শ্রীশৌনক জিজ্ঞাসা করলেন- “হে সূত গোস্বামী! পৃথিবী কক্ষপথে পুনরায় স্থাপিত হলে, জড় জগতে জন্ম-গ্রহণকারী জীবেদের মুক্তির জন্য স্বায়ম্ভুব মনু কি মার্গ প্রদর্শন করেছিলেন? ভগবানের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার ফলে, শত পুত্র সহ তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার সঙ্গ যিনি ত্যাগ করেছিলেন, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পরম ভক্ত এবং সখা, সেই বিদুরের সম্বন্ধে শৌনক ঋষি প্রশ্ন করেছিলেন। ব্যাসদেবের দেহ থেকে বিদুরের জন্ম হয়েছিল এবং তিনি তাঁর থেকে কোন অংশে ন্যূন ছিলেন না। এইভাবে তিনি সর্বান্তঃকরণে শ্রীকৃষ্ণের পাদ-পদ্মের আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর ভক্তদের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। পবিত্র তীর্থ-স্থানসমূহে পর্যটন করে বিদুর সর্বতোভাবে কলুষমুক্ত হয়েছিলেন এবং অবশেষে হরিদ্বারে পৌছে, তিনি সর্ব শ্রেষ্ঠ পরমার্থ-তত্ত্ববিৎ মহর্ষি মৈত্রেয়ের সাক্ষাৎ লাভ করেছিলেন এবং তাঁর কাছে নানা রকম প্রশ্ন করেছিলেন। বিদুর এবং মৈত্রেয়ের মধ্যে যে বার্তালাপ হয়েছিল, তখন তা নিশ্চয়ই ভগবানের নির্মল লীলা-বিলাসের আলোচনা হয়েছিল। সেই সমস্ত আখ্যান শ্রবণ করা ঠিক গঙ্গার জলে স্নান করার মতো, কেননা তার ফলে মানুষ তার সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হতে পারে। হে সূত গোস্বামী, আপনার সর্বতোভাবে মঙ্গল হোক। দয়া করে আপনি আমাদের কাছে অত্যন্ত উদার এবং কীর্তনীয় ভগবানের কার্যকলাপ বর্ণনা করুন। এমন কোন্ ভক্ত রয়েছেন যিনি ভগবানের এই অমৃতময়ী লীলা-বিলাসের বর্ণনা শ্রবণ করে তৃপ্ত হতে পারেন? নৈমিষারণ্যের মহর্ষিগণ কর্তৃক এইভাবে জিজ্ঞাসিত হয়ে, রোমহর্ষণের পুত্র সূত গোস্বামী, যাঁর চিত্ত সর্বদাই ভগবানের অপ্রাকৃত লীলা-বিলাসে মগ্ন ছিল, তিনি বললেন- আমি এখন যা বলব, দয়া করে অপনারা তা শ্রবণ করুন।”
সূত গোস্বামী বলতে লাগলেন- “স্বীয় দৈবী মায়ার প্রভাবে বরাহ রূপধারী ভগবান কিভাবে লীলাচ্ছলে পৃথিবীকে রসাতল থেকে উদ্ধার করেছিলেন এবং অবলীলাক্রমে হিরণ্যাক্ষকে বধ করেছিলেন, সেই কথা শুনে, ভরত বংশজ বিদুর অত্যন্ত অনন্দিত হয়েছিলেন। বিদুর তখন মৈত্রেয় ঋষিকে বলতে লাগলেন- হে পবিত্র ঋষি! যেহেতু আপনি আমাদের অচিন্ত্য বিষয় সম্বন্ধে অবগত, তাই দয়া করে আমাকে বলুন, জীবেদের আদি জনক প্রজাপতিদের উৎপন্ন করার পর, জীব সৃষ্টির জন্য ব্রহ্মা কি করেছিলেন? মরীচি, স্বায়ম্ভুব মনু আদি প্রজাপতিগণ কিভাবে ব্রহ্মার নির্দেশ অনুসারে সৃষ্টি করেছিলেন এবং কিভাবে তাঁরা এই জগৎকে প্রকাশ করেছিলেন? তাঁরা কি তাঁদের পত্নীদের সহযোগিতায় সৃষ্টি করেছিলেন? অথবা স্বতন্ত্রভাবে সৃষ্টি করেছিলেন? কিংবা সকলে মিলিত হয়ে এই জগৎ সৃষ্টি করেছিলেন?”
