শ্রীমদ্ভাগবতের নবম স্কন্ধে শ্রীল ব্যাসদেব ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের আবির্ভাবের বর্ণনা করেছেন।
ভগবান শ্রীরামচন্দ্র রঘুবংশে আবির্ভূত হয়েছিলেন। শ্রীল ব্যাসদেব শ্রীমদ্ভাগবতের নবম স্কন্ধের দশম অধ্যায়ে রাবণ বধ ও লঙ্কা বিজয় করে শ্রীরামচন্দ্রের অযোধ্যায় ফিরে আসার কাহিনীর বিবরণ দিয়েছেন।
ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের দিব্য-লীলা সমূহ তত্ত্বদর্শী মহামুনি বাল্মীকি তাঁর রচিত রামায়ণ-এ লিপিবদ্ধ করেছেন। শ্রীল শুকদেব গোস্বামী সংক্ষেপে মহারাজ পরীক্ষিতের কাছে তা বর্ণনা করেছেন।
সূর্যবংশে মহারাজ রঘু জন্মগ্রহণ করেন। রঘুর পুত্রের নাম ছিল অজ, অজর পুত্রের নাম ছিল দশরথ।
পরমেশ্বর ভগবান মহারাজ দশরথের পুত্ররূপে জগতে আবির্ভূত হন ও বহু দিব্য-লীলাবিলাস করেন। দেবকুলের প্রার্থনায় তুষ্ট হয়ে পরম-ব্রহ্ম পরম সত্য পরমেশ্বর ভগবান তাঁর অংশ ও অংশকলাসহ শ্রীরাম, লক্ষন, ভরত ও শত্রুঘœ নামে মহারাজ দশরথের পুত্ররূপে জগতে আবির্ভূত হয়েছিলেন।
ভগবানের অংশ ও অংশের অংশ বা কলারূপে তাঁর অনন্ত রূপ আছে। শ্রীব্রহ্মসংহিতায় এই কথা উল্লেখ করা হয়েছে–অদ্বৈতমচ্যুতমনাদিমনন্তরূপম্। শ্রীরাম, লক্ষণ, ভরত ও শত্রুঘ্ন–এঁরা সকলেই বিষ্ণুতত্ত্ব, এঁরা সকলেই ভগবানের সৃষ্টির যে-কোন জায়গায় বিরাজ করতে পারেন। এগুলি ভগবানের স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বরূপে নিত্য বিরাজমান। এঁরা সর্বশক্তিমান। দশাবতার স্তোত্রে বৈষ্ণব কবি শ্রীল জয়দেব গোস্বামী ভগবানের বন্দনা করে লিখেছেন–
বিতরসি দিক্ষুরণে দিক্পতিকমনীয়ং
কেশব ধৃত-রামশরীর জয় জগদীশ হরে ॥
হে কেশব! আপনি রাম আকৃতি পরিগ্রহ করে, রাবণের দশমুন্ড ছেদন করে রমণীয় বলিস্বরূপ দিব্্পতিগণকে উপহার দিয়েছিলেন। হে জগদীশ! হে হরে। রামশরীরধারী আপনার জয় হোক!
