একবার শ্রীকৃষ্ণের সেবা করলেই তিনি আমাদের মনে রাখবেন

শ্রীকৃষ্ণ নিজে ভগবদ্‌গীতায় বলছেন যে, বহু বহু জন্ম পরে, যে ব্যক্তি প্রকৃত জ্ঞান প্রাপ্ত হতে পারেন তিনি আমার প্রতি আত্মসমর্পণ করেন। এই জ্ঞানটি হল- বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণই হলেন সমস্ত কিছু। অথর্ব বেদে একথা উল্লেখ আছে।
জন্ম জন্ম ধরে জ্ঞানের সন্ধানে কঠোর তপশ্চর্যা করে প্রকৃত জ্ঞান লাভ করা যায়- তখন তাকে জ্ঞানী বলা হয়। অবশেষে জ্ঞানী যখন জানতে পারেন যে, পরম জ্ঞানটি হল- বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণই সব কিছু তখন সে আত্মসমর্পণ করতে চায় এবং ভক্তে পরিণত হয়। ‘ভক্ত’ মানে, যে আত্মসমর্পিত।
একবার যে আত্মসমর্পণ করে, শ্রীকৃষ্ণ তার নিষ্ঠা দেখে তাকে সমস্ত জ্ঞান দান করেন। সেই রকম ব্যক্তির লক্ষণ হল ‘মৎচিত্ত মদ্‌গতপ্রাণ’- তাঁর মন সব সময়ে শ্রীকৃষ্ণে নিবিষ্ট এবং জীবন সম্পূর্ণ রূপে শ্রীকৃষ্ণের সেবায় নিয়োজিত। এই রকম ভক্তের চব্বিশ ঘন্টা নিজেদের মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের আলোচনা করে পরস্পর উদ্দীপ্ত বোধ করেন। সময়, স্থান বা পরিস্থিতির বিচার তাঁদের থাকে না। শ্রীকৃষ্ণের প্রতি এই রকম ভক্তিপূর্ণ ভালবাসার দারুন হৃদয়ের অভ্যন্তর থেকে শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের বুদ্ধি প্রদান করেন যাতে তাঁরা তাঁর কাছে ফিরে আসতে পারেন।
সেইটিই আমাদের উদ্দেশ্য। কিন্তু যাঁরা কেবলই তপশ্চর্যা অনুশীলন করে অথচ আত্মসমর্পণ করতে জানে না, শ্রীকৃষ্ণ তাদের প্রতি অতটা কৃপা প্রদর্শন করেন না। কারণ একটি পর্যায়ে পৌছে তারা ভাববে- আমি একজন সাধক, পরম শক্তির অধিকারী আমি।
মায়াবাদীরা ভাবে, ব্রহ্মই পরম সত্য। জীবের প্রকৃতিগত অবস্থা যেহেতু ভগবানের দাসরূপে, এবং তিনিই হলেন পরম পুরুষ শ্রীকৃষ্ণ, তাই ভগবানের সেবা, ভক্ত এবং শ্রীকৃষ্ণ- এই তিনটি বস্তু নিত্য, চিরশাশ্বত।
যারা ভগবানের চরণকমলের সেবা করে না, তার ব্রহ্মজ্যোতি প্রাপ্ত হতে পারলেও ভগবানের সেবায় অবহেলা করার ফলের আবার পতিত হয়।
অতএব সর্ব প্রথম নিজেকে সঠিক স্থানে বসাতে হবে যে, আমি ভগবানের নিত্যদাস। জগতের অনিত্য সব কিছু ভগবানের আনন্দ বর্ধনের জন্য কাজে লাগানো ছাড়া এখানে আমার আর কোনও কাজ নেই। এইভাবে সম্পূর্ণরূপে শ্রীকৃষ্ণের আনন্দের উদ্দেশ্যে নিয়োজিত হতে পারলে নির্মল হওয়া যায়। অর্থাৎ ইন্দ্রিয়গুলিকে ইন্দ্রিয়ের মালিক হৃষীকেশের আনন্দ উৎপাদনের জন্য নিয়োগ করতে হবে- এটিই ভক্তি।
