সপ্তম অধ্যায়- দক্ষের যজ্ঞ অনুষ্ঠান

মৈত্রেয় ঋষি বললেন- “হে মহাবাহো বিদুর! ব্রহ্মার অনুনয়ের দ্বারা পরিতুষ্ট হয়ে, তার উত্তরে শিব হাস্যপূর্বক বলেছিলেন, ‘হে পূজ্য পিতা ব্রহ্মা! দেবতারা যে অপরাধ করেছেন, সেই জন্য আমি কিছু মনে করি না। কারণ এই দেবতারা শিশুসুলভ নির্বোধ, তাঁদের অপরাধের গুরুত্ব আমি তেমন দিই না। তাঁদের সংশোধন করার জন্যই কেবল আমি দন্ড দিয়েছি। যেহেতু দক্ষের মস্তক দগ্ধীভূত হয়ে ভস্মসাৎ হয়েছে, তাই তিনি একটি ছাগলের মস্তক প্রাপ্ত হবেন। ভগ নাম দেবতা মিত্রের নেত্রের দ্বারা তাঁর যজ্ঞভাগ দেখতে পাবেন। পূষা কেবল তাঁর শিষ্যদের দন্তের দ্বারা চর্বণ করতে পারবেন, তিনি যখন একলা থাকবেন, তখন তাঁকে কেবল পিষ্টক ভোজন করেই সন্তুষ্ট হতে হবে। কিন্তু যে-সমস্ত দেবতারা আমাকে যজ্ঞভাগ দিতে সম্মত হয়েছেন, তাঁদের সর্বাঙ্গের ক্ষত থেকে তাঁরা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবেন। যাঁদের বাহু কেটে গেছে, তাঁদের অশ্বিনীকুমারদের বাহুর দ্বারা কাজ করতে হবে এবং যাঁদের হাত কাটা গেছে, তাঁদের পূষার হস্তের দ্বারা কর্ম করতে হবে। পুরোহিতদেরও সেইভাবে কার্য করতে হবে, আর ভৃগু ছাগলের দাড়ি প্রাপ্ত হবেন।”
মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন- “হে বিদুর! সেখানে উপস্থিত সমস্ত ব্যক্তিরা বরদানকারীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ শিবের বাণী শ্রবণ করে অন্তরে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তার পর মহর্ষি-প্রধান ভৃগু শিবকে যজ্ঞস্থলে আসতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। এইভাবে ঋষিগণ, শিব ও ব্রহ্মা সহ দেবতারা সেই স্থানে গিয়েছিলেন যেখানে মহাযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। সব কিছু ঠিক শিবের নির্দেশ অনুসারে সম্পন্ন হওয়ার পর, দক্ষের দেহে যজ্ঞের নিমিত্ত পশুর মস্তক যোজনা করা হয়েছিল। যখন দক্ষের শরীরে পশুর মস্তক সংযোজিত হয়েছিল, তখনই তিনি চেতনা প্রাপ্ত হয়ে সুপ্তোত্থিতের মতো জাগরিত হয়েছিলেন এবং তাঁর সম্মুখে শিবকে দন্ডায়মান দেখতে পেয়েছিলেন। তখন বৃষধ্বজ শিবকে দর্শন করে, শিবদ্বেষী দক্ষের কলুষিত হৃদয় তৎক্ষণাৎ শরৎকালীন সরোবরের মতো নির্মল হয়েছিল। রাজা দক্ষ শিবের স্তব করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর কন্যা সতীর মৃত্যুর কথা স্মরণ হওয়ায় তাঁর চোখ অশ্রুধারায় পূর্ণ হয়েছিল এবং গভীর শোকে তাঁর কন্ঠ রুদ্ধ হয়েছিল এবং তিনি স্তব করতে সমর্থ হননি। সেই সময় রাজা দক্ষ স্নেহ ও অনুরাগের দ্বারা বিহ্বল হয়েছিলেন এবং তখন তাঁর শুদ্ধ বুদ্ধি জাগরিত হয়েছিল। অতি কষ্টে তিনি তাঁর মনকে শান্ত করেছিলেন, তাঁর ভাবাবেগ সংযত করেছিলেন এবং শুদ্ধ চেতনায় তিনি শিবের স্তব করতে শুরু করেছিলেন।”