পত্নী কৈকেয়ীর কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ পিতা মহারাজ দশরথের আদেশ পালনের উদ্দেশ্যে একজন মুক্তাত্মার মতো ভগবান শ্রীরামচন্দ্র সীতাদেবীকে নিয়ে রাজ্য, ঐশ্বর্য, প্রিয়জন, সুহৃৎ, প্রাসাদাদি সব কিছুই পরিত্যাগ করে বনে গমন করেছিলেন।
মহারাজ দশরথের কৌশল্যা, কৈকেয়ী ও সুমিত্রা নামে তিন পত্নী ছিল। মহারাজ দশরথ একসময় রাণী কৈকেয়ীর সেবায় অতীব তুষ্ট হয়ে তাকে বর প্রার্থনা করতে বলেন। রাণী কৈকেয়ী অন্য সময়ে এই বর প্রার্থনা করবেন বলে জানান। পরে শ্রীরামচন্দ্রের রাজ্য অভিষেকের সময় উপস্থিত হলে, কৈকেয়ী মহারাজ দশরথের কাছে এই দাবী করেন যে তাঁর পুত্র ভরতকে রাজসিংহাসন দিতে হবে ও শ্রীরামকে বনে পাঠাতে হবে। দশরথ মর্মাহত ও শোকাকুল হলেন। পত্নীর নির্দেশে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ দশরথ স্নেহের পুত্র শ্রীরামকে বনে গমন করতে বললেন। একান্ত অনুগত শ্রীরাম নিঃসঙ্কোচে তৎক্ষণাৎ পিতার আদেশ পালন করে সমস্ত জড়-জাগতিক আকর্ষণে নিস্পৃহ মুক্তাত্মার মতো রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে বনে গমন করেন।
কঠোর জীবন যাপন কালে বনে ভ্রমণরত শ্রীরামচন্দ্র অপরাজেয় ধনুর্বানসহ রাবণের কামাতুরা ভগ্নী শূর্পনখার নাসিকা ও কর্ণ ছেদন করেছিলেন, এবং খর, ত্রিশির, দূষনাদি চৌদ্দ হাজার রাক্ষসদেরও শ্রীরাম বধ করেছিলেন।
শ্রীমদ্ভাগবতের নবম স্বন্ধের দশম অধ্যাযের দশম শ্লোকে উল্লেখ করা হয়েছে–
সীতাকথাশ্রবণদীপিতহৃচ্ছয়েন
অর্থাৎ, পরমা সুন্দরী সীতাদেবীর কথা শুনে রাবণের চিত্ত কামানলে প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠেছিল। সে এক হীন উপায়ে সীতাদেবীকে অপহরণ করেছিল। সীতা হরণের সময় আকাশ-পথে জটায়ু সীতাদেবীকে দেখতে পায় ও রাক্ষসাধম রাবণকে বাধা দেয়। প্রবল পরাক্রমশালী রাবণের সঙ্গে সংগ্রামে জটায়ু পক্ষহীন ও ধরাশায়ী হয়। সীতার খোঁজে শ্রীরামচন্দ্র বনের মধ্যে মৃতপ্রায় জটায়ুর কাছে রাবণের সীতাহরণের সংবাদ পান।
ওঁ বিষ্ণুপাদ পরমহংস পরিব্রাজকাচার্য শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ এই সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন যে, নীতিশাস্ত্র অনুযায়ী পথে ‘নারীং বিবর্জিতা’–অর্থাৎ দূর দেশে যাত্রার সময় নারীকে সঙ্গে আনা উচিত নয়। পূর্বে যানবাহন ছাড়া জনগণ দূরদেশে যাত্রা করত, তবু যতদূর সম্ভব গৃহত্যাগের সময় পত্নীকে সঙ্গে নেয়া উচিত নয়, বিশেষত পিতার আদেশে নির্বাসিত শ্রীরামচন্দ্রের মতো অবস্থায়।
ভগবান শ্রীরাম জড়-জগতের অতীত; তাই শাস্ত্রে আছে ‘নারায়ণঃ পরোহব্যক্তৎ।’ শ্রীরামচন্দ্রের এই অবস্থা সম্পূর্ণ চিন্ময়। এখানে আমাদের শিক্ষণীয় হচ্ছে যে, জড় জগতের নারীর প্রতি আসক্তি সর্বদাই সমস্যা ও বিপদ ডেকে আনে।
ভগবান শ্রীরামচন্দ্র হচ্ছেন জড়-জগতের স্রষ্টা’ তাই তিনি কখনও জড়-মায়ার অধীন নন। বৈষ্ণবাচার্যের মতে শ্রীরামচন্দ্রের এই সীতাবিরহ হচ্ছে ভগবানের হ্লাদিনী শক্তির অন্তর্গত বিপ্রলম্ভ-ভাব। ভগবান ব্যক্তিত্বহীন নন্, তিনি নিঃশক্তিকও নন্। পক্ষান্তরে তিনি এক সবিশেষ তত্ত্ব। তিনি সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ।
