পঞ্চদশ অধ্যায়- যথাসময়ে পান্ডবদের অবসর গ্রহণ

সূত গোস্বামী বললেন- “শ্রীকৃষ্ণের বিরহে কাতর কৃষ্ণসখা অর্জুনকে তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা মহারাজ যুধিষ্ঠির এইভাবে নানা প্রকার আশঙ্কাযুক্ত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলেন।”
“গভীর শোকে অর্জুনের মুখ এবং হৃদয়পদ্ম শুষ্ক হয়েছিল। তাই তাঁর দেহ প্রভাহীন হয়েছিল। এখন, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের স্মৃতি উদয় হওয়ার ফলে তাঁর পক্ষে উত্তর দেওয়া অত্যন্ত কষ্টকর হয়েছিল। তখন তিনি অতি কষ্ঠে বিগলিত শোকাশ্রু সংবরণ করলেন, অশ্রুধারা হস্ত দ্বারা মার্জিত করলেন। শ্রীকৃষ্ণের অদর্শনে তাঁর খুবই উৎকন্ঠা হয়েছিল বলে অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়লেন।”
শ্রীকৃষ্ণের সখ্যভাব, মিত্রতা, বন্ধুত্ব এবং সারথ্য আদি কার্যের কথা স্মরণ করে অর্জুন বাষ্প গদ্গদ স্বরে অগ্রজ যুধিষ্ঠিরকে বলতে লাগলেন- “মহারাজ! পরমেশ্বর ভগবান শ্রীহরি, যিনি আমার প্রতি ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মতো আচরণ করতেন, তিনি আজ আমাকে ছেড়ে চলে গেছেন। তাই আমার যে বিপুল তেজ দেবতাদেরও বিস্ময় উৎপাদন করত, তা অপহৃত হয়েছে। আমি তাঁকে হারিয়েছি যাঁর ক্ষণকালের বিরহে এই সমগ্র ভুবনের সব কিছুই প্রাণহীন দেহের মতো অপ্রিয় এবং শূণ্য বলে মনে হয়। আমি কেবল তাঁরই কৃপার বলে বলীয়ান্ হয়ে দ্রুপদ রাজভবনে স্বয়ংবর সভায় সমাগত কামোন্মত্ত নৃপতিদের প্রভাব পরাভূত করেছিলাম। আমার ধনুকের জ্যা আরোপণ করে মৎসরূপী লক্ষ বিদ্ধ করেছিলাম এবং তার ফলে দ্রোপদীকে লাভ করেছিলাম। তিনি নিকটে ছিলেন বলেই দক্ষতা সহকারে আমি দেবতাগণ সহ মহবলবান ইন্দ্রদেবকে জয় করতে সক্ষম হয়েছিলাম, এবং তাই অগ্নিদেবকে খান্ডব বন দহন করতে দিতে পেরেছিলাম। কেবল তাঁরই করুণায় সেই জ্বলন্ত খান্ডব বনের মধ্যে থেকে ময়দানব রক্ষা পেয়েছিল, এবং তাই আমাদের আশ্চর্য স্থাপত্য শিল্পমন্ডিত মায়াময়ী সভাগৃহটি আমার গড়ে তুলতে পেরেছিলাম- যে সভাগৃহ সমস্ত নরপতিরা রাজসূয় যজ্ঞের অনুষ্ঠানে সমবেত হয়েছিলেন এবং আপনাকে শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন করেছিলেন। দশ হাজার হাতির শক্তি সমন্বিত আপনার ভ্রাতা ভগবানেরই কৃপায় বধ করেছিলেন জরাসন্ধকে, যার পদযুগল বহু নৃপতিদের দ্বারা পূজিত হত। জরাসন্ধের মহাভৈরব যজ্ঞে বলি দেওয়ার জন্য এই সমস্ত রাজাদের নিয়ে আসা হয়েছিল, কিন্তু তাঁরা