মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন- “প্রজারা যখন এইভাবে মহা-পরাক্রমশালী রাজা পৃথুর মহিমা কীর্তন করছিলেন, তখন সেখানে সূর্যের মতো তেজস্বী চারজন কুমার এসে উপস্থিত হলেন। সমস্ত যোগশক্তির ঈশ্বর সেই চারজন কুমার গ্রহলোক-সমূহকে পবিত্র করে যখন আকাশ থেকে অবতরণ করছিলেন, তখন তাঁদের উজ্জ্বল জ্যোতি দর্শন করে, রাজা ও তাঁর অনুচরেরা তাঁদের চিনতে পেরেছিলেন। চার কুমারদের দর্শন করে, পৃথু মহারাজ তাঁদের স্বাগত জানাবার জন্য অত্যন্ত উৎকন্ঠিত হয়েছিলেন। তাই রাজা তৎক্ষণাৎ তাঁর অমাত্যগণ সহ উত্থিত হয়েছিলেন, যেমন যেভাবে বদ্ধ জীবের ইন্দ্রিয়গুলি জড়া প্রকৃতির গুনের দ্বারা আকৃষ্ট হয়। যখন সেই মহর্ষিগণ শাস্ত্রবিধি অনুসারে তাঁদের যে স্বাগত জানানো হয়েছিল তা স্বীকার করে, রাজার দেওয়া আসন গ্রহণ করলেন তখন মহারাজ পৃথু তাঁদের গৌরবের বশীভূত হয়ে, বিনয়াবনত মস্তকে তাঁদের পূজা করেছিলেন। তারপর রাজা কুমারদের পাদোদক তাঁর নিজের মস্তকে সিঞ্চন করেছিলেন। সেই প্রকার শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণের দ্বারা কিভাবে একজন মহাত্মাকে সম্মান করতে হয়, তা রাজা একজন আদর্শ ব্যক্তিরূপে শিক্ষা দিয়েছিলেন। সেই চারজন মহর্ষি ছিলেন শিবের অগ্রজ এবং তাঁরা তখন স্বর্ণ-সিংহাসনে উপবেশন করেছিলেন, তখন তাঁরা যজ্ঞবেদিতে ঠিক জ¦লন্ত অগ্নির মতো প্রতিভাত হচ্ছিলেন। পৃথু মহারাজ গভীর নম্রতা ও শ্রদ্ধা সহকারে অত্যন্ত সংযতভাবে বলতে শুরু করেছিলেন- হে প্রিয় মহর্ষিগণ! আপনারা সৌভাগ্যের মূর্তবিগ্রহ। আপনাদের দর্শন যোগীদেরও দুর্লভ। মানুষ কদাচিৎ আপনাদের দর্শন করতে পারে। আমি জানি না এমন কি শুভ কার্য আমি করেছিলাম, যার ফলে আমি আপনাদের দর্শন পেলাম। যাঁর উপর ব্রাহ্মণ ও বৈষ্ণবেরা প্রসন্ন হন, তিনি ইহলোক ও পরলোকে অত্যন্ত দুর্লভ যে-কোন বস্তু প্রাপ্ত হতে পারেন। কেবল তাই নয়, ব্রাহ্মণ ও বৈষ্ণবদের সঙ্গে থাকেন যে সর্ব-মঙ্গলময় শিব ও বিষ্ণু, তাঁরাও তাঁর প্রতি প্রসন্ন হন। যদিও আপনারা সমস্ত লোকে বিচরণ করেন, তবুও কেউই আপনাদের দেখতে পায় না, ঠিক যেমন সকলের হৃদয়ে সাক্ষীরূপে বিরাজ করলেও পরমাত্মাকে কেউই জানতে পারে না। এমন কি ব্রহ্মা এবং শিবও পরমাত্মাকে জানতে পারেন না। গৃহাসক্ত ব্যক্তি যদি নির্ধনও হন, তবুও তাঁর গৃহে সাধু সমাগম হলে তিনি ধন্য হন। সেই গৃহস্বামী ও তাঁর সেবক সেই মহান অতিথিকে জল, আসন ও স্বাগত