রাজা দক্ষ বললেন- “হে ভগবান শিব! আমি আপনার চরণে মহা অপরাধ করেছি, কিন্তু আপনি এতই কৃপাময় যে, আপনার অনুগ্রহ থেকে আমাকে বঞ্চিত করার পরিবর্তে, আপনি আমাকে দণ্ডদান করে আমার প্রতি অসীম কৃপা প্রদর্শন করেছেন। আপনি এবং শ্রীবিষ্ণু কখনও অযোগ্য ব্রাহ্মণদেরও উপেক্ষা করেন না। অতএব যজ্ঞ অনুষ্ঠানে যুক্ত আমাকে আপনি কেন উপেক্ষা করবেন? হে মহান এবং শক্তিশালী শিব! বিদ্যা, তপ, ব্রত এবং আত্ম-তত্ত্বপরায়ণ ব্রাহ্মণদের রক্ষা করার জন্য প্রথমে ব্রহ্মা তাঁর মুখ থেকে আপনাকে সৃষ্টি করেছিলেন। গোপালক যেমন দণ্ড হস্তে গাভীদের রক্ষা করে, তেমনই আপনিও ব্রাহ্মণদের সমস্ত বিপদ থেকে রক্ষা করার ফলে ধর্মকে রক্ষা করেন। আমি আপনার পূর্ণ মহিমা জানতাম না। তাই সভাস্থলে আপনার উপর আমি দুর্বাক্যরূপ বাণ বর্ষণ করেছিলাম, যদিও আপনি তা গ্রাহ্য করেননি। আপনার মতো পরম পূজ্য ব্যক্তিকে অবজ্ঞা করার ফলে, আমি নরকে অধঃপতিত হতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু আপনি কৃপাপূর্বক আমাকে দণ্ডদান করে রক্ষা করেছেন। আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করি যে, আপনি কৃপাপূর্বক প্রসন্ন হোন, কারণ আমার কথা দ্বারা আপনাকে প্রসন্ন করার ক্ষমতা আমার নেই।”
মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন- “এইভাবে শিব দক্ষকে ক্ষমা করলে এবং রাজা দক্ষ ব্রহ্মার আজ্ঞায় উপাধ্যায় ও ঋত্বিকগণ সহ পুনরায় যজ্ঞকার্য আরম্ভ করলেন। তার পর, যজ্ঞকার্য শুরু করার জন্য ব্রাহ্মণেরা প্রথমে বীরভদ্র এবং শিবের অন্যান্য প্রেত পার্ষদদের স্পর্শজনিত দোষের শুদ্ধির জন্য ব্যবস্থা করেছিলেন। তার পর তাঁরা অগ্নিতে পুরোডাশ নামক আহুতি দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন।”
“প্রিয় বিদুর! বিশুদ্ধ চিত্তে রাজা দক্ষ যজুর্বেদীয় মন্ত্র সহ যজ্ঞে ঘৃত আহুতি দেওয়া মাত্রই, ভগবান শ্রীবিষ্ণু তাঁর আদি নারায়ণরূপে সেখানে প্রকট হয়েছিলেন। ভগবান নারায়ণ বিশাল পক্ষযুক্ত তার্ক্ষ্য বা গরুড়ের স্কন্ধে আরূঢ় ছিলেন। ভগবান সেখানে আবির্ভূত হওয়া মাত্রই সমস্ত দিক আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল এবং তার ফলে সেখানে উপস্থিত ব্রহ্মা এবং অন্য