এইভাবে মুক্ত হয়েছিলেন। পরে তাঁরা আপনাকে কর প্রদান করেছিলেন। রাজসূয় যজ্ঞোৎসবে বিশেষভাবে পবিত্র এবং সুন্দর বস্ত্র আভরণে সজ্জিতা তোমার পত্নীকে যখন দৃষ্কৃতকারীরা কেশাকর্ষণ করেছিল, তখন সে অশ্রুসিক্ত নয়নে শ্রীকৃষ্ণের চরণে পতিত হয়েছিল এবং তিনিই সেই দৃষ্কৃতকারীদের পত্নীদের কেশ বেণীমুক্ত করেছিলেন। আমাদের বনবাসের সময় আমাদের ভয়ঙ্কর সঙ্কটে ফেলার জন্য আমাদের শত্রুরা, দুর্বাসা মুনিকে, যিনি তাঁর অযুত শিষ্যসহ ভোজন করেন, আমাদের আশ্রমে পাঠিয়েছিলেন। সেই সময় তিনি (শ্রীকৃষ্ণ), শাকান্নের অবশিষ্টমাত্র গ্রহণ করেই আমাদের রক্ষা করেছিলেন। ঐভাবে তিনি অন্ন গ্রহণ করেছিলেন বলে নদীতে স্নানরত মুনিগোষ্ঠী বিপুল পরিমাণে আহারের পরিতৃপ্তি অনুভব করেছিলেন আর সমগ্র ত্রিভুবনও তাতে পরিতৃপ্ত হয়েছিল। তাঁরই প্রভাবে আমি যুদ্ধে দেবাদিদেব মহাদেবকে এবং তাঁর পত্নী পার্বতীকে বিস্মায়ান্বিত করতে সমর্থ হয়েছিলাম। তিনি (শৈব) তখন আমার প্রতি প্রসন্ন হয়ে তাঁর নিজের অস্ত্র প্রদান করেছিলেন। অন্য দেবতারাও তাঁদের নিজের নিজের অস্ত্র আমাকে দান করেছিলেন এবং তা ছাড়াও এই শরীরেই আমি স্বর্গলোকে যেতে পেয়েছিলাম এবং দেবরাজ ইন্দ্র তাঁর সভায় আমাকে তাঁর মহান আসনের অর্ধভাগ দান করেছিলেন। যখন আমি অতিথিরূপে কয়েক দিনের জন্য স্বর্গলোকে অবস্থান করছিলাম, তখন দেবরাজ ইন্দ্রসহ সমস্ত দেবতারা নিবাতকবচ নামক এক অসুরকে সংহার করার জন্য গান্ডীবধারী আমার বাহুযগলের আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। হে আজমীঢ় রাজবংশের বংশধর, এখন আমি পরম পুরুষোত্তর ভগবানকে হারিয়েছি, যাঁর প্রভাবে আমি এত শক্তিশালী হয়েছিলাম। কৌরবদের সামরিক শক্তি ছিল বহু অজেয় প্রাণী সমন্বিত সমুদ্রের মতো এবং তার ফলে তা ছিল দুরতিক্রম। কিন্তু তাঁর সাথে বন্ধুত্বের ফলে, আমি, রথারূঢ় হয়ে তা অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছিলাম। তাঁরই কৃপার প্রভাবে আমি গোধন ফিরিয়ে আনতে এবং সমস্ত তেজের উৎস স্বরূপ বহু রাজাদের মণিময় শিরোভূষণ বলপূর্বক সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিলাম। তিনিই তাদের আয়ু হরণ করে নিয়েছিলেন এবং তিনিই যুদ্ধক্ষেত্রে ভীষ্ম, কর্ণ, দ্রোণাচার্য, শল্য প্রমুখ কৌরব রাজন্য বর্গের দ্বারা রচিত বিপুল সৈন্যসজ্জা থেকে মনোবল এবং ওজ হরণ করেছিলেন। তাদের আয়োজন এবং দক্ষতা অপর্যাপ্ত ছিল, কিন্তু তিনি (শ্রীকৃষ্ণ) রথ অগ্রভাগে চালনা করার সময়ে এই সমস্ত কার্য