সপ্তদশ অধ্যায়- ব্রহ্মান্ডের সর্বদিকে হিরণ্যাক্ষের বিজয়

শ্রীমৈত্রেয় বললেন- “বিষ্ণুর থেকে জন্ম হয়েছিল যাঁর, সেই ব্রহ্মার কাছ থেকে সেই অন্ধকারের কারন সম্বন্ধে শ্রবণ করে, স্বর্গলোকবাসী দেবতারা সমস্ত ভয় থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। তারপর তাঁরা তাঁদের নিজ নিজ লোকে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। সাধ্বী রমণী দিতি তাঁর গর্ভজাত সন্তানদের থেকে দেবতাদের উপদ্রব আশঙ্কা করে এবং তাঁর পতির কাছ থেকেও সেই ভবিষ্যদ্বাণী শ্রবণ করে, অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে, শতবর্ষ পূর্ণ হলে দুইটি যমজ পুত্র প্রসব করলেন।”
“সেই সন্তানদ্বয় ভূমিষ্ঠ হলে স্বর্গলোকে, ভূলোকে ও অন্তরীক্ষে নানা রকম ভীতিপ্রদ এবং আশ্চর্যজনক প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিতে লাগল। তখন পর্বত সহ পৃথিবী কম্পিত হয়েছিল এবং মনে হয়েছিল যেন সর্বত্র আগুন জ্বলছে। উল্কা, কেতু এবং বজ্রপাত সহ শনি আদি বহু অমঙ্গলসূচক গ্রহ তখন উদিত হয়েছিল। স্পর্শ-দুঃখকর বায়সমূহ প্রবল ঝটিকাকে সৈন্য এবং ধুুলিসমূহকে ধ্বজা করে, বিশাল বৃক্ষরাজি সমূলে উৎপাটন করে, প্রচন্ডভাবে গর্জন করতে করতে প্রবাহিত হলে লাগল। সেই সময় বিদ্যুৎরূপ অট্টহাস্যযুক্ত মেঘরাশির দ্বারা নভোমন্ডলের জ্যোতিষ্কসমূহ আচ্ছাদিত হল। সর্বত্র অন্ধকারাচ্ছন্ন হওয়ার ফলে, তখন আর কোন কিছুই দেখা গেল না। সমুদ্র যেন শোকাচ্ছন্ন হয়ে উচ্চ তরঙ্গরাশি সহ প্রবলভাবে গর্জন করতে লাগল এবং তার ফলে তার উদরস্থ জল-জন্তুসমূহ ক্ষোভিত হয়েছিল। নদী ও সরোবরসমূহও বিক্ষুব্ধ হয়েছিল এবং সেখানকার পদ্মরাজি শুষ্ক হয়ে গিয়েছিল। বার বার সূর্য এবং চন্দ্রগ্রহণের সময় সূর্য এবং চন্দ্রের চারপাশে কুয়াশাচ্ছন্ন পরিধি প্রকাশ পেতে লাগল। বিনা মেঘেও বজ্রপাতের শব্দ শোনা যেতে লাগল এবং পর্বতের গুহা থেকে রথ-চক্রের নির্ঘোষের মতো শব্দ উত্থিত হতে লাগল। গ্রামের মধ্যে শৃগালীরা তাদের মুখ থেকে অগ্নি উদ্‌গীরণ করে অমঙ্গলসূচক চিৎকার করেছিল, এবং শৃগাল ও পেঁচকেরাও তাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে শব্দ করেছিল। কুকুরেরা যেখানে সেখানে গ্রীবা উত্তোলন করে, কখনও সঙ্গীতের মতো, কখনও বা ক্রন্দনের মতো বিবিধভাবে চিৎকার করতে লাগল। হে বিদুর! গর্দভেরা দলবদ্ধ হয়ে তাদের তীক্ষè খুরের দ্বারা পৃথিবীকে আঘাত করে এবং উন্মত্তের মতো খার্কার রব করতে করতে চর্তুদিকে ধাবিত হতে লাগল। গর্দভের খার্কার শব্দে ভীত হয়ে, পাখিরা শব্দ করতে করতে তাদের নীড় থেকে উড়ে গেল এবং গোশালায় ও অরণ্যে পশুরা ভীত হয়ে বার