সকলের জ্যোতি খর্ব হয়েছিল। তাঁর অঙ্গকান্তি শ্যামবর্ণ, বস্ত্র স্বর্ণের মতো পীত এবং তাঁর কিরীট সূর্যের মতো দেদীপ্যমান। তাঁর কেশরাশি ভ্রমরের মতো নীলাভ এবং তাঁর মুখমন্ডল কর্ণকুণ্ডল-শোভিত। তাঁর আট হাতে শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম, ধনুক, বাণ, ঢাল ও তরবারি এবং তাঁর বাহুসকল বলয়, অঙ্গদ আদি স্বর্ণ আভরণে সজ্জিত। তাঁর সারা অঙ্গ পুষ্পিত বৃক্ষের মতো শোভা ধারণ করেছিল। ভগবান শ্রীবিষ্ণুর বক্ষস্থলে লক্ষ্মীদেবী এবং কন্ঠে বনফুলের মালা বিরাজিত ছিল, তাই তাঁকে আসাধারণ সৌন্দর্যমন্ডিত দেখাচ্ছিল। তাঁর মুখমন্ডল মধুর হাসির দ্বারা সুশোভিত ছিল, যা সারা জগৎকে, বিশেষ করে ভক্তদের মোহিত করতে পারে। তাঁর উভয় পার্শ্বে শ্বেত হংসের মতো শ্বেত চামর আন্দোলিত হচ্ছে, এবং তাঁর মাথার উপরে চন্দ্রের মতো শ্বেত চন্দ্রাতপ বিরাজ করছে। ভগবান শ্রীবিষ্ণুকে সমাগত দেখে ব্রহ্মা, শিব, গন্ধর্ব এবং সেখানে উপস্থিত সমস্ত দেবতাগণ সকলে তাঁদের সশ্রদ্ধ দণ্ডবৎ প্রণতি নিবেদন করেছিলেন। নারায়ণের দেহনির্গত রশ্মিচ্ছটায় সকলের প্রভাব ম্লান হয়েছিল এবং সকলেই নীরব হয়েছিলেন। সম্ভ্রম এবং শ্রদ্ধায় ভয়ভীত হয়ে, উপস্থিত সকলেই কৃতাঞ্জলিপুটে অবনত মস্তকে অধোক্ষজ পরমেশ্বর ভগবানের স্তব করতে উদ্যত হয়েছিলেন। যদিও ব্রহ্মাদি দেবতারাও ভগবানের অনন্ত মহিমা অনুমান করতে অসমর্থ, তবুও ভগবানের কৃপায় তাঁরা তাঁর চিন্ময় রূপ দর্শন করতে পেরেছিলেন। কেবল তাঁর সেই কৃপার প্রভাবেই তাঁরা তাঁদের সামর্থ্য অনুসারে তাঁর প্রতি স্তব নিবেদন করতে পেরেছিলেন।”
“যখন ভগবান বিষ্ণু যজ্ঞে নিবেদিত আহুতি গ্রহণ করলেন, তখন প্রজাপতি দক্ষ অত্যন্ত আনন্দ সহকারে তাঁর স্তুতি করতে আরম্ভ করেছিলেন। পরমেশ্বর ভগবান প্রকৃতপক্ষে সমস্ত যজ্ঞের ঈশ্বর এবং সমস্ত প্রজাপতিদের গুরু এবং তিনি নন্দ ও সুনন্দ আদি পার্ষদের দ্বারাও সেবিত।”
পরমেশ্বর ভগবানকে সম্বোধন করে দক্ষ বললেন- “হে প্রভু! আপনি কল্পনাপ্রসূত সমস্ত অবস্থার অতীত। আপনি সম্পূর্ণরূপে চিন্ময়, নির্ভয় এবং সর্ব অবস্থাতেই আপনি মায়াধীশ। যদিও আপনি জড়া প্রকৃতি আবির্ভূত হন, কিন্তু আপনি মায়াতীত। আপনি সর্বদাই জড় কলুষ থেকে মুক্ত কেননা আপনি সম্পূর্ণরূপে স্বতন্ত্র।”
ভগবানকে সম্বোধন করে ঋত্বিকেরা বললেন- “হে ভগবান! আপনি জড় কলুষের অতীত, শিবের অনুচরদের অভিশাপের ফলে আমরা সকাম কর্মে আসক্ত হয়েছি এবং তার ফলে আমরা এখন অধঃপতিত হয়েছি এবং আপনার বিষয়ে তাই আমরা কিছুই জানি না। যজ্ঞ করার অজুহাতে আমরা এখন বৈদিক জ্ঞানের তিনটি বিভাগের অনুশাসনে জড়িয়ে পড়েছি। আমরা জানি যে, আপনি দেবতাদের স্বীয় ভাগ প্রদান করার আয়োজন করেছেন।”
