মহারাজ পরীক্ষিৎ শ্রীল শুকদেব গোস্বামীকে জিজ্ঞাসা করলেন- “হে প্রভু, পরম শক্তিমান সূর্যদেব ধ্রুবলোক এবং সুমেরু পর্বতকে তাঁর দক্ষিণে রেখে ধ্রুবলোক প্রদক্ষিণ করেন। অথচ সেই সময় আবার তিনি সুমেরু এবং ধ্রুবলোককে তাঁর বামদিকে রেখে রাশিগণের অভিমুখে অগ্রসর হন। সূর্য যুগপৎ সুমেরু এবং ধ্রুবলোককে বামে এবং দক্ষিণে রেখে অগ্রসর হচ্ছেন, তা কিভাবে মেনে নেওয়া যায়?”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী স্পষ্টভাবে উত্তর দিলেন- “কুমোরের ঘূর্ণায়মান চক্রে ছোট ছোট পিপীলিকাদের যেমন চক্রের ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশে চক্রের গতি থেকে ভিন্ন ভিন্ন গতিবিশিষ্ট হতে দেখা যায়, তেমনই, নক্ষত্র এবং রাশিগণ সুমেরু এবং ধ্রুবলোককে দক্ষিণে রেখে কালচক্রে ভ্রমণ করে এবং ক্ষুদ্র পিপীলিকা সদৃশ সূর্য ও অন্যান্য গ্রহগুলিও তার সঙ্গে ভ্রমণ করে। কিন্তু সূর্য এবং অন্যান্য গ্রহ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাশিতে এবং নক্ষত্রে দেখা যায়। তা ইঙ্গিত করে যে, তাদের গতি রাশি এবং কালচক্রের গতি থেকে ভিন্ন। জগতের আদি কারণ ভগবান নারায়ণ। বেদজ্ঞ মহাত্মারা বেদস্তুতির দ্বারা তাঁর উপাসনা করলে, তিনি সমস্ত লোকের মঙ্গলের জন্য এবং কর্ম শুদ্ধির জন্য এই জগতে সূর্যরূপে অবতরণ করেছেন। তিনি নিজেকে বারোটি ভাগে বিভক্ত করে বসন্ত আদি ছয় ঋতু সৃষ্টি করেছেন। এইভাবে তিনি শীত, উষ্ণ আদি ঋতুর গুণসমূহ সৃষ্টি করেছেন। বর্ণাশ্রম ধর্ম অনুসারে মানুষ সাধারণত সূর্যদেবরূপী ভগবান নারায়ণের উপাসনা করেন। গভীর শ্রদ্ধা সহকারে বেদোক্ত অগ্নিহোত্রাদি নানাবিধ কর্মের দ্বারা এবং অষ্টাঙ্গ-যোগের দ্বারা পরমাত্মারূপে তাঁরা ভগবানের উপাসনা করেন। এইভাবে তাঁরা অনায়াসে জীবনের পরম লক্ষ্য প্রাপ্ত হন। সূর্যদেব, যিনি হচ্ছেন নারায়ণ বা বিষ্ণু, তিনি সমগ্র জগতের আত্মাস্বরূপ। তিনি স্বর্গ ও মর্তের মধ্যবর্তী অন্তরীক্ষের মধ্যস্থলে কালচক্রস্থ রাশিতে অবস্থিত হয়ে, রাশির নাম অনুযায়ী বারোটি বিভিন্ন নাম গ্রহণ করেন। সেই বারোটি মাসের সমন্বয়কে বলা হয় সংবৎসর। চন্দ্রের গণনা অনুসারে শুক্ল এবং কৃষ্ণ- এই দুই পক্ষ নিয়ে এক মাস হয়। তা পিতৃলোকের এক দিন এবং রাত্রি। সৌর গণনা অনুসারে সোয়া দুই নক্ষত্রে এক