক্ষিণ ও বাম স্কন্ধে সন্নিবেশিত রয়েছে। শিশুমারের উপরের চোয়ালে অগস্তি, নীচের চোয়ালে যমরাজ, মুখে মঙ্গল, উপস্থে শনি, গলার পৃষ্ঠদেশে বৃহস্পতি, বক্ষঃস্থলে আদিত্য, হৃদয়ে নারায়ণ, মনে চন্দ্র, নাভিতে শুক্র, স্তনে অশ্বিনীকুমারদ্বয়, প্রাণ ও অপানে বুধ, গলদেশে রাহু, সর্বাঙ্গে কেতু এবং রোমসমূহে তারাগণ সন্নিবেশিত রয়েছে।”
“হে রাজন্, এইভাবে যে শিশুমারের আকৃতি বর্ণিত হল, তাই ভগবানের সর্ব দেবতাময় রূপ। প্রভাতে, মধ্যাহ্নে এবং সায়াহ্নে মৌন হয়ে সেই রূপ নিরীক্ষণ করে নিম্নোক্ত মন্ত্রে তাঁর উপাসনা করা উচিত- ‘হে ভগবান, আপনি কালরূপে প্রকাশিত হয়েছেন। আপনি বিভিন্ন কক্ষপথে ভ্রমণশীল নক্ষত্রদের আশ্রয়, হে সর্ব দেবাধিপতি, হে পরম পুরুষ, আমি আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি এবং আপনার ধ্যান করি।’ শিশুমাররূপী ভগবান শ্রীবিষ্ণুর শরীর সমস্ত দেবতা, নক্ষত্র এবং গ্রহদের আশ্রয়। যিনি প্রভাতে, মধ্যাহ্নে এবং সন্ধ্যায়, দিনে তিনবার এই মন্ত্র উচ্চারণ করে ভগবানের আরাধনা করেন, তিনি অবশ্যই সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হবেন। কেউ যদি তাঁর এই রূপকে কেবল প্রণতি নিবেদন করেন এবং প্রতিদিন তিনবার তাঁর রূপের ধ্যান করেন, তা হলে তাঁর সমস্ত পাপ নষ্ট হয়ে যাবে।”
ত্রয়োবিংশতি অধ্যায়- শিশুমার চক্র
02 Nov 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, পঞ্চম স্কন্ধ- কর্মবাসনা