জানাবার সামগ্রী প্রদান করে ধন্য হন এবং সেই গৃহও ধন্য হয়। পক্ষান্তরে, যে গৃহস্থের গৃহে ভগবানের ভক্তের চরণ পড়ে না এবং সেখানে সেই চরণ ধোয়ার জল থাকে না, সেই গৃহ যদি সমস্ত ঐশ্বর্য এবং জাগতিক উন্নতিতে পরিপূর্ণও হয়, তবুও তা বিষধর সর্পসঙ্কুল বৃক্ষের মতো। পৃথু মহারাজ চতুঃসনদের দ্বিজশ্রেষ্ঠ বলে সম্বোধন করে স্বাগত জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন- আপনারা আপনাদের জন্ম থেকে নিষ্ঠা সহকারে ব্রহ্মচর্য ব্রত পালন করেছেন এবং যদিও আপনারা মুক্তির পন্থা সম্বন্ধে সম্পূর্ণরূপে অবগত, তবুও আপনারা ছোট বালকের মতো রয়েছেন। পৃথু মহারাজ ঋষিদের কাছে সেই প্রকার ব্যক্তিদের সম্বন্ধে প্রশ্ন করেছিলেন, যারা তাদের পূর্বকৃত কর্মের ফলে, এই ভয়ঙ্কর জড় জগতের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। ইন্দ্রিয়তৃপ্তি সাধনই যাদের একমাত্র লক্ষ্য, তারা কি কোন রকম সৌভাগ্য লাভ করতে পারে।”
“আপনারা সর্বদা চিন্ময় আনন্দে মগ্ন, তাই আপনাদের কুশল অথবা অকুশল সম্বন্ধে প্রশ্ন করা উচিত নয়। মনোধর্ম-প্রসূত শুভ ও অশুভ আপনাদের মধ্যে নেই। আমি নিশ্চিতভাবে জানি যে, আপনাদের মতো মহর্ষিরা সংসাররূপী দাবানলে সন্তপ্ত ব্যক্তিদের একমাত্র সুহৃৎ। তাই আমি আপনাদের কাছে প্রশ্ন করতে চাই, কিভাবে আমরা অচিরে এই জড় জগতে আমাদের জীবনের পরম উদ্দেশ্য-সাধন করতে পারি। পরমেশ্বর ভগবান সর্বদাই তাঁর বিভিন্ন অংশ জীবদের উন্নতিসাধনে অত্যন্ত আগ্রহী এবং তাদের বিশেষ মঙ্গলের জন্য, তিনি আপনাদের মতো স্বরূপসিদ্ধ ব্যক্তিরূপে পৃথিবীর সর্বত্র পরিভ্রমণ করেন।”
মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন- “ব্রহ্মর্ষি সনৎকুমার পৃথু মহারাজের সারগর্ভ, উপযুক্ত, স্বল্পাক্ষর ও শ্রুতিমধুর বাক্য শ্রবণ করে পরম প্রসন্নতা সহকারে ঈষৎ হেসে বলতে শুরু করলেন- হে পৃথু মহারাজ! আপনি অত্যন্ত সুন্দর প্রশ্ন করেছেন। এই প্রকার প্রশ্ন সমস্ত জীবের পক্ষে লাভপ্রদ; বিশেষ করে সর্বদা অন্যদের হিতাকাঙ্ক্ষী আপনার মতো ব্যক্তি তা উত্থাপন করেছেন। যদিও আপনি সব কিছু জানেন, তবুও আপনি এই প্রশ্ন করেছেন, কারণ এটিই হচ্ছে সাধুদের আচরণ। এই প্রকার বুদ্ধি আপনার মতো ব্যক্তিরই উপযুক্ত। যখন ভগবদ্ভক্তদের সমাবেশ হয়, তখন তাঁদের আলোচনা, প্রশ্ন ও উত্তর শ্রোতা ও বক্তা উভয়েরই অভিলষিত হয়। তাই এই প্রকার সমাগম সকলের পক্ষেই মঙ্গলজনক এবং প্রকৃত সুখদায়ক।”