মাত্র। সূর্যদেবের দুই মাস ভ্রমণে এক ঋতু হয় এবং তাই ঋতুর পরিবর্তনকে সংবৎসরের দেহের অংশ বলে বিবেচনা করা হয়। এইভাবে সূর্যদেব যে সময়ে নভোমণ্ডলের অর্ধাংশে ভ্রমণ করেন, সেই সময়কে বলা হয় অয়ন। সূর্যদেব তঁর মন্দ, ক্ষিপ্র ও সমান গতির দ্বারা যে কাল পর্যন্ত স্বর্গমণ্ডল, ভূমণ্ডল এবং নভোমণ্ডল- এই তিন মণ্ডলকে সর্বতোভাবে অতিক্রম করেন অর্থাৎ প্রদক্ষিণ করেন, সেই পরিমিত সময়কে পণ্ডিতেরা সংবৎসর, পরিবৎসর, ইড়াবৎসর, অনুবৎসর ও বৎসর- এই পাঁচটি নামে অভিহিত করেন।”
“সূর্য কিরণের ১,০০,০০০ যোজন ঊর্ধ্বে রয়েছেন চন্দ্র, যিনি সূর্যের থেকেও ধ্রুততম গতিতে ভ্রমণ করেন। চন্দ্র দুই পক্ষে সূর্যের সংবৎসরের সমান দূরত্ব অতিক্রম করেন, সোয়া দুই দিনে সূর্যের এক মাসের পথ অতিক্রম করেন এবং এক দিনে সূর্যে এক পক্ষের সমান দূরত্ব অতিক্রম করেন। শুক্লপক্ষে প্রতিদিন চন্দ্রের কলা বর্ধিত হয় এবং তখন দেবতাদের দিন এবং পিতৃদের রাত্রি হয়। চন্দ্রের কৃষ্ণপক্ষে দেবতাদের রাত্রি হয় এবং পিতাদের দিন হয়। এইভাবে চন্দ্র ত্রিশ মূহূর্তে (সারাদিনে) এক-এক নক্ষত্র অতিক্রম করেন। চন্দ্র শস্যবৃদ্ধিকারী অমৃতময় শীতল কিরণের উৎস এবং তাই চন্দ্রদেবকে সমস্ত জীবের প্রাণ বলে মনে করা হয়। ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত জীবেদের মধ্যে প্রধান বলে তাকে বলা হয় জীব। চন্দ্র সমস্ত শক্তিতে পূর্ণ হওয়ার ফলে ভগবানের প্রভাবের প্রতীক। চন্দ্র মনের অধিষ্ঠাতা বলে মনোময়। তিনি সমস্ত ঔষধি এবং বৃক্ষ-লতাকে শক্তি প্রদান করেন বলে অন্নময় এবং তিনি তিনি সমস্ত জীবের জীবনস্বরূপ বলে তিনি অমৃতময়। চন্দ্র সমস্ত দেবতা, পিতৃ, মানুষ, ভূত, পশু, পক্ষী, সরীসৃপ, বৃক্ষ, লতা আদি সমস্ত জীবের প্রসন্নতা বিধান করেন। চন্দ্রের উপস্থিতিতে সকলেই পরিতৃপ্ত হয়, তাই চন্দ্রকে বলা হয় সর্বময়।”
“চন্দ্রমণ্ডলের ২,০০,০০০ যোজন উপরে অনেকগুলি নক্ষত্র রয়েছে। ভগবানের ইচ্ছাক্রমে তারা কালচক্রে যোজিত। তাঁরা সুমেরুর দক্ষিণ দিকে ভ্রমণ করে এবং তাদের গতি সূর্যের গতি থেকে ভিন্ন। অভিজিৎ আদি এই রকম আটাশটি গুরুত্বপূর্ণ নক্ষত্র রয়েছে। সেই নক্ষত্রমণ্ডলের ২,০০,০০০ যোজন ঊর্ধ্বে শুক্রগ্রহ বর্তমান। সূর্যের দ্রুত, মন্থর এবং সমান গতি অনুসারে ঐ গ্রহ কখনও সূর্যের সঙ্গে