সম্পাদন করেছিলেন। অসুরদের অস্ত্রসমূহ যেমন নৃসিংহদেবের পরম সেবক প্রহ্লাদের অঙ্গ স্পর্শ করতে পারেনি, তেমনই তাঁর (শ্রীকৃষ্ণের) কৃপায় ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, ভূরিশ্রবা, সুশর্মা, শল্য, জয়দ্রথ এবং বাহ্লীক পৃভৃতি বীরচূড়ামণিদের প্রযুক্ত অব্যর্থ বীর্য অস্ত্র সমূহ আমার কেশ স্পর্শ করতেও সমর্থ হয়নি। যখন আমার তৃষ্ণার্ত অশ্বদের জন্য জল আনতে আমি রথ থেকে নেমেছিলাম, তখন তাঁরই কৃপায় শত্রুরা আমাকে বধন করতে দ্বিধা করেছিল। আর জগতের উদ্ধারকর্তা আমার সেই পরমেশ্বর ভগবানেরই প্রতি আমার কুমতিবসত তাঁকে আমার রথের সারথিরূপে নিযুক্ত করতে দুঃসাহসী হয়েছিলাম, কারণ শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিরা পর্যন্ত মুক্তিলাভের জন্য তাঁরই উদ্দেশ্যে ভজনা করেন এবং ভক্তিসেবা নিবেদন করে থাকেন।
“হে রাজন! সেই মাধব অঅমার প্রতি যে সমস্ত গম্ভীর অথচ সুন্দর হাসিমাখা পরিহাস বাক্য প্রয়োগ করতেন, এবং আমাকে কখনও ‘হে পার্থ, হে অর্জুন, হে সখে, হে কুরুনন্দ’ ইত্যাদিরূপে যে সমস্ত মধুময় মনোজ্ঞ সম্বোধনে সম্বোধিত করতেন, আজ সেই সব স্মরণ করে আমার হৃদয় অত্যন্ত ব্যাকুল হচ্ছে। সাধারণত আমরা দুজনে একত্রে শয়ন, উপবেশন, ভ্রমণ ও ভোজনাদি করতাম। বীরত্বব্যঞ্জক কাজের আত্ম-প্রশংসার সময়ে যদি দৈবাৎ কোন কার্যের বা বাক্যের ব্যক্তিক্রম ঘটত, তখন আমি তাঁকে “ওহে! তুমি ত বড় সত্যবাদী” এইরকম বক্রোক্তিতে তিরস্কার করতাম। কিন্তু সখা যেমন সখার এবং পিতা যেমন পুত্রের অপরাধ সহ্য করেন, সেইভাবে দেবপূজ্য পরমাত্মা হলেও তিনিও মন্দমতি আমার সমস্ত অপরাধই নিজগুণে সহ্য করতেন।”
“হে রাজশ্রেষ্ঠ, এখন আমার পরম বন্ধু, পরম সুহৃদ, পুরুষোত্তম কর্তৃক আমি ব্যক্ত হয়েছি এবং তাই আমার হৃদয় সম্পূর্ণরূপে শূণ্য বলে মনে হচ্ছে। শ্রীকৃষ্ণের অবর্তমানে তাঁর সমস্ত স্ত্রীদের আমি যখন রক্ষা করে নিয়ে আসছিলাম, তখন পথে কতকগুলি অতি নীচ গোপ এসে আমাকে অবলার মতো অনায়াসে পরাস্ত করেছে। পূর্বে রাজারা যাঁর প্রভাবে আমার কাছে মস্তক অবনত করতেন, আজ সেই ধনুক, সেই বাণ, সেই রথ ও সেই অশ্ব সমস্তই আছে এবং আমিও সেই রথীই আছি, কিন্তু যেমন বিধি মন্ত্র উচ্চারণপূর্বক ভস্মে আহুতি প্রদানের কোন ফল লাভ হয় না, যাদুর প্রভাবে সৃষ্ট ধনসম্পদ সঞ্চয়ে কোন লাভ হয় না অথবা ঊষর ভূমিতে বীজ বপন করলে কোন ফল উৎপন্ন হয় না, তেমনই শ্রীকৃষ্ণের বিরহে ক্ষণিকের মধ্যেই আমার ধনুক প্রভৃতি সমস্তই অকর্মণ্য হয়েছে; আমিও অকর্মণ্য হয়ে পড়েছি।”