মৈত্রেয় বললেন- “প্রকৃতির গুণত্রয়ের সাম্য অবস্থা যখন জীবের অদৃষ্ট, মহাবিষ্ণু এবং কাল শক্তির দ্বারা ক্ষোভিত হয়, তখন মহত্তত্ত্ব উৎপন্ন হয়। জীবের অদৃষ্টের (দৈবের) প্রেরণায় রজোগুণ-প্রধান মহত্তত্ত্ব থেকে তিন প্রকার অহঙ্কারের উদ্ভব হয়েছিল। সেই অহঙ্কার থেকে পাঁচটি পাঁচটি করে তত্ত্বের উদ্ভব হয়েছে। পৃথক পৃথকভাবে জড় জগৎ সৃষ্টি করতে অক্ষম হয়ে, ঐ সমস্ত উপাদাগুণি পরমেশ্বর ভগবানের শক্তি সহযোগে মিলিতভাবে একটি সুবর্ণময় অণ্ড সৃষ্টি করেছিল। সেই হিরন্ময় অণ্ডটি অচেতন অবস্থায় এক সহস্র বৎসরেরও অধিক কাল কারণসমুদ্রের জলে শায়িত ছিল। তার পর ভগবান গর্ভোদকশায়ী বিষ্ণুরূপে তাতে প্রবেশ করেন। গর্ভোদকশায়ী বিষ্ণুর নাভি থেকে একটি সহস্র সূর্যের মতো উজ্জ্বল পদ্ম উদ্ভূত হয়েছিল। সেই পদ্মটি সমস্ত বদ্ধ জীবের অধিষ্ঠান স্বরূপ এবং প্রথম জীব সর্ব শক্তিমান ব্রহ্মা সেই পদ্মটি থেকে আবির্ভূত হয়েছিলেন। যখন গর্ভোদকশায়ী পরমেশ্বর ভগবান ব্রহ্মার হ্রদয়ে প্রবেশ করলেন, তখন ব্রহ্মার বুদ্ধির উন্মেষ হয়েছিল এবং সেই বুদ্ধির দ্বারা তিনি ব্রহ্মাণ্ডকে পূর্বের মতো সৃষ্টি করতে শুরু করেছিলেন। সর্ব প্রথমে ব্রহ্মা তাঁর ছায়া থেকে বদ্ধ জীবেদের অবিদ্যার আবরণ সৃষ্টি করেছিলেন। তা পাঁচ প্রকার এবং সেগুলিকে বলা হয়- তামিস্র, অন্ধতামিস্র, তম, মোহ এবং মহাতম। বিরক্ত হয়ে ব্রহ্মা সেই অবিদ্যাময় শরীর ত্যাগ করেছিলেন। সেই শরীর রাত্রিতে পরিণত হল এবং যক্ষ ও রাক্ষসেরা তা অধিকার করার জন্য তৎপর হয়েছিল। সেই রাত্রি ক্ষুধা এবং তৃষ্ণার উদ্ভব-স্থল। ক্ষুধা এবং তৃষ্ণায় কাতর হয়ে, তারা ব্রহ্মাকে ভক্ষণ করার জন্য চতুর্দিক থেকে ধাবিত হয়েছিল, এবং চিৎকার করে বলেছিল, ‘একে ছেড়ো না! একে খেয়ে ফেল!’ দেবশ্রেষ্ঠ ব্রহ্মা তখন অত্যন্ত ভীত হয়ে তাদের বললেন, ‘আমাকে খেয়ো না, আমাকে তোমরা রক্ষা কর। তোমরা আমার থেকে উৎপন্ন হয়েছ, তোমরা আমার পুত্র। তাই তোমরা যক্ষ এবং রাক্ষস নামে পরিচিত হও।’ তার পর তিনি সত্ত্বগুণের প্রভাব দ্বারা দীপ্তিমান মূখ্য দেবতাদের সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁদের সামনে তিনি দিবসের জ্যোতির্ময় রূপ পরিত্যাগ করেছিলেন এবং তাঁরা ক্রীড়াচ্ছলে তা গ্রহণ করেছিলেন। ব্রহ্মা তখন তাঁর জঘনদেশ থেকে অসুরদের সৃষ্টি করেছিলেন এবং তারা অত্যন্ত মৈথুনাসক্ত ছিল। অত্যন্ত কামোন্মত্ত হয়ে, তারা মৈথুনের