সভার সদস্যরা ভগবানকে সম্বোধন করে বললেন- “হে সন্তপ্ত জীবদের একমাত্র আশ্রয়! বদ্ধ জীবনের এই দুর্ভেদ্য দুর্গে কালরূপী সর্প সর্বদা দংশন করতে উদ্যত হয়ে রয়েছে। এই জগৎ তথাকথিত সুখ এবং দুঃখের গর্তে পূর্ণ এবং সেখানে বহু হিংস্র পশু সর্বদা আক্রমণ করতে উদ্যত। শোকরূপী অগ্নি সর্বদা সেখানে জ্বলছে; এবং অলীক সুখের মরীচিকা সর্বদা জীবকে প্রলোভিত করছে, কিন্তু তা থেকে কারও আশ্রয়ের কোন স্থান নেই। তাই অজ্ঞ ব্যক্তিরা জন্ম-মৃত্যুর চক্রে, সর্বদা তাদের তথাকথিত কর্তব্যের ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে বাস করছে এবং আমরা জানি না কখন তারা আপনার শ্রীপাদপদ্মের আশ্রয় গ্রহণ করবে।”
শিব বললেন- “হে ভগবান! আমার মন এবং চেতনা নিরন্তর আপনার শ্রীপাদপদ্মে স্থির থাকে, যা সমস্ত অভীষ্টপ্রদ হওয়ার ফলে সমস্ত মুক্ত মহর্ষিদের দ্বারা পূজিত! আপনার চরণ-কমলে আমার মন স্থির হয়ে রয়েছে বলে, যারা আমার কার্যকলাপ অশুভ বলে আমার নিন্দা করে, তাঁদের দ্বারা আমি আর বিচলিত হই না। তাদের দোষারূপে আমি কিছু মনে করি না এবং দয়াবশত আমি তাদের ক্ষমা করি, ঠিক যেমন আপনি সমস্ত জীবদের প্রতি আপনার করুণা প্রদর্শন করেন।”
শ্রীভৃগু বললেন- “হে ভগবান! ব্রহ্মা থেকে শুরু করে একটি ক্ষুদ্র পিপীলিকা পর্যন্ত সকলেই আপনার দুর্লঙ্ঘ্য মায়ার প্রভাবে আচ্ছন্ন এবং তার ফলে তারা তাদের স্বরূপ সম্বন্ধে অবগত নয়। প্রত্যেকেই তার দেহটিকে তার স্বরূপ বলে মনে করে এবং তার ফলে তারা মোহের অন্ধকারে আচ্ছন্ন। আপনি যে প্রত্যেক জীবের হৃদয়ে পরমাত্মারূপে বিরাজ করেন, তা তারা বস্তুত বুঝতে পারে না, এমন কি তারা আপনার পরম পদও বুঝতে পারে না। কিন্তু আপনি হচ্ছেন সমস্ত শরণাগত জীবের সুহৃৎ এবং রক্ষক। তাই, আপনি আমাদের প্রতি কৃপা পরবশ হয়ে আমাদের সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করুন।”
ব্রহ্মা বললেন- “যদি কেউ জ্ঞান লাভের বিভিন্ন পন্থার মাধ্যমে আপনাকে জানার চেষ্টা করেন, তা হলে তিনি কখনই আপনার ব্যক্তিত্ব এবং নিত্য স্বরূপ বুঝতে পারবেন না। আপনার স্থিতি সর্বদাই জড় সৃষ্টির অতীত, কিন্তু অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের দ্বারা আপনাকে জানার প্রয়াস হচ্ছে ভৌতিক, কারণ সেই জ্ঞান অর্জনের উপায় এবং উদ্দেশ্যও ভৌতিক।”
