শ্রীসূত গোস্বামী বললেন- “শ্রীকৃষ্ণ এবং অন্যান্য বন্ধুদের দর্শন করার জন্য এবং পুণ্যশ্লোক শ্রীকৃষ্ণের চরিত্র ও পরবর্তী অভিপ্রায় জানবার জন্য অর্জুন দ্বারকায় গিয়েছিলেন।”
“কয়েক মাস গত হলেও অর্জুন ফিরে এলেন না। মহারাজ যুধিষ্ঠির তখন ভয়ঙ্কর অনিষ্টসূচক অমঙ্গল চিহ্নাদি দর্শন করতে লাগলেন। তিনি দেখলেন যে, কালের গতি অত্যন্ত ভয়াবহ হয়ে উঠেছে, ঋতুগুলির ধর্ম বিপর্যন্ত হয়েছে। ক্রোধ, লোভ ও মিথ্যা সমস্ত মানুষদের প্রবৃত্তি হয়ে উঠেছে এবং সেইজন্য তারা পাপের পথ অনুসরণ করে জীবিকা নির্বাহ করতে আরম্ভ করেছে। বন্ধুদের মধ্যে সমস্ত স্বাভাবিক আদান-প্রদান এবং আচরণাদির কপটতাপূর্ণ এবং শঠতায় কলুষিত হয়ে উঠল। আর পরিবারিক ব্যাপারাদির মধ্যেও পিতামাতা, পুত্রকণ্যা, সুহৃদ্বর্গ, এমন কি ভ্রাতৃবর্গের মধ্যেও নিয়ত মতান্তর ঘটতে লাগল। পতি-পত্নীদের মধ্যে সর্বদা উৎকন্ঠা আর কলহ বিবাদ ঘটছিল। কালক্রমে, এমন হয়ে উঠল যে, লোকেরা মোটামুটি লোভ, ক্রোধ আর দম্ভে রপ্ত হয়ে পড়েছিল। এই সব অশুভ লক্ষণাদি দেখে যুধিষ্ঠির মহারাজ তাঁর ছোট ভাই ভীমসেনকে বললেন, “আমি অর্জুনকে তার বন্ধুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য এবং পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কর্মসূচী জানবার জন্য দ্বারকায় পাঠিয়েছিলাম। সাত মাস হয়ে গেল সে গেছে, তবু এখনও সে ফিরে এল না। সেখানে কি হচ্ছে, তা আমি কিছুই জনতে পারছি না। দেবর্ষি নারদ যে বলেছিলেন, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার জড়জাগতিক লীলা সংবরণ করবেন, সেই সময় কি এখনই উপস্থিত হয়েছে? ভগবান কি পৃথিবী থেকে অপ্রকট হতে চলেছেন? তাঁর কাছ থেকেই আমাদের যাবতীয় রাজকীয় ঐশ্বর্য সমৃদ্ধি সম্পদ, রাজপাট, গুণবতী স্ত্রী, জীবকুল, বংশানুক্রম, প্রজাপালন, শত্রুজয় এবং উচ্চতর গ্রহলোকাদির মধ্যে ভবিষ্যৎ সংস্থান লাভের সম্ভাবনা সব কিছুই অর্জন করেছি। এই সবই আমাদের প্রতি তাঁর অহৈতুকী কৃপার ফলেই হয়েছে।”