“হে রাজন্, আপনি দ্বারকাপুরীর যে সুহৃদ্‌দের কথা জিজ্ঞাসা করলেন, ব্রাহ্মণদের অভিশাপে তাঁদের বিশেষভাবে মোহ উপস্থিত হয়; পরে অন্ন থেকে প্রস্তুত বারুণী নামক মদিরা পান করায় তাঁদের এমন চিত্তোন্মত্ততা উপস্থিত হয় যে, তাঁরা যেন পরস্পর পরস্পরকে চিনতে না পেরে এড়কা দন্ডের দ্বারা পরস্পরকে আঘাত করে প্রায় সকলেই নিহত হয়েছেন, এখন তাঁদের চার-পাঁচ জন অবশিষ্ট আছেন। বাস্তবিকই, পরমেশ্বর ভগবানের ইচ্ছা শক্তির প্রভাবে জীব কখনও বা পরস্পর পরস্পরকে সংহার করে বা পরস্পর পরস্পরকে পালন করে।”
“হে মহারাজ, সমুদ্রে বৃহৎ এবং অধিকতর বলশালী জলচর প্রাণীরা যেমন ক্ষুদ্র এবং দুর্বল জলচর প্রাণীদের ভক্ষণ করে, তেমনই পরমেশ্বর ভগবান সবল এবং বৃহৎ যদুদের দ্বারা দুর্বল এবং ক্ষুত্র যদুদের সংহার করিয়ে পৃথিবীর ভার লাঘব করেছেন। পরমেশ্বর ভগবান (গোবিন্দ) প্রদত্ত উপদেশগুলির প্রতি এখন আমি আকৃষ্ট হচ্ছি, কেননা এগুলি দেশ এবং কালের সমস্ত পরিস্থিতিতে হৃদয়ের তাপ প্রশমিত করার সারগর্ভ উপদেশে পূর্ণ।”
সূত গোস্বামী বললেন- “এইভাবে অত্যন্ত গভীর সৌহার্দ্য সহকারে শ্রীকৃষ্ণের চরণ কমল চিন্তা করতে করতে অর্জুনের অন্তঃকরণ শোকরহিত হয়েছিল এবং জড় জগতের সমস্ত কলুষ থেকে মুক্ত হয়েছিল। নিরন্তর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মের ধ্যান করার ফলে অতি দ্রুত গতিতে অর্জুনের ভক্তি বর্ধিত হয়েছিল এবং তাঁর মন থেকে মন থেকে সমস্ত মল বিদুরিত হয়েছিল। ভগবানের লীলাবিলাস এবং কার্যকলাপের ফলে এবং তাঁর অনুপস্থিতির ফলে, মনে হয়েছিল যেন অর্জুন তাঁর দেওয়া সমস্ত উপদেশ ভুলে গেছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা হয়নি, এবং তিনি পুনরায় তাঁর ইন্দ্রিয়সমূহের প্রভু হয়েছিলেন। এই অপ্রাকৃত সম্পদ লাভ করার ফলে তিনি দ্বিধাজনিত সমস্ত সংশয় ছিন্ন করেছিলেন। তার ফলে তিনি প্রকৃতির তিন গুণের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে নির্গুণ স্তরে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তাঁর আর জন্ম-মৃত্যুর বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার কোন সম্ভাবনা ছিল না, কারণ তিনি জড় শরীর থেকে মুক্ত হয়েছিলেন।”
