মৈত্রেয় বললেন- “এইভাবে দীর্ঘকাল ধরে শ্বশুর এবং জামাতা, অর্থাৎ দক্ষ এবং শিবের বিদ্বেষভাব বর্তমান ছিল। ব্রহ্মা যখন দক্ষকে সমস্ত প্রজাপতিদের অধিপতির পদে অভিষিক্ত করেন, তখন দক্ষ অত্যন্ত গর্বোদ্ধত হয়েছিলেন। দক্ষ বাজপেয় নামক এক যজ্ঞ শুরু করেছিলেন এবং ব্রহ্মার সমর্থন সম্বন্ধে তাঁর অত্যন্ত দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছিল। তার পর তিনি বৃহস্পতিসব নামক আর একটি যজ্ঞ অনুষ্ঠান করেছিলেন। যখন যজ্ঞ অনুষ্ঠান হচ্ছিল, তখন বহু ব্রহ্মর্ষি, দেবর্ষি, পিতৃ এবং দেবতাগণ অত্যন্ত সুন্দরভাবে অলঙ্কারের দ্বারা সজ্জিত তাঁদের পত্নীগণ সহ ব্রহ্মান্ডের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সেখানে এসে সমবেত হয়েছিলেন। পরম সাধ্বী দক্ষকন্যা সতী গগন-মার্গে বিচরণকারী স্বর্গলোকবাসীদের পরস্পর আলোচনায় শুনতে পেয়েছিলেন যে, তাঁর পিতা এক মহান যজ্ঞ করছেন। যখন তিনি দেখলেন যে, সমস্ত দিক থেকে স্বর্গবাসীদের উজ্জ্বল মৃগনয়না পত্নীগণ অতি সুন্দর বসনে এবং কন্ঠহার ও কর্ণকুন্ডলে বিভূষিতা হয়ে, তাঁদের পতিদের সঙ্গে সেই যজ্ঞে যোগদান করার জন্য চলেছেন, তখন তিনি তাঁর পতি ভূতনাথের কাছে গিয়ে পরম ঔৎসুক্য সহকারে এই কথাগুলি বলেছিলেন, হে পিয় পতি শিব! আপনার শ্বশুর এখন এক মহাযজ্ঞ সম্পাদন করছেন এবং সেই যজ্ঞে নিমন্ত্রিত হয়ে সমস্ত দেবতারা সেখানে যাচ্ছেন। যদি আপনার ইচ্ছা হয়, তবে চলুন, আমরাও সেখানে যাই। মনে হয় আমার ভগিনীরাও তাঁদের পতিদের সঙ্গে আত্মীয়-স্বজনদের দর্শন করার বাসনায় সেই মহাযজ্ঞ অনুষ্ঠানে গিয়েছেন। আমার পিতৃ-প্রদত্ত অলঙ্কারে সজ্জিত হয়ে, আমিও সেই সভায় যোগদান করার জন্য যেতে চাই। আমার ভগিনীগণ, মাতৃষ্বসাগণ, তাদের পতিগণ এবং অন্যান্য স্নেহপরায়ণ আত্মীয়-স্বজনগণ সেখানে নিশ্চয়ই সমবেত হয়েছেন, তাই আমি যদি সেখানে যাই, তা হলে আমি তাঁদের দেখতে পাব। সেখানে আমি উড্ডীয়মান যজ্ঞধ্বজা এবং মহর্ষিগণ কর্তৃক অনুষ্ঠিত যজ্ঞও দর্শন করতে পারব। হে প্রিয় পতি, সেই সমস্ত কারণে আমি সেখানে যেতে অত্যন্ত উৎকন্ঠিত। এই দৃশ্য জগৎ ত্রিগুণের পারস্পারিক ক্রিয়া বা পরমেশ্বর ভগবানের বহিরঙ্গা শক্তির এক আশ্চর্যজনক সৃষ্টি। সেই তত্ত্ব আপনি সম্পূর্ণরূপে অবগত। কিন্তু আপনি জানেন যে, আমি একজন তত্ত্বজ্ঞানহীনা অবলা স্ত্রী। তাই আমি আর একবার আমার জন্মভূমি দর্শন করতে চাই। হে অভব, হে নীলকন্ঠ! কেবল আমার আত্মীয়-স্বজনেরাই নয়, অন্য রমণীরাও সুন্দর অলঙ্কার এবং বেশভূষায় বিভূষিতা হয়ে, তাঁদের পতি এবং বন্ধুদের সঙ্গে সেখানে যাচ্ছেন। দেখুন, তাঁদের শ্বেত বিমানসমূহ কিভাবে সমস্ত আকাশকে সুশোভিত করেছে। হে দেবশ্রেষ্ঠ! পিতৃগৃহে উৎসবের কথা শুনে কন্যার দেহ কিভাবে অবিচলিত থাকতে পারে? আপনি যদি মনে করেন যে, আমাকে সেখানে নিমন্ত্রণ করা হয়নি, কিন্তু বন্ধু, স্বামী, গুরু অথবা পিতার গৃহে তো বিনা নিমন্ত্রণেও যাওয়া যায়। হে অমর শিব! কৃপাপূর্বক আপনি আমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করুন। আপনি আমাকে আপনার অর্ধাঙ্গিনীরূপে স্বীকার করেছেন; অতএব আমার প্রতি কৃপা প্রদর্শনপূর্বক আপনি আমার অনুরোধ স্বীকার করুন।”
মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন- “কৈলাস পর্বতের ত্রাণকারী শিবের যদিও তখন বিশ্বস্রষ্টাদের সম্মুখে তাঁর প্রতি দক্ষের মর্মভেদী কটুক্তির কথা স্মরণ হয়েছিল, তবু তিনি তাঁর পিয়তমা পত্নীর বাক্য শ্রবণ করে, হেসে উত্তর দিয়েছিলেন। হে সুন্দরী! তুমি বলেছ যে, অনাহূত হয়েও বন্ধুর গৃহে যাওয়া যায়। সেই কথা সত্যি, যদি সেই বন্ধু দেহাত্মবুদ্ধি-জনিত অহঙ্কারের ফলে ক্রুদ্ধ হয়ে দোষ দর্শন না করে। বিদ্যা, তপস্যা, বিত্ত, সৌন্দর্য, যৌবন এবং আভিজাত্য- এই ছয়টি মহাত্মাদের গুণ, কিন্তু যারা সেইগুলি লাভ করার ফলে গর্বান্ধ হয় এবং তার ফলে তাদের সদ্বুদ্ধি বা বিবেক হারিয়ে ফেলে, তখন তারা মহৎ ব্যক্তিদের মহিমা দর্শন করতে পারে না। যারা অসংযত-চিত্ত হওয়ার ফলে, অতিথিদের ভ্রূকুটি-করাল ক্রোধনেত্রে দর্শন করে, তাদের আত্মীয় বা বন্ধু বলে মনে করেও, তাদের গৃহে যাওয়া উচিত নয়।”
শিব বললেন- “আত্মীয়দের কটুক্তি দ্বারা মর্মাহত হলে যে রকম ব্যথা অনুভূত হয়, শত্রুর বাণের দ্বারা আহত হলেও সেই রকম ব্যথা হয় না, কেননা সেই ব্যথা দিনরাত হৃদয়কে বিদীর্ণ করে। হে সুন্দরী! আমি জানি যে, দক্ষের সমস্ত কন্যাদের মধ্যে তুমি হচ্ছ সব চাইতে আদরের কন্যা, কিন্তু আমার পত্নী বলে তুমি তাঁর গৃহে সম্মান লাভ করবে না। পক্ষান্তরে, আমার সঙ্গে সম্পর্কের ফলে তুমি দুঃখিত বোধ করবে। যারা অহঙ্কারের দ্বারা পরিচালিত হওয়ার ফলে সর্বদা মন এবং ইন্দ্রিয়ের দ্বারা সন্তপ্ত হয়, তারা কখনও আত্ম-তত্ত¡জ্ঞ ব্যক্তিদের ঐশ্বর্য সহ্য করতে পারে না। আত্ম-উপলব্ধির স্তরে উন্নীত হতে অক্ষম হয়ে তারা সেই সমস্ত ব্যক্তিদের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ হয়, ঠিক যেমন অসুরেরা পরমেশ্বর ভগবানকে ঈর্ষা করে। হে সুন্দরী! আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধবেরা অবশ্যই পরস্পরের প্রতি প্রত্যুত্থান, নমস্কার, ও অভিবাদনাদি করে থাকেন। কিন্তু যাঁরা চিন্ময় স্তরে উন্নীত হয়েছেন, তাঁরা যথার্থ তত্ত্বজ্ঞান লাভ করার ফলে, সেই সম্মান দেহাভিমানী ব্যক্তিদের না করে, দেহের অভ্যন্তরে বিরাজমান পরমাত্মাকে করে থাকেন। আমি সর্বদা শুদ্ধ কৃষ্ণভাবনায় ভগবান বাসুদেবকে আমার প্রণতি নিবেদন করি। কৃষ্ণচেতনাই হচ্ছে শুদ্ধ চেতনা, যাতে বাসুদেব নামে অভিহিত পরমেশ্বর ভগবান আবরণশূন্য হয়ে প্রকাশিত হন। তোমার পিতা যদিও তোমার দেহের জন্মদাতা, তবুও যেহেতু তিনি এবং তাঁর অনুগামীরা আমার প্রতি বিদ্বেষ-পরায়ণ, তাই তাঁকে দর্শন করা তোমার উচিত নয়। হে বরাঙ্গনে! মাৎসর্য-পরায়ণ হওয়ার ফলে, আমার কোন অপরাধ না থাকলেও, নিষ্ঠুর বাক্যের দ্বারা তিনি আমাকে তিরস্কার করেছেন। আমার এই উপদেশ সত্ত্বেও যদি তুমি আমার বাণী উপেক্ষা করে সেখানে যাও, তা হলে ভবিষ্যতে তোমার ভাল হবে না। তুমি অত্যন্ত সম্মানীয়া এবং তুমি যদি তোমার স্বজনের দ্বারা অপমানিত হও, তা হলে সেই অপমান তৎক্ষণাৎ মৃত্যুতুল্য হবে।”
তৃতীয় অধ্যায়- শিব এবং সতীর বার্তালাপ
20 Jul 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, চতুর্থ স্কন্ধ- ভগবদ্ভক্তদের প্রতি অনুগ্রহ