“হে রাজন্! পরমেশ্বর ভগবানের পাদপদ্মের মহিমা কীর্তনে আপনি ইতিমধ্যেই অনুরক্ত। এই প্রকার অনুরাগ অত্যন্ত দুর্লভ, কিন্তু কেউ যখন ভগবানের প্রতি এই প্রকার অবিচলিত শ্রদ্ধা লাভ করে, তখন আপনা থেকেই তার অন্তরের সমস্ত কামবসনা বিধৌত হয়। শাস্ত্রে পূর্ণরূপে বিচারের দ্বারা স্থিরীকৃত হয়েছে যে, মানব-সমাজের কল্যাণের চরম লক্ষ্য হচ্ছে দেহাত্মবুদ্ধিতে আসক্ত-রহিত হওয়া এবং নির্গুণ ও চিন্ময় পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি গভীর অনুরাগ লাভ করা। পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি ভক্তি করার মাধ্যমে, তার সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা ও জীবনে ভক্তিযোগের পন্থা প্রয়োগ করার দ্বারা যোগেশ্বর ভগবানের আরাধনা এবং ভগবানের মহিমা শ্রবণ ও কীর্তন করার ফলে, ভগবানের প্রতি আসক্তি বর্ধিত হয়। এই সমস্ত কার্য পরম পবিত্র। পারমার্থিক জীবনে উন্নতিসাধন করতে হলে, ইন্দ্রিয়তৃপ্তি পরায়ণ ও অর্থলোলুপ ব্যক্তিদের সঙ্গ পরিত্যাগ করতে হয়। কেবল সেই প্রকার ব্যক্তিকেই নয়, এমন কি যারা তাদের সঙ্গে সঙ্গ করে, তাদের সঙ্গও পরিত্যাগ করতে হয়। মানুষের জীবনকে এমনভাবে গড়ে তোলা উচিত, যাতে ভগবান শ্রীহরির মহিমারূপ অমৃত পান না করে সে শান্তিতে থাকতে পারে না। এইভাবে ইন্দ্রিয়সুখ-ভোগের প্রতি বিরক্ত হয়ে, পারমার্থিক উন্নতিসাধন করা যায়। পারমার্থিক উন্নতিসাধনে যিনি আগ্রহী, তাঁর পক্ষে অবশ্যই অহিংসা, আচার্যের পদাঙ্ক অনুসরণ, সর্বদা পরমেশ্বর ভগবানের অমৃতময় লীলা স্মরণ, বিষয় বাসনারহিত হয়ে শাস্ত্রের বিধিনিষেধ পালন, এগুলি অবশ্য কর্তব্য। এইভাবে ভগবদ্ভক্তির অনুশীলন করার সময়, কখনও অপরের নিন্দা করা উচিত নয়। ভক্তের কর্তব্য সরল জীবন যাপন করা এবং বিরোধী তত্ত্বের দ্বৈতভাবের দ্বারা বিচলিত না হওয়া। তাঁর কর্তব্য হচ্ছে সেগুলি সর্বদা সহ্য করতে চেষ্টা করা। ভক্তের কর্তব্য নিরন্তর ভগবানের দিব্য গুণাবলী শ্রবণ দ্বারা ক্রমশ ভগবদ্ভক্তি বৃদ্ধি করা। ভগবানের লীলাসমূহ ভক্তের কর্ণভূষণ-সদৃশ। ভগবানের প্রতি প্রেমময়ী সেবা সম্পাদনের দ্বারা এবং জড়া প্রকৃতির গুণের অতীত হওয়ার দ্বারা, অনায়াসে চিন্ময় পরমেশ্বর ভগবানে স্থির হওয়া যায়। শ্রীগুরুদেবের কৃপায় পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি নৈষ্ঠিকী রতিলাভ করার ফলে এবং জ্ঞান ও বৈরাগ্যের উদয় হওয়ার