দেবরাজ ইন্দ্র বললেন- “হে ভগবান! প্রতিটি হস্তে অস্ত্র-সমন্বিত আপনার এই অষ্টভুজ দিব্য রূপ সমগ্র বিশ্বের কল্যাণের জন্য প্রকট হয় এবং তা মন ও নেত্রের অত্যন্ত আনন্দদায়ক। এই রূপে আপনি ভক্ত-বিদ্বেষী অসুরদের দন্ড দেওয়ার জন্য সর্বদা তৎপর।”
ঋত্বিক-পত্নীগণ বললেন- “হে ভগবান! ব্রহ্মার নির্দেশে এই যজ্ঞের আয়োজন করা হয়েছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত দক্ষের প্রতি ক্রুদ্ধ হয়ে শিব এই যজ্ঞ নষ্ট করেছিলেন এবং তাঁর ক্রোধের ফলে যজ্ঞে বলির পশুরা মৃত হয়ে পড়ে রয়েছে। তাই যজ্ঞের সমস্ত প্রস্তুতি নষ্ট হয়েছে। এখন আপনার পদ্মপলাশ-লোচনের দৃষ্টিপাতের দ্বারা এই যজ্ঞস্থলকে পুনঃ পবিত্র করুন।”
ঋষিরার প্রার্থনা করেছিলেন- “হে ভগবান! আপনার কার্যকলাপ পরম অদ্ভুত এবং যদিও আপনি আপনার বিভিন্ন শক্তির দ্বারা সব কিছু সম্পাদন করেন, তবুও আপনি সেই সমস্ত কার্যকলাপের প্রতি মোটেই আসক্ত নন। এমন কি আপনি লক্ষ্মীদেবীর প্রতিও আসক্ত নন, যাঁর কৃপা লাভের জন্য ব্রহ্মার মতো মহান দেবতারাও তাঁর পূজা করেন।”
সিদ্ধগণ প্রার্থনা করেছিলেন- “হে ভগবান! দাবানলক্লিষ্ট হস্তী যেমন নদীর জলে প্রবেশ করে তার সমস্ত ক্লেশ ভুলে যায়, তেমনই আমাদের মন আপনার দিব্য লীলামৃতের নদীতে সর্বদা নিমজ্জিত থাকার ফলে, সেই চিন্ময় আনন্দ কখনই পরিত্যাগ করতে চায় না, যা ব্রহ্মানন্দের থেকেও অধিক আনন্দদায়ক।”
দক্ষপত্নী প্রার্থনা করেছিলেন- “হে ভগবান! আপনি যে যজ্ঞস্থলে আবির্ভূত হয়েছেন তা অত্যন্ত সৌভাগ্যজনক। আমি আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি এবং আমি আপনার কাছে অনুরোধ করি যেন আপনি এই উপলক্ষ্যে প্রসন্ন হোন। আপনি ব্যতীত এই যজ্ঞস্থল ঠিক একটি মস্তকহীন কবন্ধের মতো শ্রীহীন।”
বিভিন্ন লোকপালেরা বললেন- “হে ভগবান! আমরা কেবল আমাদের প্রত্যক্ষ অনুভূতিকেই বিশ্বাস করি, কিন্তু এই পরিস্থিতিতে আমরা জানি না যে, আমরা আামাদের জড় ইন্দ্রিয়ের দ্বারা আপনাকে দর্শন করেছি কি না। আমাদের জড় ইন্দ্রিয়ের দ্বারা আমরা কেবল এই দৃশ্য জগৎই দর্শন করতে পারি, কিন্তু আপনি পঞ্চভূতের অতীত। আপনি ষষ্ঠ তত্ত্ব। তাই আমরা আপনাকে জড় জগতের সৃষ্টিরূপে দর্শন করছি।”