বার বিষ্ঠা ও মূত্র পরিত্যাগ করতে লাগল। গাভীগণ ভীতা হয়ে দুধের পরিবর্তে রক্ত বর্ষণ করেছিল, মেঘরাশি পুঁজ বর্ষণ করেছিল, দেব-প্রতিমা সকলে যেন অশ্রু বিসর্জন করেছিল এবং বিনা বায়ুতে বৃক্ষসমূহ ভূপতিত হয়েছিল। মঙ্গল, শনি আদি অশুভ গ্রহসমূহ অত্যন্ত উজ্জ্বল হয়ে বুধ, বৃহস্পতি এবং শুক্র আদি শুভ গ্রহ ও অন্যান্য নক্ষত্রদের অতিক্রম করেছিল এবং বক্র গতির দ্বারা প্রত্যাবর্তন করে গ্রহগুলি পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষের সৃষ্টি করেছিল। এই সমস্ত এবং অন্যান্য অনেক অশুভ লক্ষণ দর্শন করে, ব্রহ্মার চার জন ঋষিপুত্র ব্যতীত অন্য সকলে, যাঁরা জয় এবং বিজয়ের অধঃপতিত হয়ে দিতির পুত্ররূপে জন্মগ্রহণের রহস্য সম্বন্ধে অবগত ছিলেন না, তাঁরা অত্যন্ত ভয়ভীত হয়েছিলেন। তাঁরা মনে করেছিলেন যে, জগতের প্রলয় উপস্থিত হয়েছে।”
“এই দুইটি দৈত্য যারা পুরাকালে আবির্ভূত হয়েছিল, অচিরেই তারা তাদের অসাধারণ দৈহিক গঠন প্রদর্শন করতে শুরু করল। ইস্পাতের মতো তাদের শরীর দুইটি বিশাল পর্বতের মতো বৃদ্ধি পেতে লাগল। তাদের দেহ এত দীর্ঘ হয়েছিল যে, মনে হচ্ছিল তারা যেন তাদের স্বর্ণ-মুকুটের অগ্রভাগের দ্বারা আকাশকে চুম্বন করছে। তারা তাদের শরীরের দ্বারা দিকসমূহ অবরোধ করেছিল এবং তাদের প্রতি পদক্ষেপের দ্বারা পৃথিবীকে কম্পিত করেছিল। তাদের বাহু উজ্জ্বল অঙ্গদের দ্বারা অলঙ্কৃত ছিল এবং অত্যন্ত সুন্দর মেখলা বেষ্টিত কটিদেশের দ্বারা তারা যেন সূর্যকে আচ্ছাদিত করেছিল। প্রজাদের স্রষ্টা প্রজাপতি কশ্যপ তাঁর যমজ পুত্রদের মধ্যে যার প্রথমে জন্ম হয়েছিল, তার নাম দিয়েছিলেন হিরণ্যাক্ষ এবং দিতি প্রথমে যাকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন, তার নাম দিয়েছিলেন হিরণ্যকশিপু। জ্যেষ্ঠ পুত্র হিরণ্যকশিপুর ত্রিভুবনে কারো কাছে মৃত্যুর ভয় ছিল না, কেননা সে ব্রহ্মার কাছে বর লাভ করেছিল। সেই বরের প্রভাবে সে অত্যন্ত গর্বোদ্ধত ছিল এবং ত্রিভুবনকে আয়ত্ত করতে সে সক্ষম হয়েছিল। তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা হিরণ্যাক্ষ তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে তার কার্যকলাপের দ্বারা সর্বদাই সন্তুষ্ট করতে প্রস্তুত ছিল। হিরণ্যকশিপুর প্রীতি-সাধনের জন্য হিরণ্যাক্ষ সংগ্রাম করার বাসনায় কাঁধে গদা নিয়ে ব্রহ্মান্ডের সর্বত্র ভ্রমণ করত।”