“দেখ দেখ, হে নরব্যাঘ্র, গ্রহনক্ষত্রাদির প্রভাবজনিত (আধিদৈবিক), জাগতিক প্রতিক্রিয়া সম্ভুত (আধিভৌতিক), এবং দৈহিক যন্ত্রণাদি থেকে উদ্ভুত (আধ্যাত্মিক) কত রকমের ভয়ঙ্কর উৎপাত উপস্থিত হয়েছে, যা আমাদের বৃদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে অদূর ভবিষ্যতের বিপদাশঙ্কার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আমার বাম ঊরু, বাম নয়ন ও বাম বাহু সবই বারংবার স্পন্দিত হচ্ছে। আশঙ্কায় আমার হৃদয়ও বারংবার কম্পিত হচ্ছে। এই সমস্তই অবাঞ্চিত অমঙ্গলের সূচনা ঈঙ্গিত করছে। হে ভীম, ঐ দেখ, এই শৃগালী মুখ থেকে অনল উদ্গার করতে করতে উদীয়মান সূর্যের দিকে তাকিয়ে বিকট আর্তনাদ করছে আর এই কুকুরটা নির্ভয় চিত্তে আমার দিকে তাকিয়ে বিকট ভাবে শব্দ করছে। হে ভীমসেন, পুরুষব্যাঘ্র, এখন গাভীদের মতো উপকারী পশুরা আমার বাম দিকে দিয়ে চলে যাচ্ছে এবং গর্দভদের মতো, নিম্নযোনির অশুভ পশুরা আমাকে প্রদক্ষিণ করছ। আমার অশ্বগণ যেন আমাকে দেখে রোদন করছে বলে মনে হচ্ছে। দেখ! এই পায়রাটিকে যেন যমদূত বলে মনে হচ্ছে। পেঁচা এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বী কাকের কর্কশ স্বরে আমার হৃদয় কম্পিত হচ্ছে। মনে হচ্ছে, তারা যেন সারা বিশ্ব ব্রহ্মান্ডকে শূন্য করে ফেলতে চাইছে। দেখ, ধূম্র কিভাবে আকাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন পৃথিবী আর পাহাড় পর্বত কাঁপছে। শোন, বিনা মেঘে বজ্রপাত হচ্ছে এবং দেখ, নীল আকাশ থেকে বিদ্যুৎ নেমে আসছে। ধুলিরাশিতে দিগন্ত অন্ধকার করে প্রচন্ড বেগে বায়ু প্রবাহিত হচ্ছে। মেঘসমূহ বিভৎরূপে চতুর্দিকে রক্ত বর্ষণ করছে। সূর্যকিরণ নিষ্প্রভ হয়ে যাচ্ছে এবং আকাশে গ্রহ-নক্ষত্রগুলি পরস্পর যুদ্ধ করছে বলে মনে হচ্ছে। বিভ্রান্ত প্রাণীরা যেন অগ্নিতে প্রজ্বলিত হয়ে ক্রন্দন করছে। নদ, নদী, সরোবর, জলাশয়াদি এবং মন সবই বিক্ষুব্ধ হচ্ছে। ঘৃতাহূতি প্রদানেও অগ্নি আর প্রজ্বলিত হচ্ছে না। এ কি দুঃসময়? জানি না, কি ঘটতে চলেছে? গোবৎসগণ আর গোমাতার স্তন পান করছে না; গাভীদের স্তন থেকেও আর দুগ্ধধারা বিগলিত হচ্ছে না। তারা অশ্রুমুখী হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে রোদন করছে এবং গোচারণ ভূমিতে বৃষগণও আর আনন্দ প্রকাশ করছে না। মন্দিরে দেবপ্রতিমাগুলি যেন ঘর্মাক্ত কলেবরে রোদন করছেন। তাঁরা যেন স্থান ত্যাগ করে চলে যেতে উদ্যত হয়েছেন। এই সমস্ত শহর, জনপদ, গ্রামগঞ্জ, খনিখামার, উদ্যান-আশ্রমাদি সবই যেন এখন শ্রী-ভ্রষ্ট এবং নিরানন্দ হয়েছে। জানি না, আরও কত বিপর্যয় আমাদের জন্যে প্রতীক্ষা করে আছে। এই সমস্ত অশুভ লক্ষণ দর্শণ করে আমার মনে হচ্ছে যে, আজ পৃথিবীর সৌভাগ্য বিনষ্ঠ হয়েছে। পরমেশ্বর ভগবানের পাদপদ্মের চরণচিহ্নে চিহ্নিত হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিল ধরিত্রী। এই সব লক্ষণাদি নির্দেশ করছে যে, তা আর থাকবে না। ”