মহাযোগীগণ বললেন- “হে ভগবান! যাঁরা আপনাকে সমস্ত জীবের পরমাত্মারূপে জেনে, আপনাকে তাঁদের থেকে অভিন্নরূপে দর্শন করেন, তাঁরা নিশ্চয়ই আপনার অত্যন্ত প্রিয়। যাঁরা আপনাকে প্রভু বলে মনে করে এবং নিজেদেরকে আপনার দাস বলে মনে করে আপনার ভক্তিময়ী সেবায় যুক্ত থাকে, তাঁদের প্রতি আপনি অত্যন্ত কৃপাপরায়ণ হন। আপনি তাদের প্রতি সর্বদা অনুকূল। আমরা পরমেশ্বর ভগবানকে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি, যিনি বিভিন্ন প্রকার বস্তু উৎপন্ন করেছেন এবং তাঁদের সৃষ্টি, পালন এবং বিনাশের জন্য তাদের জড় জগতের তিনটি গুণের বশীভূত বশীভূত করেছেন। তিনি স্বয়ং বহিরঙ্গা শক্তির নিয়ন্ত্রণাধীন নন; তাঁর স্বরূপে তিনি জড় গুণের বৈচিত্র থেকে সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন এবং মায়ার ভ্রান্ত পরিচিতি থেকে মুক্ত।”
মূর্তিমান বেদগণ বললেন- “হে ভগবান! আমরা আপনাকে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি, কারণ আপনি সত্ত্বগুণের আশ্রয় হওয়ার ফলে সমস্ত ধর্ম, তপস্যা এবং কৃচ্ছ্র সাধনের উৎস। আপনি সমস্ত ভৌতিক গুণের অতীত এবং কেউই আপনাকে অথবা আপনার প্রকৃত স্থিতি জানে না।”
অগ্নিদেব বললেন- “হে ভগবান! আমি আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি, কারণ আপনার কৃপায় আমি প্রজ্বলিত অগ্নির মতো তেজস্বী এবং যজ্ঞে নিবেদিত ঘৃত মিশ্রিত হবি স্বীকার করি। যজুর্বেদ অনুসারে পাঁচ প্রকার হবি আপনারই বিভিন্ন শক্তি এবং পাঁচ প্রকার বৈদিক মন্ত্রে আপনি পূজিত হন। যজ্ঞ বলতে পরমেশ্বর ভগবান আপনাকেই বোঝানো হয়।”
দেবতারা বললেন- “হে ভগবান! পূর্বে, প্রলয়ের সময় আপনি জড় জগতের বিভিন্ন শক্তি সরক্ষণ করেছিলেন। সেই সময়, সনকাদি ঊর্ধ্ব লোকবাসীরা আধ্যাত্মিক জ্ঞানের দ্বারা আপনার ধ্যান করেছিলেন। অতএব আপনি হচ্ছেন আদি পুরুষ এবং আপনি প্রলয়-বারিতে শেষনাগ-শয্যায় শয়ন করেন। এখন আপনি আপনার সেবক আমাদের সম্মুখে প্রকট হয়েছেন। দয়া করে আপনি আমাদের রক্ষা করুন।”
গন্ধর্বেরা বললেন- “হে ভগবান! শিব, ব্রহ্মা, ইন্দ্র আদি সমস্ত দেবতাগণ এবং মরীচি আদি মহর্ষিগণ কেবল আপনার দেহের বিভিন্ন অংশ। আপনি হচ্ছেন পরম শক্তিমান বিভু; সমগ্র বিশ্ব আপনার ক্রীড়ার উপকরণ মাত্র। আমরা সর্বদাই আপনাকে পরমেশ্বর ভগবান বলে স্বীকার করি এবং আমরা আপনাকে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।”
বিদ্যাধরেরা বললেন- “হে ভগবান! এই মনুষ্য শরীর সর্বোচ্চ সিদ্ধি লাভের জন্য, কিন্তু আপনার বহিরঙ্গা শক্তির বশীভূত হয়ে জীব ভ্রান্তিবশত তার দেহকে আত্মা বলে মনে করে এবং তার ফলে মায়ার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সে জড় সুখভোগের মাধ্যমে সুখী হতে চায়। পথভ্রষ্ট হয়ে সে সর্বদা অনিত্য, মায়িক সুখের প্রতি আকৃষ্ট হয়। কিন্তু আপনার দিব্য কার্যকলাপ এতই প্রবল প্রভাবসম্পন্ন যে, কেউ যদি সেই বিষয়ে শ্রবণ এবং কীর্তনে যুক্ত হন, তা হলে তিনি এই মোহ থেকে উদ্ধার লাভ করতে পারেন।”