জন্য ব্রহ্মার প্রতি ধাবমান হয়েছিল। পূজনীয় ব্রহ্মা প্রথমে তাদের দুষ্প্রবৃত্তি দেখে হেসেছিলেন, কিন্তু পরে যখন তিনি দেখলেন যে, নির্লজ্জ অসুরেরা তাঁর প্রতি ধাবিত হয়েছে, তখন তিনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন এবং ভীত হয়ে দ্রুত বেগে পলায়ন করেছিলেন। তখন তিনি পরমেশ্বর ভগবানের সমীপবর্তী হলেন, যিনি তাঁর শ্রীপাদপদ্মে শরণাগত ভক্তদের সমস্ত ক্লেশ দূর করেন এবং অভীষ্ট ফল প্রদান করেন। তিনি তাঁর ভক্তদের আনন্দ দান করার জন্য তার অসংখ্য দিব্য রূপ প্রকাশ করেন। ভগবানের সমীপবর্তী হয়ে ব্রহ্মা তাঁকে এইভাবে বলেছিলেন- হে প্রভু! এই সমস্ত পাপিষ্ঠ অসুরদের থেকে আমাকে রক্ষা করুন, যাদের আমি আপনার নির্দেশ অনুসারে সৃষ্টি করেছি, কিন্তু তারা মৈথুনাসক্ত হয়ে এখন আমাকে ধর্ষণ করতে উদ্যত হয়েছে। হে প্রভু! আপনিই কেবল ক্লেশ প্রাপ্ত জনগণের ক্লেশ-সংহারক এবং যারা আপনার চরণারবিন্দে শরণ গ্রহণ করে না, তাদের আপনিই ক্লেশ দান করেন। অন্যের মন যিনি সম্যকরূপে দর্শন করতে পারেন, সেই পরমেশ্বর ভগবান শ্রীহরি ব্রহ্মার ক্লেশ দর্শন করে তাঁকে বলেছিলেন, ‘তোমার এই কলুষিত শরীর ত্যাগ কর।’ এইভাবে ভগবান কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে ব্রহ্মা তাঁর দেহ ত্যাগ করেছিলেন।”
“ব্রহ্মার পরিত্যক্ত দেহ সন্ধ্যার রূপ ধারণ করল, যা দিন এবং রাত্রির সন্ধিক্ষণ এবং যা কামকে উদ্দীপ্ত করে। সমস্ত অসুরেরা, যারা স্বভাবত কামুক এবং রজোগুনের দ্বারা প্রভাবিত, তারা সেই সন্ধ্যাকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করল, যাঁর চরণপদ্ম নূপুরের ধ্বনিতে শব্দায়মান, যাঁর নেত্রদ্বয় মদ-বিহ্বল, যাঁর কটিদেশ সূক্ষ্ম বস্ত্রের দ্বারা আচ্ছাদিত এবং স্বর্ণ-মেখলার দ্বারা বেষ্টিত। তাঁর পয়োধরদ্বয় পরস্পর উপমর্দনের ফলে অত্যন্ত উন্নত এবং ব্যবধান শূন্য হয়ে শোভিত, তাঁর নাসিকা ও দন্ত অতি সুন্দর; তাঁর অধরে অতি সুন্দর এক হাসি খেলা করছিল এবং তিনি লীলাচ্ছলে অসুরদের প্রতি কটাক্ষপাত করেছিলেন। তাঁর কুঞ্চিত কেশদাম ঘন শ্যাম বর্ণ এবং তিনি যেন লজ্জিত হয়ে নিজেকে আবৃত করেছিলেন। সেই রমণীকে দর্শন করে অসুরেরা যৌন ক্ষুধাবশত তাঁর প্রতি অনুরক্ত হয়েছিল। তাঁর প্রশংসা করে অসুরেরা বলতে লাগল- আহা কি অপূর্ব সৌন্দর্য! কি অস্বাভাবিক আত্ম-সংযম! কি মনোহর নবীন যৌবন! তার প্রতি কামাসক্ত আমাদের সকলের মধ্যে