সমানভাবে, কখনও পশ্চাতে, কখনও বা অগ্রে গমন করেন। যে গ্রহ বৃষ্টির প্রতিবন্ধক, শুক্র সেই গ্রহের প্রভাব নাশ করেন। তাই তাঁর উপস্থিতির ফলে বৃষ্টি হয় এবং তাই তিনি এই ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত প্রাণীদের পক্ষে সর্বদা হিতকর বলে মনে করা হয়। পণ্ডিতেরা সেই কথা স্বীকার করেছেন।”
“বুধকে শুক্রেরই মতো বলে বর্ণনা করা হয়েছে। কারণ বুধও কখনও কখনও সূর্যের পিছনে, কখনও সামনে এবং কখনও একসঙ্গে ভ্রমণ করেন। শুক্র গ্রহের ১৬,০০,০০০ মাইল ঊর্ধ্বে, অর্থাৎ ভূতল থেকে ৭২,০০,০০০ মাইল ঊর্ধ্বে চন্দ্রতনয় বুধ বিরাজ করেন। ইনি প্রায় সর্বদাই ব্রহ্মাণ্ড-বাসীদের মঙ্গল বিধান করেন, কিন্তু যখন সূর্যের সঙ্গ পরিত্যাগ করেন, তখন প্রবল ঝড়-ঝঞ্ঝা, জলশূণ্য মেঘ, অর্থাৎ অনাবৃষ্টি অথবা অতিবৃষ্টি-জনিত ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন।”
“বুধের ১৬,০০,০০০ মাইল ঊর্ধ্বে, অর্থাৎ ভূতল থেকে ৮৮,০০,০০০ মাইল ঊর্ধ্বে মঙ্গলগ্রহ অবস্থিত। এই গ্রহের গতি যদি বক্র না হয়, তা হলে উনি তিন-তিন পক্ষে এক-একটি করে বারোটি রাশি অতিক্রম করেন। এই গ্রহ প্রায় সর্বদাই দুঃখজনক অশুভ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন।”
“মঙ্গল গ্রহের ১৬,০০,০০০ মাইল ঊর্ধ্বে, অর্থাৎ পৃথিবীর ১,০৪,০০,০০০ মাইল ঊর্ধ্বে বৃহস্পতি অবস্থিত, যিনি এক পরিবৎসরে এক-একটি রাশি অতিক্রম করেন। তাঁর গতি যদি বক্র না হয়, তা হলে তিনি প্রায়ই ব্রাহ্মণকুলের শুভাকাঙ্ক্ষী হন।”
“বৃহস্পতির ১৬,০০,০০০ মাইল ঊর্ধ্বে অর্থাৎ পৃথিবী থেকে ১,২০,০০,০০০ মাইল ঊর্ধ্বে শনিগ্রহ অবস্থিত, যিনি এক একটি রাশিতে ত্রিশ মাস ধরে অবস্থান করে ত্রিশ অনুবৎসরে বারোটি রাশি পরিভ্রমণ করেন। এই গ্রহ সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের জন্য অত্যন্ত অশুভ।”
“শনির থেকে ৮৮,০০,০০০ মাইল ঊর্ধ্বে, অর্থাৎ পৃথিবী থেকে ২,০৮,০০,০০০ মাইল ঊর্ধ্বে সপ্তর্ষিগণ বিরাজ করছেন। তাঁরা সর্বদা সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডবাসীদের মঙ্গল কামনা করতে করতে ভগবান শ্রীবিষ্ণুর পরম ধাম ধ্রবলোক প্রদক্ষিণ করছেন।”
দ্বাবিংশতি অধ্যায়- গ্রহগণের কক্ষপথ
30 Oct 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, পঞ্চম স্কন্ধ- কর্মবাসনা