প্রকৃত জ্ঞান লাভ করলে সব কিছু সঠিক দৃষ্টিভগিঙ্গতে দর্শন করা যায়, এবং তখন দেখা যায় যে, সকলে নিদ্রামগ্ন। দ্বিজমনি গৌরাঙ্গদেব বলেছেন- ‘জীব জাগো জীব জাগো (গোরাচাঁদ বলে) কত নিদ্রা যাও মায়া-পিশাচীর কোলে”- ‘কোল’ বলতে স্নেহ মমতা বোঝায়।
লোকে ভাবে- খাচ্ছি দাচ্ছি আমি তো বেশ আছি। কিন্তু এটা হল জড় অস্তিত্ব। আধ্যাত্মিক বা দিব্য অস্তিত্ব মানে হল ইন্দ্রিয়কে সংযত করা, ইন্দ্রিয় ভোগ বন্ধ করা, তবেই সে আলোক প্রাপ্ত হতে পারবে। যে ভক্তিমূলক সেবা চর্চা করে, তার প্রকৃত জ্ঞান রয়েছে। সে জানে শ্রীকৃষ্ণ হলেন প্রভু, আর সকলেই তাঁর সেবক এবং তাঁদের কর্তব্য তাঁর সেবা করা। যখন আমি এই দেহ এবং এই জগৎ ত্যাগ করব, আমাকে অন্য কোথাও যেতে হবে।
গজেন্দ্র-র কাহিনীতে আমরা দেখি, গত জন্মে সে পারমার্থিক ক্রিয়াকলাপ অনুশীলন করত। তাই এই জন্মে বিশাল হাতির দেহ পেয়ে সে হাতিদের রাজা হয়েছিল। ত্রিকূট পাহাড়ের কাছে মনোরম এক পদ্ম সরোবরে সে সঙ্গিনীদের নিয়ে খেলা করছিল। সকলেই তার নিজের নিজের স্থান মর্যাদা অনুসারে আনন্দ উপভোগ করতে চায়, এবং একটা সময় আসেই, যখন অনেক দুঃখ-দুর্দশা নেমে আসা। গত জন্মে যদি কিছু সেবা করা থাকে, তা হলে ভগবান তাকে মনে রাখেন। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, কেউ যদি অল্প মাত্রই তাঁর সেবা করে, তিনি তা ভুলেন না।
তাই জলের মধ্যে ক্রীড়ারত হাতিটি হঠাৎ টের পেল- সে এক কুমিরের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। জলের মধ্যে কুমিরের ক্ষমতা অসীম। কথায় আছে- ‘জলে থেকে কুমেিরর সাথে ঝগড়া করা চলে না,’ কারণ জলই তার অংশ। হাতিও খুব বলশালী, কিন্তু সেটা ডাঙায়।
তবে, যে মুহূর্তে আমরা আমাদের ইন্দ্রিযগুলি শ্রীশ্রীরাধামাধবের সেবায় কাজে লাগাই, তখনি আমরা আধ্যাত্মিক চিন্ময় স্তরে পৌছে যাই। এই প্রসঙ্গে বৈষ্ণব-শিরোমণি শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর বলেছেন- সেই চিন্ময় স্তরে কোনও ভয়, কোনও দুঃখ থাকেবে না, সব কিছু আনন্দময়, প্রতি মুহূর্তে অমৃতময় মনে হবে।
যাই হোক, সেই হাতিটি যখন কুমিরের সাথে যুদ্ধ করছিল, তার কোনও সঙ্গিনী হাতি তাকে সাহায্য করতে এল না। জড় জগৎ এর রকইম, আমাদের তথাকথিত নিকট-আপনজনেরা আমাদের সাহায্য করতে পারে না। কিন্তু আমরা যদি পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কোনও সেবা করে থাকি, তবে তিনি আমাদের মনে রাখবেন; এবং আমরা যদি তাঁকে আত্মসমর্পণ করি, তিনি আমাদের সাহার্য করবেন।
