অষ্টাদশ অধ্যায়- বরাহদেবের সঙ্গে হিরণ্যাক্ষ দৈত্যের যুদ্ধ

মৈত্রেয় বলতে লাগলেন- “গর্বোদ্ধত এবং অহঙ্কারী দৈত্যটি বরুণের সেই বাক্য বিশেষ গ্রাহ্য করল না। হে প্রিয় বিদুর, সে নারদের কাছ থেকে পরমেশ্বর ভগবানের অবস্থান অবগত হয়ে, দ্রুত বেগে রসাতলে প্রবেশ করেছিল। সে তখন সেখানে সর্ব শক্তিমান পরমেশ্বরকে তাঁর বরাহরূপে তাঁর দশানাগ্রের দ্বারা পৃথিবীকে ঊর্ধ্বে উত্তোলন করতে দেখেছিল। তিনি তাঁর আরক্ত নেত্রের দ্বারা সেই দৈত্যের তেজরাশি হরণ করেছিলেন। সেই দৈত্য তখন উপহাস করে বলেছিল- ‘ও, এইটি একটি উভচর জন্তু!”
ভগবানকে সম্বোধন করে সেই দৈত্য বলল- “রে শূকর-রূপধারী দেবশ্রেষ্ঠ! আমার কথা শোন্। রসাতলবাসী আমাদেরকে এই পৃথিবী প্রদান করা হয়েছে এবং আমার দ্বারা আহত না হয়ে, আমার উপস্থিতিতে তুই তা নিয়ে যেতে পারবি না। রে দুষ্ট! আমাদের হত্যা করার জন্য তুই আমাদের শত্রুদের দ্বারা পুষ্ট হয়েছিস এবং অদৃশ্য থেকে তুই কয়েকজন দৈত্যদের বধও করেছিল। রে মূর্খ! তোর শক্তি কেবল যোগমায়া, তাই আজ তোকে হত্যা করে, আমি আমার আত্মীয়-স্বজনদের শোক দূর করব। আমার হস্ত নিক্ষিপ্ত গদার দ্বারা তোর মস্তক যখন চূর্ণ হবে এবং তোর মৃত্যু হবে, তখন দেবতা এবং ঋষিরা যারা ভক্তি সহকারে তোকে যজ্ঞভাগ নৈবেদ্য নিবেদন করে, তারাও সমূলে উৎপাটিত বৃক্ষের মতো আপনা থেকেই বিনষ্ট হবে।”
“ভগবান যদিও সেই অসুরের কটু বাক্যরূপ অস্ত্রের দ্বারা ব্যথিত হয়েছিলেন, তবুও তিনি সেই বেদনা সহ্য করেছিলেন। তাঁর দশানাগ্রে অবস্থিত পৃথিবীকে ভীতা দেখে, তিনি জলের মধ্য থেকে বেরিয়ে এলেন, ঠিক যেমন কুমিরের দ্বারা আহত হস্তী তাঁর হস্তিনী সহ নির্গত হয়। ভগবান যখন জল থেকে বেরিয়ে এলেন, তখন হিরণ্যাক্ষ, যার মাথার চুল ছিল স্বর্ণাভ এবং যার দাঁত ছিল ভয়ঙ্কর, সে ভগবানের পশ্চাদ্ধাবন করেছিল, ঠিক যেমন কুমির হস্তীকে অনুসরণ করে। বজ্রের মতো গর্জন করে সে বলেছিল- যুদ্ধে আহ্বানকারী প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছ থেকে এইভাবে পালিয়ে যেতে তোর লজ্জা করে না? নির্লজ্জ প্রাণীর পক্ষে কোন কিছুই নিন্দনীয় নয়। ভগবান পৃথিবীকে জলের উপর তাঁর গোচরীভূত স্থানে সংস্থাপন করে, তাতে তাঁর আধার শক্তি সঞ্চার করেছিলেন, যাতে সেইটি জলে ভেসে থাকতে পারে। তাঁর শত্রু যখন সেখানে দাঁড়িয়ে তাঁকে দেখছিল, তখন ব্রহ্মান্ডের সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা ভগবানের স্তুতি করেছিলেন এবং অন্যান্য দেবতারা তাঁর উপর পুষ্প-বৃষ্টি করেছিলেন। সেই দৈত্যটি, যার দেহ বহু মূল্যবান অলঙ্কার, কঙ্কন এবং সুন্দর স্বর্ণময় বর্মে সজ্জিত ছিল, এক বিশাল গদা নিয়ে ভগবানের পশ্চাতে ধাবিত হয়েছিল। ভগবান তার মর্মভেদী কটুক্তি সহ্য করেছিলেন, কিন্তু তাকে প্রত্যুত্তর দেওয়ার জন্য তিনি তাঁর ভয়ঙ্কর ক্রোধ প্রকাশ করেছিলেন।”