ব্রাহ্মণগণ বললেন- “হে ভগবান! আপনি সাক্ষাৎ যজ্ঞপুরুষ। আপনি হবি, আপনি অগ্নি, আপনি বৈদিক যজ্ঞমন্ত্র, আপনি সমিধ, আপনি শিখা, আপনি কুশ এবং আপনি যজ্ঞপাত্র। আপনি যজ্ঞ অনুষ্ঠানকারী পুরোহিত, আপনি ইন্দ্রাদি দেবতা এবং আপনি যজ্ঞের পশু। যজ্ঞে যা কিছু উৎসর্গ করা হয় তা আপনি অথবা আপনার শক্তি। হে ভগবান! হে মূর্তিমান বৈদিক জ্ঞান। বহুকাল পূর্বে মহান বরাহ অবতারে আপনি পৃথিবীকে জল থেকে উত্তোলন করেছিলেন, ঠিক যেমন একটি হস্তী অনায়াসে সরোবর থেকে একটি পদ্মফুল উত্তোলন করে। বিশাল বরাহরূপে আপনি যখন গর্জন করেছিলেন, সেই দিব্য শব্দতরঙ্গ যজ্ঞমন্ত্র বলে স্বীকার করা হয়েছিল এবং সনকাদি মহির্ষগণ তার ধ্যান করে আপনার স্তব করেছিলেন। হে ভগবান! আমরা আপনার দর্শনের প্রতীক্ষা করছিলাম, কারণ আমরা বৈদিক বিধি অনুসারে যজ্ঞ করতে অসমর্থ হয়েছিলাম। তাই আমরা আপনার কাছে প্রার্থনা করি, দয়া করে আপনি আমাদের প্রতি প্রসন্ন হোন। কেবল আপনার পবিত্র নাম কীর্তন করার ফলে সমস্ত বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করা যায়। আমরা আপনার সমক্ষে আপনাকে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।”
শ্রীমৈত্রেয় বললেন- “সেখানে উপস্থিত সকলের দ্বারা এইভাবে ভগবান বিষ্ণু বন্দিত হওয়ার পর, দক্ষ শুদ্ধ অন্তঃকরণে পুনরায় যজ্ঞ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন, যা শিবের অনুচরদের দ্বারা বিধ্বস্ত হয়েছিল। হে নিষ্পাপ বিদুর! ভগবান শ্রীবিষ্ণু হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে সমস্ত যজ্ঞফলের ভোক্তা। কিন্তু তা সত্ত্বেও সমস্ত জীবের পরমাত্মা হওয়ার ফলে, তিনি কেবল যজ্ঞের তাঁর অংশ প্রাপ্ত হয়েই সন্তুষ্ট ছিলেন। তিনি তাই প্রসন্নভাবে দক্ষকে সম্বোধন করে বলেছিলেন- ব্রহ্মা, শিব এবং আমি জড় জগতের পরম কারণ। আমি পরমাত্মা, স্বয়ংসম্পূর্ণ সাক্ষী। কিন্তু নির্বিশেষভাবে ব্রহ্মা, শিব এবং আমার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।”