“শ্রীকৃষ্ণের স্বধামে প্রত্যাবর্তনের কথা, এবং এই পৃথিবী থেকে যদুকুলের বিনাশের কথা শুনে নিশ্চলমতি মহারাজ যুধিষ্ঠির স্বগৃহে শ্রীকৃষ্ণের ধামে ফিরে যেতে স্থির সংকল্প করলেন। কুন্তীদেবীও অর্জুনের মুখে যদু বংশের বিনাশ এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অপ্রকট হওয়ার কথা শ্রবণ করে একান্ত ভক্তি সহকারে ইন্দ্রিয় জ্ঞানাতীত ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্মে তার চিত্ত সমর্পণ করে এই জড় জগৎ ত্যাগ করলেন। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার পর যেমন সেই দুটি কাঁটাকেই ফেলে দেওয়া হয়, তেমনই জন্মবিরহিত পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণও যাদবদের দ্বারা ধরিত্রীর ভারস্বরূপ অসুরদের বধন সাধন করে পৃথিবীর ভার হরণ করেছিলেন এবং তারপর তাদেরও অপ্রকট করিয়েছিলেন, কারণ তাঁর কাছে উভয়েই সমান। ঠিক যেমন একজন যাদুকর এক দেহ পরিত্যাগ করে অন্য দেহ ধারণ করে, তেমনই পরমেশ্বর ভগবান পৃথিবীর ভার হরণ করার জন্য মৎস্য-আদি বহুবিধ রূপ পরিগ্রহ করেন এবং প্রয়োজন সাধনের পর সেই সমস্ত রূপ অপ্রকট করেন। যাঁর পবিত্র যশ শ্রবণ করা বিধেয়, সেই পরম পুরুষ ভগবান মুকুন্দদেব শ্রীকৃষ্ণ যেদিন সশরীরে এই পৃথিবী পরিত্যাগ করলেন, সেইদিনই অবিবেকী জনসমূহের অমঙ্গলের কারণ যে কলি ইতিপূর্বেই কিছুটা প্রকটিত হয়েছিল, সে অপরিণত চেতনাবিশিষ্ট মানুষদের জীবনে অশুভ পরিস্থিতি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে পরিপূর্ণভাবে প্রকটিত হল। লোভ, মিথ্যা, কুটিলতা ও হিংসা প্রভৃতি অধর্মচক্র বিস্তার লাভ করতে দেখে বিজ্ঞ যুধিষ্ঠির মহারাজ বুঝলেন যে, তাঁর রাজধানীতে, রাজ্যে, গৃহে এবং দেহেও কলির সঞ্চার হচ্ছে, তাই তিনি মহাপ্রস্থান করবার উপযুক্ত বসনসমূহ পরিধান করলেন। অতঃপর, সম্রাট যুধিষ্ঠির সর্বাংশে তাঁর মতো গুণবান্, বিনীত পৌত্র পরীক্ষিতকে সসাগরা পৃথিবীর অধীশ্বররূপে হস্তিনাপুরের সিংহাসনে অভিষিক্ত করেছিলেন। তারপর তিনি অনিরুদ্ধের পুত্র (শ্রীকৃষ্ণের পৌত্র) বজ্রকে শূরসেনদের অধিপতিরূপে মথুরায় অভিষিক্ত করলেন। তারপর মহারাজ যুধিষ্ঠির প্রাজপত্য যজ্ঞের অনুষ্ঠান করে গার্হস্থ্য জীবন পরিত্যাগ করে যাওয়ার উদ্দেশ্যে আপনাতে অগ্নি আরোপ করলেন। মহারাজ যুধিষ্ঠির তৎক্ষণাৎ তাঁর বসন ও বলয়াদি রাজকীয় মর্যাদাব্যঞ্জক অলঙ্কারসমূহ পরিত্যাগ করে অহঙ্কার এবং মমতা বর্জন করলেন এবং তাঁর সব কিছুর বন্ধন ছিন্ন করলেন। তারপর তিনি বাক্-আদি ইন্দ্রিয়সমূহকে মনের মধ্যে, মনকে প্রাণে, প্রাণকে নিঃশ্বাসের অপানবায়ুতে, অপানবায়ুকে মৃত্যুতে, মৃত্যুকে পঞ্চভূতাত্মক দেহে লীন করলেন এবং জীবনের জড়জাগতিক ধারণা থেকে মুক্ত হলেন। তারপর সেই মুনি যুধিষ্ঠির