সে সম্পূর্ণরূপে কাম-মুক্তের মতো বিচরণ করছে। সেই কুবুদ্ধিসম্পন্ন অসুরেরা প্রমদাকৃতি সন্ধ্যাকে একজন যুবতী স্ত্রীরূপে বিবেচনা করে, বহু প্রকার তর্ক-বিতর্ক করেছিল। তার পর প্রণয়বশত শ্রদ্ধা সহকারে তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিল। হে সুন্দরী বালিকা! তুমি কে? তুমি কার পত্নী অথবা কার কন্যা? আর কি উদ্দেশ্যে তুমি আমাদের সম্মুখে এখানে প্রকট হয়েছ? তোমার এই অমূল্য সৌন্দর্যরূপ পণ্য দ্রব্যের দ্বারা কেন তুমি দুর্ভাগা আমাদের প্রলুব্ধ করছ? হে অবলে! তুমি যেই হও না কেন, আমাদের ভাগ্যবশে তোমার দর্শন পেয়েছি। তুমি যখন কন্দুক নিয়ে খেলা কর, তখন সমস্ত দর্শকদের মন তুমি বিচলিত কর। হে সুন্দরী! তুমি যখন বার বার তোমার করতলের দ্বারা কন্দুকটিকে মাটিতে আঘাত করছ, তখন তোমার চরণ-কমল এক জায়গায় স্থির থাকছে না। তোমার পূর্ণবিকশিত স্তনের ভারে যেন তোমার কটিদেশ শ্রান্ত হয়েছে এবং তোমার স্বচ্ছ দৃষ্ট মন্থর হয়েছে। আহা, তোমার সুন্দর কেশদাম কি শোভা বিস্তার করছে! মূঢ় বুদ্ধি অসুরেরা এইভাবে সেই সায়ংকাল সন্ধ্যাকে তাঁর মোহময়ীরূপে নিজেকে প্রকাশকারিণী এক সুন্দরী রমণী বলে মনে করছিল এবং তাঁরা তাঁকে বলপূর্বক অধিকার করেছিল।”
“তার পর পূজনীয় ব্রহ্মা গভীর ভাব-ব্যঞ্জক হাস্য সহকারে, যেন তাঁর নিজের সৌন্দর্যকে নিজে উপভোগ করে, গন্ধর্ব এবং অপ্সরাদের সৃষ্টি করেছিলেন। তারপর ব্রহ্মা সেই কাম্ভিমতী প্রিয়া জ্যোৎস্নার রূপ পরিত্যাগ করলেন। বিশ্বাবসু প্রমুখ গন্ধর্বেরা তখন তা সাদরে গ্রহণ করেছিলেন। তার পর ভগবান ব্রহ্মা তাঁর আলস্য থেকে ভূত এবং পিশাচদের সৃষ্টি করেছিলেন, কিন্তু তাদের সকলকে নগ্ন এবং মুক্ত কেশ দেখে, তিনি তাঁর নেত্রদ্বয় নিমীলিত করেছিলেন। জীবের স্রষ্টা ব্রহ্মা জৃম্ভণরূপ শরীর ত্যাগ করলে, ভূত ও পিশাচেরা সেই শরীর গ্রহণ করল। এইটি লালা ঝরা নিদ্রা নামেও পরিচিত। যে-সমস্ত মানুষ অপবিত্র তাদের ভূত ও পিশাচেরা আক্রমণ করে এবং তাদের সেই আক্রমণকে বলা হয় উন্মাদগ্রস্ত অবস্থা। জীবস্রষ্টা পূজনীয় ব্রহ্মা নিজেকে বাসনা এবং শক্তিতে পূর্ণ বলে মনে করে, তাঁর অদৃশ্য রূপের নাভি থেকে সাধ্য এবং পিতাদের সৃষ্টি করেছিলেন। পিতৃগণ তাঁদের অস্তিত্বের উৎস সেই অদৃশ্য শরীর গ্রহণ করেছিলেন। সেই অদৃশ্য শরীরের মাধ্যমে কর্মমার্গে পন্ডিত ব্যক্তিরা সাধ্য এবং পিতৃদের (পরলোকগত পূর্বপুরুষদের) শ্রাদ্ধ উপলক্ষ্যে পিন্ড দান করে। তার পর ব্রহ্মা তাঁর অদৃশ্য থাকার ক্ষমতা দ্বারা সিদ্ধ এবং বিদ্যাধরদের সৃষ্টি করেছিলেন এবং তাঁদের ‘অন্তর্ধান’ নামক অতি অদ্ভুত দেহ প্রদান করেছিলেন।”