“হে দক্ষ দ্বিজ! আমি হচ্ছি আদি ভগবান, কিন্তু এই জড় জগতের সৃষ্টি, পালন এবং সংহারের কার্য আমি আমার জড়া প্রকৃতির মাধ্যমে করে থাকি এবং বিভিন্ন প্রকার কার্য অনুসারে, আমার প্রতিনিধিদের ভিন্ন ভিন্ন নাম রয়েছে। অজ্ঞ ব্যক্তিরাই কেবল ব্রহ্মা, শিব আদি দেবতাদের আমার থেকে স্বতন্ত্র বলে মনে করে, এমন কি জীবদেরও স্বতন্ত্র বলে মনে করে। সাধারণ বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন মানুষ মস্তক এবং শরীরের অন্যান্য অঙ্গের মধ্যে কোন রকম পার্থক্য দর্শন করে না। তেমনই, আমার ভক্তরা সর্বব্যাপ্ত ভগবান বিষ্ণু এবং অন্য কোন বস্তু বা ব্যক্তির মধ্যে কোন রকম ভেদ দর্শন করেন না। যিনি ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব এবং জীবাত্মাদের পরব্রহ্ম থেকে ভিন্নরূপে দর্শন করেন না এবং যিনি ব্রহ্মাকে জানেন, তিনি প্রকৃতপক্ষে শান্তি উপলব্ধি করেন; অন্যরা করে না।”
মৈত্রেয় ঋষি বললেন- “এইভাবে ভগবান কর্তৃক সুষ্ঠভাবে আদিষ্ট হয়ে, সমস্ত প্রজাপতিদের প্রধান দক্ষ শ্রীবিষ্ণুর অর্চনা করেছিলেন। যজ্ঞবিধির দ্বারা তাঁকে পূজা করার পর, দক্ষ পৃথকভাবে ব্রহ্মা এবং শিবের পূজা করেছিলেন। দক্ষ শিবকে তাঁর যজ্ঞভাগ নিবেদন করে, সম্মানপূর্বক সর্বতোভাবে পূজা করেছিলেন। যাজ্ঞিক অনুষ্ঠান সমাপ্ত করার পর, তিনি অন্য সমস্ত দেবতা এবং সেখানে সমবেত সমস্ত ব্যক্তিদের সন্তুষ্টি বিধান করেছিলেন। তার পর, পুরোহিতগণ সহ সমস্ত কর্তব্য সমাপ্ত করার পর, তিনি স্নান করেছিলেন এবং সম্পূর্ণভাবে সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। এইভাবে বিধিপূর্বক যজ্ঞ অনুষ্ঠানের দ্বারা ভগবান শ্রীবিষ্ণুর পূজা করার পর, দক্ষ সম্পূর্ণরূপে ধর্মপথে স্থিত হয়েছিলেন। অধিকন্তু, সেই যজ্ঞে সমাগত সমস্ত দেবতারা তাঁকে পুণ্য লাভের আশীর্বাদ করে, স্বর্গলোকে ফিরে গিয়েছিলেন। আমি শুনেছি যে, দক্ষ থেকে প্রাপ্ত শরীর ত্যাগ করার পর, দাক্ষায়ণী (দক্ষকন্যা) হিমালয়ের রাজ্যে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি মেনকার কন্যারূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এই কথা আমি প্রামাণ্য সূত্রে শুনেছি। অম্বিকা (দুর্গাদেবী), যিনি দাক্ষায়ণী (সতী) রূপে পরিচিতা ছিলেন, তিনি শিবকে পুনরায় তাঁর পতিরূপে বরণ করেছিলেন, ঠিক যেমন পরমেশ্বর ভগবানের বিভিন্ন শক্তি নতুন সৃষ্টির সময় কার্য করে। হে বিদুর! শিবের দ্বারা বিধ্বস্ত দক্ষযজ্ঞের এই কাহিনী আমি বৃহস্পতির শিষ্য মহাভাগবত উদ্ধবের কাছে শুনেছিলাম। হে কুরুনন্দন! পরমেশ্বর ভগবান শ্রীবিষ্ণু কর্তৃক পরিচালিত এই দক্ষযজ্ঞের কাহিনী যদি কেউ শ্রবণ করেন এবং তা অন্যদের শোনান, তা হলে তিনি নিশ্চিতভাবে সমস্ত জড় কলুষ থেকে মুক্ত হন।”

Leave a Reply

July 2025
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031  

Blog Stats

  • 140,959 hits