পঞ্চভূতের ঐক্যস্বরূপ জড় দেহকে জড়া পৃকৃতির তিন গুণে লীন করে, সেই গুণত্রয়কে একত্বে বা অবিদ্যায় লীন করলেন এবং তারপর অবিদ্যাকে আত্মায় এবং আত্মাকে অব্যয় ব্রহ্মে লীন করলেন। তারপর যুধিষ্ঠির মহারাজ ছিন্নবস্ত্র পরিধান করে, সব রকম আহার বর্জন করে, মৌনী ভাব অবলম্বন করে, আলুলায়িত কেশ হয়ে নিজেকে জড়, উন্মাদ ও পিশাচের মতো ভাব দেখিয়ে অনুজাদি কারও অপেক্ষা না করে এবং বধিরের মতো কারও কোন কথায় কর্ণপাত না করেই গৃহ থেকে বহির্গত হলেন।”
“একাগ্রচিত্তে পরবহ্মের ধ্যান করতে করতে, যেদিকে গমন করলে আর ফিরতে হয় না, মহাত্মারা যে পথে গমন করেছিলেন, যুধিষ্ঠির মাহরাজ সেই উত্তর দিকেই গমন করলেন। অধর্মের বন্ধু কলির প্রভাবে সারা পৃথিবীর প্রজাদের অধর্ম-আচরণের পৃবৃত্তি দ্বারা আক্রান্ত দেখে যুধিষ্ঠিরের কনিষ্ঠ ভ্রাতারাও অবিচলিত চিত্তে তাঁর অনুগমন করলেন। যদিও পান্ডবেরা সকলে ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ রূপ চতুর্বর্গকে সম্যক্ রূপে আয়ত্ত করেছিলেন, তথাপি তাঁরা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চরণকমলকেই জীবের পরম পুরুষার্থ জেনে, মনে মনে তাঁরই ধ্যান ধারণা করতে লাগলেন। নিরন্তর ভগবানের কথা স্মরণ করার ফলে তাঁদের চেতনা নির্মল হওয়ায় চিদাকাশে তাঁরা পরম নারায়ণ, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শাসনাধীন চিন্ময় ধাম লাভ করেছিলেন। সেই ধাম তাঁরাই প্রাপ্ত হন, যাঁরা ঐকান্তিকভাবে ভগবানের ধ্যান করেন। গোলক বৃন্দাবন নামক ভগবানের সেই ধাম জড় বিষয়াসক্ত মানুষেরা কখনই লাভ করতে পারে না। কিন্তু পান্ডবদের সমস্ত জড় কলুষ সম্পূর্ণভাবে বিধৌত হয়েছিল বলে তাঁরা সশরীরের সেই ধাম প্রাপ্ত হয়েছিলেন। বিদুরও শ্রীকৃষ্ণের চিন্তায় আবিষ্ট হয়ে প্রভাস তীর্থে দেহ পরিত্যাগ করে পিতৃগণসহ স্বস্থানে গমন করলেন। দ্রোপদীও দেখলেন যে, তাঁর পতিদের মধ্যে কেউই তাঁর অপেক্ষা না করে একে একে সকলেই চলে গেলেন। তিনি পরমেশ্বর ভগবান বাসুদেবকে উত্তমরূপেই জানতেন। তিনি এবং সুভদ্রা উভয়েই শ্রীকৃষ্ণে একান্তভাবে চিত্ত সমর্পণ করে তাঁর পতিদেরই অনুরূপ সুফল অর্জন করলেন।”
“ভগবানের প্রিয় পাত্র পান্ডবদের এই পরম পবিত্র পরম মঙ্গলময় মহাপ্রস্থান কাহিনী যিনি শ্রদ্ধা সহকারে শ্রবণ করেন, তিনি অবশ্যই ভগবদ্ভক্তি লাভ করে পরম গতি প্রাপ্ত হন।”

Leave a Reply

April 2025
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930  

Blog Stats

  • 140,959 hits