“এক দিন জীব স্রষ্টা ব্রহ্মা জলে তাঁর নিজের প্রতিবিম্ব দর্শন করেছিলেন এবং নিজেই নিজের প্রশংসা করে, সেই প্রতিবিম্ব থেকে কিম্পুরুষ এবং কিন্নরদের সৃষ্টি করেছিলেন। কিম্পুরুষ এবং কিন্নরেরা ব্রহ্মার পরিত্যক্ত সেই প্রতিবিম্বিত রূপটি গ্রহণ করেছিলেন। তাই তাঁরা তাঁদের পত্নীগণ সহ প্রতিদিন ঊষাকালে তাঁর কার্যকলাপের বর্ণনা করে তাঁর গুণগান করেন।”
“এক সময় ব্রহ্মা তাঁর দেহ পূর্ণ মাত্রায় প্রসারণ করে শয়ন করেছিলেন। তিনি তাঁর সৃষ্টিকার্য বৃদ্ধি প্রাপ্ত হচ্ছে না দেখে অত্যন্ত চিন্তান্বিত হয়েছিলেন এবং ক্রোধবশত তিনি তখন তাঁর সেই শরীরও পরিত্যাগ করেছিলেন। হে প্রিয় বিদুর! ব্রহ্মার সেই শরীরের কেশ চ্যুত হয়ে সর্পে রূপান্তরিত হল এবং হস্ত-পদাদি সঙ্কুচিত হয়ে সেই দেহ যখন সর্পিল গতিতে গমন করছিল, তখন বিস্তৃত ফণা-বিশিষ্ট অত্যন্ত হিংস্র নাগদের সৃষ্টি হয়েছিল। এক দিন প্রথম সৃষ্ট জীব স্বায়ম্ভূ ব্রহ্মা তাঁর জীবনের উদ্দেশ্য সার্থক হয়েছে বলে মনে করে, তাঁর মনের দ্বারা সমগ্র জগতের কল্যাণ সাধনকারী মনুদের সৃষ্টি করেছিলেন। আত্ম-তত্ত্বজ্ঞ স্রষ্টা ব্রহ্মা মানুষদের তাঁর স্বীয় রূপ দান করেছিলেন। মনুদের দর্শন করে, দেবতা গন্ধর্ব আদি পূর্বে যাঁদের সৃষ্টি হয়েছিল, তাঁরা প্রজাপতি ব্রহ্মাকে প্রশংসা করতে লাগলেন। তাঁরা প্রার্থনা করেছিলেন- হে ব্রহ্মান্ডের স্রষ্টা! আমরা অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছি। আপনি যা সৃষ্টি করেছেন তা অতি উত্তম। যেহেতু এই কর্মসমূহ মনুষ্য-জীবনে যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাই আমরা সকলে যজ্ঞভাগ গ্রহণ করতে সক্ষম হব। তপস্যা, উপাসনা, ধ্যান এবং ভক্তিযুক্ত সমাধির দ্বারা তাঁর ইন্দ্রিয়সমূহ বশীভূত করে, স্বয়ম্ভূ ব্রহ্মা তাঁর প্রিয় পুত্ররূপে ঋষিদের সৃষ্টি করেছিলেন। ব্রহ্মান্ডের স্রষ্টা অজ ব্রহ্মা তাঁর প্রত্যেক পুত্রকে তাঁর দেহের এক একটি অংশ দান করেছিলেন, যা গভীর ধ্যান, মনের সমাধি, অলৌকিক শক্তি, তপশ্চর্যা, ঋদ্ধি এবং বৈরাগ্যযুক্ত ছিল।”
বিংশতি অধ্যায়- মৈত্রেয়-বিদুর সংবাদ
22 Jun 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, তৃতীয় স্কন্ধ- সৃষ্টির স্থিতি