পরমেশ্বর ভগবান বললেন- “আমরা যথার্থই বনবাসী প্রাণী এবং আমরা তোর মতো কুকুরদের শিকারের অন্বেষণ করছি। যাঁরা মৃত্যু-পাশ থেকে মুক্ত, তাঁরা তোর অর্থহীন প্রলাপকে গ্রাহ্য করেন না, কেননা তুই মৃত্যুর নিয়মের দ্বারা আবদ্ধ। আমরা অবশ্যই রসাতলবাসীদের অধিকৃত ধন হরণ করে লজ্জাহীন হয়েছি। তোর শক্তিশালী গদার দ্বারা আহত হওয়া সত্ত্বেও, আমি কিছুকাল এই জলে থাকব, কেননা তোর মতো শক্তিশালী শত্রুর সঙ্গে বিরোধ উৎপন্ন করে, আমার এখন যাওয়ার কোথাও স্থান থাকবে না। তুই বহু পদাতিক সৈন্যের সেনাপতি এবং এখন তুই আমাদের পরাভূত করার জন্য শ্রীঘ্রই প্রচেষ্টা করতে পারিস। তোর মূর্খ বাক্যালাপ পরিত্যাগ করে এবং আমাদের হত্যা করে, তোর আত্মীয়-স্বজনদের অশ্রু মোচন করার চেষ্টা কর। যে গর্বোদ্ধত ব্যক্তি নিজের প্রতিজ্ঞার মর্যাদা রাখতে পারে না, সে সভায় বসার অযোগ্য।”
শ্রীমৈত্রেয় বললেন- “ভগবান যখন এইভাবে সেই দৈত্যটিকে যুদ্ধে আহ্বান করলেন, তখন সে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ এবং উত্তেজিত হয়ে, আহত প্রতিদ্বন্দ্বী বিশাল বিষধর সর্পের মতো ক্রোধে কম্পিত হতে লাগল। ক্রোধের ফলে তার সমস্ত ইন্দ্রিয় বিচলিত হয়েছিল এবং ঘন ঘন নিঃশ্বাস ত্যাগ করে সেই দৈত্যটি দ্রুত বেগে ভগবানের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার শক্তিশালী গদার দ্বারা তাঁকে আঘাত করেছিল। কিন্তু ভগবান এক পাশে ঈষৎ সরে গিয়ে, তার বক্ষের উপর নিক্ষিপ্ত শত্রুর প্রচন্ড গদার আঘাত এড়িয়ে গিয়েছিলেন, ঠিক যেমন সিদ্ধ যোগী মৃত্যুকে বঞ্চনা করে। সেই দৈত্যটি পুনরায় তার গদা গ্রহণ করে তা বার বার ঘোরাতে ঘোরাতে ক্রোধবশত দম্ভের দ্বারা তার অধর দংশন করতে আরম্ভ করল, তখন পরমেশ্বর ভগবান অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে, সেই দৈত্যের দিকে ধাবিত হলেন। তারপর, ভগবান তাঁর গদা দিয়ে সেই পরমেশ্বর ডান দিকের ভ্রূর মধ্যে আঘাত করেছিলেন। হে সৌম্য বিদুর, কিন্তু যেহেতু সেই দৈত্যটি যুদ্ধে দক্ষ ছিল, তাই সে তার সুনিপুণ গদা চালনার দ্বারা আত্মরক্ষা করেছিল। এইভাবে, হর্যক্ষ দৈত্য এবং পরমেশ্বর ভগবান উভয়ে ক্রুদ্ধ হয়ে, জয় লাভের বাসনায় পরস্পরকে তাঁদের বিশাল গদার দ্বারা আঘাত করতে লাগলেন। দুই যোদ্ধার মধ্যে প্রচন্ড প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল। তাঁদের তীক্ষ্ণ গদার আঘাতে উভয়েরই দেহ আহত হয়েছিল এবং তাঁদের ক্ষত থেকে নির্গত রক্তের গন্ধ পেয়ে, উভয়েই অতিশয় ক্রোধোদ্দীপ্ত হয়েছিলেন। উভয়েই পরস্পর জয়ের ইচ্ছায় গদা যুদ্ধের নানা প্রকার কৌশল প্রদর্শন করেছিলেন। গাভীর জন্য দুইটি মত্ত বৃষ যেমন সংগ্রাম করে, তাঁদের তখন ঠিক সেই রকম মনে হচ্ছিল।”