“হে ব্রাহ্মণ শৌনক, পৃথিবীতে সেই সময়ে এই সমস্ত অশুভ লক্ষণ দর্শন করে মহারাজ যুধিষ্ঠির যখন অত্যন্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়েছিলেন, তখন অর্জুন দ্বারকাপুরী থেকে ফিরে এলেন।”
“অর্জুন যখন তাঁর চরণতলে নিপতিত হলেন, তখন মহারাজ যুধিষ্ঠির লক্ষ্য করলেন যে, তাঁর কাতরভাবে যেন অভূতপূর্ব। তাঁর মুখ ছিল অবনত ও নয়নকমল থেকে বিন্দু বিন্দু অশ্রু নেমে আসছিল।”
অর্জুনকে এই ভাবে হৃদয়স্পর্শী উদ্বেগ-উৎকন্ঠায় কান্তিহীন অবস্থায় দেখে, মহারাজ যুধিষ্ঠির নারদ মুনির ইঙ্গিত স্মরণ করে সুহৃদ্বর্গের সমক্ষে অর্জুনকে জিজ্ঞাসা করলেন- “ভাই আমাকে বল, আমাদের বন্ধুবান্ধব আর আত্মীয়-স্বজনেরা- মধু, ভোজ, দশার্হ, আর্হ, সাত্বত, অন্ধক ও বৃষ্ণিরা অর্থাৎ যদুবংশের সকলে কুশলে আছেন ত? আমার শ্রদ্ধেয় মাতামহ শূরসেন মঙ্গলে আছেন ত? আর, আমার মাতুল বসুদেব এবং তার কনিষ্ঠ ভ্রাতারা কুশলে আছেন ত? দেবকী প্রমুখ বসুদেবের সাত পত্নী পরস্পরের প্রতি ভগ্নীভাবাপন্ন। তাঁরা সকলেই তাঁদের পুত্র ও পুত্রবধুগণসহ সুখে আছেন ত? যাঁর পুত্র অত্যন্ত দুরাচারী, সেই উগ্রসেন রাজা এবং তাঁর কনিষ্ঠ সহোদর দেবক এখনো জীবিত আছেন ত? উগ্রসেন সুখে আছেন ত? হৃদীক এবং তাঁর পুত্র কৃতবর্মা, অক্রুর, জয়ন্ত, গদ, সারণ ও শত্রুজিৎ এঁরা সকলে ভাল আছেন ত? ভক্তদের প্রভু বলরাম কুশলে আছেন ত? বৃষ্ণ বংশের মহান সেনাপতি প্রদ্যুম্ন কেমন আছে? আর, যুদ্ধে অতিশয় পরাক্রমশালী, ভগবানের অংশ প্রকাশ, অনিরুদ্ধ আনন্দে আছেন ত? সুষেণ, চারুদেষ্ণ, জাম্ববতীর পুত্র সাম্ব এবং শ্রীকৃষ্ণের অন্যান্য প্রধান প্রধান পুত্রগণ ঋষভাদি তাঁদের পুত্রসহ ভাল আছেন ত? শ্রুতদেব, উদ্ধব প্রভৃতি শ্রীকৃষ্ণের অনুচরগণ এবং শ্রীবলরাম ও শ্রীকৃষ্ণের বাহুবলে সুরক্ষিত, সুনন্দ, নন্দ প্রভৃতি আমাদের অন্যান্য পরম সুহৃদ সাত্বত শ্রেষ্ঠগণ কুশলে আছেন ত? তারা আমাদের কুশল চিন্তা করেন ত? সেই ব্রাহ্মণদের হিতকারী ভক্তবৎসল গোবিন্দ, পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দ্বারকা পুরীতে সুধর্মা নামক সভায় সুহৃদবর্গ পরিবেশিত হয়ে সুখে আছেন ত?”
“আদি পুরুষ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সারা জগতের মঙ্গল সাধন, প্রতিপালন এবং উন্নতি সাধনের উদ্দেশ্যে যদুকুলরূপ সমুদ্রের মধ্যে অনন্তদেব বলরামসহ অবস্থান করছেন। আর যদুবংশীয়রা শ্রীকৃষ্ণের বাহুবলের দ্বারা সংরক্ষিত আর নিজনগরী দ্বারকাপুরীতে বৈকুন্ঠনাথের অনুচরবর্গের মতো ত্রিলোক পূজিত হয়ে পরম আনন্দে বিহার করছেন। সত্যভামা প্রমুখ দ্বারকার মহিষীগণ ভগবানের চরণ-সেবারূপ মুখ্য কর্ম সম্পাদন করে ভগবানকে দেবতাদের পরাভূত করতে প্ররোচিত করেছিলেন। এইভাবে তাঁর মহিষীরা ইন্দ্রপতি শচীদেবীর ভোগযোগ্য (পারিজাত পুষ্প) উপভোগ করেন। যদুবীরগণ পরমেশ্বর ভগবানের বাহুবলের প্রভাবে প্রতিপালিত হয়ে সর্বতোভাবে ভয়হীন হয়ে থাকেন, আর তাই শ্রেষ্ঠ দেবতাদের যোগ্য এবং বলপূর্বক অধিকৃত সুধর্মা নামে সভাগৃহটিতে তাঁরা তাঁদের চরণ দ্বারা পদদলিত করে বিচরণ করেন।”
“হে ভ্রাতা অর্জুন, তোমার নিজের সমস্ত কুশল ত? তোমার শারীরিক দীপ্তি নষ্ট হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। তুমি দীর্ঘকাল দ্বারকায় ছিলে বলে কি তাঁরা তোমায় অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছেন বা তোমার যথোচিত সম্মান রক্ষা করেননি? কেউ কি তোমাকে অপ্রীতিকর অশুভ কথা বলেছে কিংবা যে কিছু প্রার্থনা করেছে, তাঁকে দাক্ষিণ্য দেখাতে পারনি, কিংবা কাউকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে তুমি কি তা পূর্ণ করতে পারনি? তুমি সর্বদাই শরণাগত যোগ্য জীবমাত্রেই আশ্রয় প্রদান করে থাক। আজ কি কোন শরণাগত ব্রাহ্মণ, বালক, গাভী, বৃদ্ধ, রোগী, স্ত্রীলোক কিংবা অন্য কোন প্রাণীকে আশ্রয়দানে অক্ষম হয়েছ? তুমি কি কোন অগম্য স্ত্রীতে গমন করেছ? কিংবা, কোন গম্য স্ত্রীলোকের প্রতি যথাযথ আচরণ করনি? অথবা পথে তোমার সমকক্ষ বা তোমার থেকে অধম ব্যক্তির কাছে পরাজিত হয়েছ? তোমার সাথে একত্রে ভোজন করবার যোগ্য বৃদ্ধ বা বালকদের তুমি কি যত্ন নাওনি? তাদের বাদ দিয়ে তুমি কি একাই ভোজন করেছ? ক্ষমার অযোগ্য কোনও গর্হিত কর্ম কি তুমি করেছ? অথবা, তোমার প্রতি প্রিয়তম সখা শ্রীকৃষ্ণের বিরহে তুমি কি শূণ্যতা বোধ করছ? হে অর্জুন ভাই, এ ছাড়া তোমার এই রকম অশান্তির আর কোনও কারণই আমি ভাবতে পারছি না।
চতুর্দশ অধ্যায়- শ্রীকৃষ্ণের তিরোধান লীলা
13 Apr 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, প্রথম স্কন্ধ- সৃষ্টি