ফলে, জীব শরীরের অন্তঃস্থলে স্থিত হয়ে এবং পঞ্চভূতের দ্বারা আচ্ছাদিত হয়ে, তার ভৌতিক পরিবেশকে দগ্ধীভূত করে, ঠিক যেমন কাষ্ঠ থেকে উৎপন্ন অগ্নি সেই কাষ্ঠকেই ভষ্মীভূত করে দেয়। কেউ যখন সমস্ত জড় বাসনারহিত হন এবং সমস্ত জড় গুণ থেকে মুক্ত হন, তখন তিনি বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণভাবে সম্পাদিত কার্যের মধ্যে কোন পার্থক্য দেখেন না। আত্ম-উপলব্ধির পূর্বে, আত্মা ও পরমাত্মার মধ্যে যে পার্থক্য ছিল, তা আর তখন থাকে না। ঠিক যেমন স্বপ্ন ভেঙ্গে গেলে, স্বপ্ন ও স্বপ্নদ্রষ্টার মধ্যে পার্থক্য থাকে না। আত্মা যখন ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ করতে চায়, তখন সে বিভিন্ন বাসনা সৃষ্টি করে এবং সেই কারণে সে উপাধিযুক্ত হয়। কিন্তু আত্মা যখন চিন্ময় স্থিতিতে অবস্থিত হয়, তখন তার ভগবানের ইচ্ছা পূর্ণ করা ব্যতীত আর অন্য কোন কার্যে রুচি থাকে না। বিভিন্ন কারণের ফলে মানুষ নিজের ও অন্যদের মধ্যে পার্থক্য দর্শন করে, ঠিক যেমন জল, তেল অথবা দর্পণে একই শরীরের প্রতিবিম্ব ভিন্ন ভিন্ন রূপে দৃষ্ট হয়। মানুষের মন ও ইন্দ্রিয় যখন সুখভোগের জন্য ইন্দ্রিয়ের বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়, তখন মন বিক্ষুব্ধ হয়। নিরন্তর ইন্দ্রিয় বিষয়ের চিন্তা করার ফলে, জীবের প্রকৃত চেতনা প্রায় বিলুপ্ত হয়, ঠিক যেমন হ্রদের তীরস্থিত কুশাদি তৃণ ধীরে ধীরে হৃদের জল শোষণ করে নেয়। জীব যখন তার মূল চেতনা থেকে ভ্রষ্ট হয়, তখন সে তার পূর্বস্থিতি স্মরণ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে অথবা তার বর্তমান স্থিতি বুঝতে পারে না। স্মৃতি যখন হারিয়ে যায়, তখন অর্জিত জ্ঞান এক ভ্রান্ত আধারের ভিত্তিতে আহরণ হয়। যখন তা হয়, তখন পণ্ডিতেরা তাকে আত্মার বিনাশ বলে মনে করেন। আত্ম উপলব্ধির থেকে অধিক প্রিয়তর অন্য কোন বস্তু আছে বলে মনে করাই, নিজের হিতসাধনে সব চাইতে বড় প্রতিবন্ধক। কিভাবে ধন উপার্জন করা যায় এবং ইন্দ্রিয়তৃপ্তি সাধনে ব্যবহার করা যায়, সেই চিন্তায় নিরন্তর মগ্ন থাকলে মানব-সমাজের প্রত্যেকের স্বার্থ বিনষ্ট হয়। জ্ঞান ও ভক্তিরহিত হওয়ার ফলে, বৃক্ষ অথবা পাথর যোনিতে প্রবিষ্ট হতে হয়। যারা অজ্ঞান-সমুদ্র উত্তীর্ণ হতে ঐকান্তিকভাবে অভিলাষী, তাদের কখনও তমোগুণের সঙ্গ করা উচিত নয়, কারণ ভোগবাদী কার্যকলাপ ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষের সব চাইতে বড় প্রতিবন্ধক। চতুর্বর্গের মধ্যে- অর্থাৎ ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষের মধ্যে, মোক্ষকেই অত্যন্ত নিষ্ঠা সহকারে গ্রহণ করা উচিত। অন্য তিনটি বর্গ প্রকৃতির কঠোর নিয়মে, মৃত্যুর দ্বারা বিনাশশীল। আমরা নিম্নতর স্তরের জীবনের থেকে উচ্চতর স্তরে জীবনের পার্থক্য নিরূপণ করে তাকে আশীর্বাদ বলে মনে করি, কিন্তু আমাদের মনে রাখা উচিত যে, এই প্রকার ভেদভাব জড়া প্রকৃতির গুণের মিথষ্ক্রিয়ার সম্পর্কে বিদ্যমান থাকে। প্রকৃতপক্ষে জীবনের এই সমস্ত অবস্থার কোন স্থায়ী অস্তিত্ব নেই, কারণ পরম নিয়ন্তার দ্বারা তা সবই বিনষ্ট হয়ে যাবে।”
সনৎকুমার রাজাকে উপদেশ দিলেন- “অতএব, হে পৃথু মহারাজ, যিনি স্থাবর ও জঙ্গম প্রতিটি জীবের শরীরে জীবাত্মার সঙ্গে বিরাজ করেন, সেই পরমেশ্বর ভগবানকে জানতে চেষ্টা করুন। জীবাত্মা স্থূল জড় শরীর এবং প্রাণ ও বুদ্ধির দ্বারা নির্মিত সূক্ষ্ম শরীরের দ্বারা পূর্ণরূপে আচ্ছাদিত। পরমেশ্বর ভগবান এই শরীরের ভিতর কার্য ও কারণের সঙ্গে একাগ্রীভূত হয়ে, নিজেকে প্রকাশ করেন, কিন্তু যিনি বিবেকের দ্বারা মায়াকে অতিক্রম করেছেন এবং যার ফলে রজ্জুকে সর্প বরে মনে করার ভ্রম দূর হয়, তিনি বুঝতে পারেন যে, পরমাত্মা চিরকাল জড় সৃষ্টির অতীত এবং তিনি বিশুদ্ধ অন্তরঙ্গা শক্তিতে অবস্থিত। এইভাবে ভগবান সমস্ত জড় কলুষের অতীত এবং কেবল তাঁরই শরণাগত হওয়া উচিত। যে-সমস্ত ভক্তরা নিরন্তর ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের অঙ্গুষ্ঠির সেবায় যুক্ত হয়েছেন, তাঁরা অনায়াসে সকাম কর্মের বাসনাস্বরূপ গ্রন্থির বন্ধন থেকে মুক্ত হন। যেহেতু তা অত্যন্ত দুঃসাধ্য, তাই জ্ঞানী ও যোগী আদি অভক্তরা ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের বৃত্তি রোধ করার কঠোর চেষ্টা করা সত্ত্বেও সফল হতে পারে না। তাই আপনাকে উপদেশ দেওয়া হচ্ছে, বসুদেবের তনয় শ্রীকৃষ্ণের প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত হোন। অজ্ঞানের সমুদ্র পার হওয়া অত্যন্ত কঠিন, কারণ তা ভয়ঙ্কর নক্র-মকরসংকুল। অভক্তরা যদিও সেই সমুদ্র উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন ও তপস্যা করে, তবুও আমি আপনাকে বলছি যে, সেই সমুদ্র উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য কেবল পরমেশ্বর ভগবানের শ্রপাদ-পদ্মরূপী নৌকার আশ্রয় অবলম্বন করুন। এই সমুদ্র যদিও অত্যন্ত দুস্তর, তবুও তাঁর শ্রীপাদপদ্মের আশ্রয় অবলম্বন করে আপনি অনায়াসে সমস্ত বিপদ অতিক্রম করতে পারবেন।”
মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন- “ব্রহ্মার পুত্র আত্ম-তত্ত্ববেত্তা সনৎকুমারের দ্বারা এইভাবে পূর্ণরূপে পারমার্থিক জ্ঞানের আলোক প্রাপ্ত হয়ে, পৃথু মহারাজ নিম্নলিখিত শব্দে তাদের আরাধনা করেছিলেন।”
রাজা বললেন- “হে ব্রাহ্মণ! হে শক্তিমান! পূর্বে ভগবান শ্রীবিষ্ণু আমার প্রতি তাঁর অহৈতুকী কৃপা প্রদর্শন করেছিলেন এবং তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, আপনারা আমার গৃহে আসবেন। তাঁর সেই আশীর্বাদ পূর্ণ করার জন্য আপনারা সকলে এখানে এসেছেন। হে ব্রাহ্মণ! আপনারা ভগবানেরই মতো কৃপালু, তাই আপনারা তাঁর আদেশ পূর্ণরূপে পালন করেছেন। আপনাদের কিছু দান করা আমার কর্তব্য, কিন্তু আমার কাছে যা রয়েছে, তা সাধুদের উচ্ছিষ্ট-স্বরূপ। অতএব আপনাদের আমি কি দান করব? অতএব হে ব্রাহ্মণগণ! আমার জীবন, পত্নী, পুত্র, গৃহ, গৃহস্থালির সমস্ত সামগ্রী, আমার রাজ্য, বল, ভূমি এবং বিশেষরূপে আমার রাজকোষ সবই আমি আপনাদের নিবেদন করলাম।
যেহেতু বৈদিক জ্ঞানসমন্বিত ব্যক্তিই কেবল সেনাপতি, রাজ্যশাসক, দণ্ডদাতা ও সমগ্র গ্রহলোকের অধিপতি হওয়ার যোগ্য, তাই পৃথু মহারাজ সব কিছু কুমারদের নিবেদন করেছিলেন। ব্রাহ্মণের কৃপায় ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রেরা তাদের আহার প্রাপ্ত হয়। ব্রাহ্মণেরাই কেবল তাঁদের নিজেদের সম্পত্তি ভোগ করেন, তাঁদের নিজেদের বস্ত্র পরিধান করেন এবং তাঁদের নিজেদের সম্পত্তি অপরকে দান করেন।”
পৃথু মহারাজ বললেন- “যাঁরা ভগবানের সম্বন্ধে জ্ঞান প্রদান করার দ্বারা আত্ম-উপলব্ধির পন্থা বিশ্লেষণ করে অন্তহীন সেবা করেছেন এবং বৈদিক প্রমাণের উপর পূর্ণ বিশ্বাস-সমন্বিত যাঁদের ব্যাখ্যা আমাদের জ্ঞানের আলোকে উদ্ভাসিত করেছে, তাঁদের সন্তুষিবিধানের জন্য অঞ্জলি ভরে কেবল জল দেওয়া ছাড়া আর আমাদের কি দেওয়ার আছে? এই প্রকার মহাপুুরুষেরা তাঁদের নিজেদের কার্যকলাপের দ্বারাই কেবল সন্তুষ্ট হতে পারেন, যা তাঁদের অন্তহীন করুণার ফলে, মানব-সমাজে ছড়িয়ে রয়েছে।”