“হে কুরু-বংশজ! ব্রহ্মান্ডের দেবতাদের মধ্যে সব চাইতে স্বতন্ত্র ব্রহ্মা তাঁর অনুগামী ঋষিগণ কর্তৃক পরিবৃত হয়ে, পৃথিবীর নিমিত্ত সেই দৈত্য এবং বরাহরূপী পরমেশ্বর ভগবানের মধ্যে সেই প্রচন্ড যুদ্ধ দর্শন করতে এসেছিলেন। সেই যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে সহস্র ঋষি এবং মহাত্মাদের নেতা ব্রহ্মা সেই দৈত্যকে দেখলেন, সে এমন অভূতপূর্ব শক্তি প্রাপ্ত হয়েছিল যে, কেউই তার সঙ্গে যুদ্ধ করতে সক্ষম ছিল না।”
ব্রহ্মা তখন আদি বরাহদেব শ্রীবিষ্ণুকে বললেন- “হে ভগবান! এই দৈত্যটি দেবতা, ব্রাহ্মণ, গাভী এবং সর্বদাই আপনার শ্রীপাদ-পদ্মের আরাধনার উপর নির্ভরশীর সমস্ত নির্মল ও সরল ব্যক্তিদের কন্টক-স্বরূপ। সে অনর্থক তাঁদের ক্লেশ প্রদান করায়, তাঁদের ভয়ের কারণ হয়েছে। আমার কাছ থেকে বর লাভ করে সে এক মহাশক্তিশালী দৈত্যে পরিণত হয়েছে এবং সে সর্বদাই উপযুক্ত প্রতিদ্ব›দ্বীর অন্বেষণ করতে করতে ব্রহ্মান্ডের সর্বত্রই সেই অসৎ উদ্দেশ্য-সাধনের জন্য বিচরণ করে। হে প্রিয় ভগবান! এই সর্পতুল্য দৈত্যের সঙ্গে খেলা করার কোন প্রয়োজন নেই, কেননা এ মায়াবী এবং গর্বোদ্ধত, সেই সঙ্গে সে নিরঙ্কুশ এবং ভয়ঙ্কর দুষ্ট। হে ভগবান! আপনি অচ্যুত। আসুরিক বেলা উপস্থিত হওয়ার পূর্বে আপনি দয়া করে এই পাপী দৈত্যটিকে সংহার করুন, কেননা, তখন সে তার অনুকূল অন্য কোন ভয়ঙ্কর শরীর ধারণ করতে পারে। আপনার অন্তরঙ্গা শক্তির দ্বারা আপনি নিঃসন্দেহে এক সংহার করতে পারেন। হে ভগবান! সমস্ত জগৎ আচ্ছাদনকারী ভয়ঙ্কর অন্ধকারাচ্ছন্ন সন্ধ্যা দ্রুত ঘনিয়ে আসছে। যেহেতু আপনি সমস্ত আত্মার আত্মা, তাই দয়া করে তাকে হত্যা করে, আপনি দেবতাদের বিজয় সম্পাদন করুন। বিজয়ের জন্য সব চাইতে উপযুক্ত অভিজিৎ নামক শুভ যোগ, যা মধ্যাহ্নে শুরু হয়েছিল তা গতপ্রায়; তাই আপনার সুহৃৎদের মঙ্গলের জন্য আপনি অচিরেই এই দুর্জয় শত্রুকে বধ করুন। সৌভাগ্যক্রমে এই দৈত্যটি স্বেচ্ছায় আপনার কাছে এসেছে, এবং আপনার দ্বারাই এর মৃত্যু হবে বলে স্থির হয়েছে; তাই, আপনার বিক্রম প্রকাশ করে, আপনি একে যুদ্ধে বিনাশ করে জগতে শান্তি স্থাপন করুন।”

Leave a Reply

June 2025
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30  

Blog Stats

  • 140,959 hits