এইভাবে গজেন্দ্র খবুই দুর্দশায় পড়েছিল, কুমিরটা তার রক্ত খেয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল, হাতিটি খানিক পরে ক্রমশই নিস্তেজ হয়ে আসছিল। জড়জাগতিক অস্তিত্বে এমনটিই হয়। আমরা বুদ্ধিমত্তা দিয়ে শক্তি, ক্ষমতা, সঞ্চয় দিয়ে বুঝি চলি। বার বার পরিকল্পনা করি, জড়জাগতিক নিয়মে বার বার তা অসফল হয়ে যায়। আমরা হতাশ হয়ে পড়ি, সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
গজেন্দ্রের পরিস্থিতি এমনই হয়েছিল- আর্তবন্ধু। কে হতাশায় ভোগে না? সকলেই ভোগে। কিন্তু বন্ধুটি কে? পরম পুরুষোত্তম ভগবান- শ্রীকৃষ্ণ। তিনি আমাদের পরম শুভাকাক্সক্ষী। এই সমস্ত যে বিশ্বাস করতে পারে, সে তখনই শান্তি বোধ করে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণই সব কিছুর পরম ভোক্তা, সমস্ত ভোগের একমাত্র অধিকারী। আমাদের বিশ্বাসও আনুগত্য অনুসারে সেই উপলব্ধি আসে, সেটা খুবই জরুরী। তাই বিপদের মাঝেও আমরা কৃষ্ণভাবনায় ভরসা রেখে নির্বিঘ্নে সব কাজ করতে পারি।
অবশেষে তার অতীত জীবনের কথা গজেন্দ্রের স্মরণে এল- যখন সে পূজা প্রার্থনা করত: এবং তাই পদ্মের পরিপূর্ণ স্নিগ্ধ সরোবর থেকে একটি পদ্মফুল শুঁড়ে করে তুলে নিয়ে সে ভগবানকে নিবেদন করল।
ভগবান বলেছেন- কেউ যদি ভালবাসা ও ভক্তি সহকারে একটি পত্র, পুষ্প, ফল বা জল আমাকে অর্পণ করে, তা আমি গ্রহণ করি সেটা আমার কাছে খুব প্রিয়। আমার সেইটাই অনুশীলন করছি- সেটা এমনিতেই আমাদের ভেতরে রয়েছে কারণ স্বরূপে আমাদের স্থানটাই ঐ রকম। আমরা ভুলে গেছি, তাই অন্ধকারে নিদ্রামগ্ন হয়ে আছি। কিন্তু যখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে আত্মসমর্পণ করি, এবং দেখেন যে, আমরা নিষ্ঠাবান হতে চেষ্টা করছি, তখন তিনি আমাদের যথার্থ শুদ্ধ জ্ঞান প্রদান করে অন্ধকার দূর করেন। যতক্ষণ ঘুমিয়ে থাকব, ততক্ষণ জানতে পারব না আমাদের কি করা কর্তব্য। অন্ধ লোকের কাছে দিন আর রাতের তফাৎ কি? বেদে বলা হয়েছে- উত্তিষ্ঠিত জাগ্রত- জেগে ওঠ, তোমার লক্ষ্যে পৌছাবার জন্য সচেষ্ট হও। শ্রীচৈত্য মহাপ্রভু একই কথা বলেছেন-
“জীব জাগো জীব জাগো গোরাচাঁদ বলে।
কত নিদ্রা যাও মায়াপিশাচীর কোলে ।।
এনেছি ওষধি মায়া নাশিবার লাগি
হরিনাম মহামন্ত্র লও তুমি মাগি ।।”

Leave a Reply

March 2025
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  

Blog Stats

  • 140,963 hits