মহর্ষি মৈত্রেয় বলতে লাগলেন- “এইভাবে পৃথু মহারাজের দ্বারা পূজিত হয়ে, ভগবদ্ভক্তির উপদেষ্টা চার কুমারগণ তাঁর প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছিলেন। তাঁরা রাজার গুণের প্রশংসা করতে করতে সর্বসমক্ষে আকাশমার্গে উত্থিত হয়েছিলেন। পৃথু মহারাজ তাঁর অধ্যাত্ম উপলব্ধিতে স্থির হওয়ার ফলে, মহাপুরুষদের মধ্যে প্রধান ছিলেন। পারমার্থিক উপলব্ধিতে পূর্ণরূপে সাফল্য লাভ করার ফলে, তিনি আত্মতৃপ্ত হয়েছিলেন। আত্মতুষ্ট হওয়ার ফলে পৃথু মহারাজ সময়, স্থান, শক্তি ও আর্থিক স্থিতি অনুসারে যথাসম্ভব পূর্ণতা সহকারে তাঁর কর্তব্য সম্পাদন করেছিলেন। এই সমস্ত কার্যে তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল, পরম সত্য পরমেশ্বর ভগবানের সন্তুষ্টিবিধান করা। এইভাবে তিনি তাঁর কর্তব্যকর্ম সম্পাদন করেছিলেন। পৃথু মহারাজ নিজেকে জড়া প্রকৃতির অতীত পরমেশ্বর ভগবানের নিত্যদাসরূপে সম্পূর্ণরূপে সমর্পণ করেছিলেন। তাঁর ফলে তাঁর সমস্ত কর্মের ফল ভগবানের অর্পিত হয়েছিল এবং তিনি সর্বদা নিজেকে সর্বেশ্বর ভগবানের দাসরূপে মনে করতেন। পৃথু মহারাজ, যিনি তাঁর সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধির ফলে অত্যন্ত ঐশ্বর্যশালী ছিলেন, তিনি একজন গৃহস্থরূপে গৃহে অবস্থান করছিলেন। যেহেতু তিনি কখনও তঁর ঐশ্বর্য নিজের ইন্দ্রিয়তৃপ্তি সাধনের জন্য ব্যবহার করতে চাননি, তাই তিনি সর্বদা অনাসক্ত ছিলেন, ঠিক যেমন সূর্য সমস্ত অবস্থাতেই অপ্রভাবিত থাকে। ভগবদ্ভক্তির মুক্ত অবস্থায় স্থিত হয়ে, পৃথু মহারাজ কেবল ভগবৎ সেবারূপ কর্মই সম্পাদন করেননি, তাঁর পত্নী অর্চির গর্ভে তিনি পাঁচটি পুত্রসন্তানও উৎপাদন করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, তিনি তাঁর বাসনা অনুসারে, তাঁর সেই পুত্রদের লাভ করেছিলেন। বিজিতাশ্ব, ধূম্রকেশ, হর্যক্ষ, দ্রবিণ ও বৃক নামক পাঁচটি পুত্র উৎপাদন করার পরেও, পৃথু মহারাজ এই পৃথিবীর উপর রাজ্য শাসন করতে লাগলেন। অন্য সমস্ত লোকের শাসনকারী দেবতাদের সমস্ত গুণ তিনি ধারণ করেছিলেন।”
“যেহেতু পৃথু মহারাজ পূর্ণরূপে পরমেশ্বর ভগবানের ভক্ত ছিলেন, তাই তিনি সমস্ত নাগরিকদের স্ব-স্ব বাসনা অনুসারে তাদের প্রসন্নতা-বিধান করার মাধ্যমে, ভগবানের সৃষ্টি রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। সেই জন্য পৃথু মহারাজ তাঁর বাণী, মন, কর্ম ও স্নিগ্ধ আচরণের দ্বারা সর্বতোভাবে তাদের প্রসন্ন রাখতেন। পৃথু মহারাজ চন্দ্রলোকের রাজা সোমরাজের মতো প্রসিদ্ধ হয়েছিলেন। সূর্য যেমন তাপ ও আলোক বিতরণ করে এবং সেই সঙ্গে জল শোষণ করে, ঠিক তেমনই পৃথু মহারাজ কঠোর শাসন-ব্যবস্থার দ্বারা প্রজাদের কাছ থেকে কর গ্রহণ করে, যথাসময়ে তাদের তা দান করতেন। পৃথু মহারাজ এতই প্রবল এবং শক্তিমান ছিলেন যে, তাঁর আদেশ অমান্য করার ক্ষমতা কারোর ছিলে না। তিনি ছিলেন অগ্নির মতো দুর্ধর্ষ তেজস্বী এবং দেবরাজ ইন্দ্রের মতো দুর্জয় বলশালী। অপর পক্ষে, পৃথু মহারাজ আবার পৃথিবীর মতো ক্ষমাশীল এবং স্বর্গের মতো সকলের অভীষ্টপ্রদ ছিলেন। মেঘ যেমন বারি বর্ষন করে সকলের তৃপ্তিসাধন করে, তেমনই পৃথু মহারাজ প্রজাদের অভাব মোচন করে তাদের সন্তোষ-বিধান করতেন। তিনি ছিলেন সমুদ্রের মতো গম্ভীর এবং তাই তাঁর অভিপ্রায় কেউ জানতে পারত না এবং তাঁর সংকল্প ছিল পর্বতরাজ সুমেরুর মতো অটল। পৃথু মহারাজের বুদ্ধিমত্তা ও বিদ্যা ছিল ঠিক যমরাজের মতো। তাঁর ঐশ্বর্য ছিল হিমালয় পর্বতের মতো, যেখানে সব রকম মূল্যবান মণিরত্ন ও ধাতু সঞ্চিত রয়েছে। তাঁর ধন-সম্পদ ছিল স্বর্গের কোষাধ্যক্ষ কুবেরের মতো এবং গোপন রহস্য সংরক্ষণে তিনি ছিলেন ঠিক বরুণদেবের মতো। দেহের শক্তি এবং ইন্দ্রিয়ের শক্তিতে মহারাজ পৃথু ছিলেন সর্বত্র গমনক্ষম বায়ুর মতো শক্তিশালী। তাঁর অসহ্য বিক্রম ছিল শিব বা সদাশিবের অংশ সর্ব-শক্তিমান রুদ্রের মতো। সৌন্দর্যে তিনি ছিলেন কন্দর্পের মতো এবং তিনি ছিলেন সিংহের মতো নির্ভীক। বাৎসল্যে তিনি ছিলেন স্বায়ম্ভুব মনুর মতো এবং তাঁর নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা ছিল ব্রহ্মার মতো। তাঁর ব্যক্তিগত আচরণে পৃথু মহারাজ সমস্ত সৎ গুণাবলী প্রদর্শন করেছিলেন এবং তাঁর আধ্যাত্মিক জ্ঞান ছিল ঠিক বৃহস্পতির মতো। আত্ম-সংযমে তিনি ছিলেন স্বয়ং ভগবানের মতো। ভক্তির ব্যাপারে তিনি ছিলেন গাভী, গুরু ও ব্রাহ্মণদের প্রতি আসক্ত ভক্তদের মহান অনুগামী। তিনি ছিলেন লজ্জাশীল এবং তাঁর আচরণ ছিলে অত্যন্ত বিনম্র। আর পরোপকারের জন্য তিনি এমনভাবে কার্য করতেন যে, মনে হত তিনি যেন তাঁর ব্যক্তিগত স্বার্থে কার্য করছেন। সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের উচ্চ, নিম্ন ও মধ্যবর্তী লোকের সর্বত্র পৃথু মহারাজের যশ উচ্চস্বরে কীর্তিত হয়েছিল এবং স্ত্রী ও সাধুরা তাঁর মহিমা শ্রবণ করেছিলেন, যা ছিল শ্রীরামচন্দ্রের কীর্তির মতোই মধুর।”
দ্বাবিংশতি অধ্যায়- চতুঃসনের সঙ্গে পৃথু মহারাজের মিলন
25 Aug 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, চতুর্থ স্কন্ধ- ভগবদ্ভক্তদের প্রতি অনুগ্রহ