“হিরণ্যাক্ষের ক্রোধ ছিল দুঃসহ। তার পায়ে ছিল শব্দায়মান স্বর্ণের নূপুর, সে বৈজয়ন্তী মালার দ্বারা অলঙ্কৃত ছিল এবং তার এক স্কন্ধদেশে ছিল একটি বিশাল গদা। তার মানসিক ও দৈহিক শক্তি এবং সেই সঙ্গে ব্রহ্মার বরে সে অত্যন্ত গর্বিত হয়েছিল। কারও হাতে তার নিহত হওয়ার ভয় ছিল না এবং তার গতি রোধ করার ক্ষমতাও কারোও ছিল না। তাই তার দর্শন মাত্রই গরুড়কে দেখে সাপেরা যেভাবে পলায়ন করে, দেবতারাও সেইভাবে ভয়ে ভীত হয়ে লুকিয়েছিলেন। ইন্দ্র ও অন্যান্য দেবতারা, যাঁরা পূর্বে তাঁদের শক্তির গর্বে প্রমত্ত হয়েছিলেন, তাঁদের দেখতে না পেয়ে এবং তাঁরা যে তার তেজবলে ভীত হয়ে পলায়ন করেছেন, তা বুঝতে পেরে সেই দৈত্যরাজ ভীষণভাবে গর্জন করতে লাগল। স্বর্গ থেকে ফিরে এসে, সেই বলবান দৈত্য ভয়ঙ্কর গর্জনশীল গভীর সমুদ্রে ক্রীড়া করার মানসে মত্ত মাতঙ্গের মতো ঝাঁপ দিয়েছিল। সে সমুদ্রে প্রবিষ্ট হলে, বরুণের সৈন্য-স্বরূপ জল-জন্তুসমূহ ভয়াচ্ছন্ন হয়ে অতি দূরে পলায়ন করেছিল। এইভাবে, আঘাত না করেই হিরণ্যাক্ষ তার তেজ প্রদর্শন করেছিল। বহু বহু বছর ধরে সমুদ্রে বিচরণ করে, মহা বলমান হিরণ্যাক্ষ তার লৌহ-নির্মিত গদার দ্বারা বায়ু-বিক্ষুব্ধ বিশাল তরঙ্গমালাকে বার বার আঘাত করেছিল এবং তার পর সে বরুণের রাজধানী বিভাবরীতে গিয়ে পৌছাল। অসুরদের বাসস্থান পাতাল-লোকের পালক এবং জল-জন্তুদের প্রভু বরুণের গৃহ হচ্ছে বিভাবরী। সেখানে হিরণ্যাক্ষ বরুণদেবের কাছে গিয়ে নীচবৎ প্রণিপাত করার পরে, তাঁকে উপহাস করে স্মিত হাস্য সহকারে বলেছিল, ‘হে অধিরাজ! আমাকে যুদ্ধ দান করুন! আপনি একজন মহা যশস্বী লোকপালাধিপতি। আপনি দাম্ভিক ও অহঙ্কারী বীরদের দর্প হরণ করেছিলেন এবং এই জগতের সমস্ত দৈত্য ও দানবদের পরাভূত করেছিলেন। এক সময় আপনি ভগবানের সন্তুষ্টি-বিধানের জন্য রাজসূয় যজ্ঞ অনুষ্ঠান করেছিলেন।’ এইভাবে অন্তহীন মদমত্ত শত্রু কর্তৃক উপহসিত হয়ে, পূজ্য জলাধিপতি ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন, কিন্তু তিনি তাঁর যুক্তির দ্বারা সেই সমুত্থিত ক্রোধকে সংবরণ করে উত্তর দিয়েছিলেন- ‘হে দৈত্যরাজ! অত্যন্ত বৃদ্ধ হওয়ার ফলে, আমরা এখন যুদ্ধ থেকে বিরত হয়েছি। আপনি যুদ্ধে এত নিপুণ যে, আদি পুরুষ বিষ্ণু ছাড়া আর কাউকে আমি দেখি না যিনি আপনাকে যুদ্ধে সন্তুষ্টি-বিধান করতে সমর্থ। তাই, হে অসুররাজ, এমন কি আপনার মতো বীরেরাও যাঁর স্তব করেন, তাঁর কাছেই আপনি গমন করুন।”
বরুণদেব বলতে লাগলেন- “তার কাছে পৌছালে আপনি অতি শ্রীঘ্রই নষ্ট-গর্ব হয়ে কুকুরদের দ্বারা পরিবৃত অবস্থায় যুদ্ধক্ষেত্রে চির নিদ্রায় শায়িত হবেন। আপনার মতো দুষ্ট ব্যক্তিদের বিনাশ করার জন্য এবং সাধুদের অনুগ্রহ করার জন্য তিনি বরাহ আদি বিবিধ রূপ ধারণ করেন।”

Leave a Reply

June 2025
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30  

Blog Stats

  • 140,963 hits