প্রকৃতপক্ষে রাবণ সীতাদেবীর অপছায়া মায়া সীতাকে হরণ করেছিল। অগ্নি পরীক্ষার সময় মায়াসীতা ভস্মীভূত হয়েছিল, চিন্ময় সীতাদেবী অগ্নি থেকে প্রকাশিত হয়েছিলেন। তাই রাবনের পক্ষে প্রকৃত সীতাকে হরণ তো দূরের কথা, স্পর্শ করা পর্যন্ত সম্ভব হয়নি।
লোকপিতা ব্রহ্মা ও দেবাদিদেব শিবের উপাস্য শ্রীরামচন্দ্র নরলীলার ন্যায় শাস্ত্রীয় বিধি অনুযায়ী পুত্রের মতো রাবণের সঙ্গে যুদ্ধে নিহত জটায়ুর দাহকার্য সমাপন করে, প্রিয়তমা সীতাদেবীকে উদ্ধারের উদ্দেশ্যে বানরদের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করেন। জটায়ুর দাহকার্য করবার পর তিনি কবন্ধ নামে অসুরকে বধ করেন।
মূর্তিমান সমুদ্রের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের উদ্দেশ্যে, সমুদ্রতীরে উপস্থিত হয়ে শ্রীরামচন্দ্র তিনদিন ধরে উপবাস করেছিলেন। মূর্তিমান সমুদ্রের অনুপস্থিতির ফলে শ্রীরাম কটাক্ষপাত দ্বারা যে দিব্য ক্রোধ লীলা প্রদর্শন করেন, তার ভয়ে নত্রু-মকর আদি জলজন্তুরা সম্ভ্রস্ত হয়ে উঠে। ভীত মূর্তিমান সমুদ্র অর্ঘ্যাদি পূজোপহার মস্তকে ধারণ করে ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের পাদপদ্মে আগমন করে বলেন–“হে ভগবান, আমরা জড়-বুদ্ধি সম্পন্ন, তাই আপনাকে বুঝতে পারিনি, কিন্তু এখন বুঝেছি যে আপনি হচ্ছেন আদি পুরুষ। ত্রিজগতের অধীশ্বর। দেবতারা সত্ত্বগুণাধীন, প্রজাপতিরা রজোগুণাধীন, ভূতপতিরা তমোগুণাধীন, কিন্তু আপনি সকল গুণের অধীশ্বর।”
এখানে যে ‘জড়ধিয়ো’ বা জড়বুদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে সে সম্বন্ধে শ্রীল প্রভুপাদ মন্তব্য করেছেন যে–“এটি হচ্ছে পাশবিক বুদ্ধি; এই রকম বুদ্ধি দিয়ে পরমেশ্বর ভগবানকে জানা যায় না–ভগবৎ উপলব্ধি হয় না।” যেমন প্রহার ছাড়া পশু মনিবের উদ্দেশ্য বুঝতে পারে না, সেই রকম জড়বুদ্ধি-সম্পন্ন মানুষ পরমেশ্বর ভগবানকে জানতে পারে না। তবে গুণময়ী প্রকৃতির কঠোর শাসনে মানুষ ভগবানকে বুঝতে শুরু করে। এই প্রসঙ্গে এক হিন্দিভাষী কবির বাণী বিশেষ উল্লেখযোগ্য–
দুঃখসে সব হরি ভজে সুখসে ভজে কৈ।
সুখসে আগর হরি ভজে দুঃখ কাহাঁসে হ্যায় ॥
অর্থাৎ, দুঃখের সময় মানুষ হরিভজন করতে মন্দিরে যায়, কিন্তু আর্থিক স্বচ্ছলতার সময় মানুষ ভগবান শ্রীহরিকে ভুলে যায়। এ জন্য ভগবান শ্রীহরির গুণময়ী প্রকৃতির দ্বারা মানব-সমাজ দন্ডনীয় কেন না মানব-সমাজকে দন্ড না দিলে, জড় বুদ্ধি বশত মানবজাতি পরম নিয়ন্তা ভগবানকে ভুলে যায়।
মূর্তিমান সমুদ্র আরো বলল, হে ভগবান, আপনি স্বেচ্ছায় এই স্থানের জল ব্যবহার করুন। আপনি সমুদ্র অতিক্রম করে ত্রিলোকে ক্লেশদায়ক রাবণের রাজ্যে প্রবেশ করুন। পুত্র হলেও বিশ্রবা মুনির মূত্রের মতো রাবণকে বধ করে পত্নী সীতাদেবীকে পুনরুদ্ধার করুন। হে বীরশ্রেষ্ঠ, এই সমুদ্র লঙ্কাযাত্রায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করলেও, আপনার দিব্য যশোরাশি বিস্তারের উদ্দেশ্যে এই সাগরের উপর সেতু তৈরী করুন। বীর রাজন্যবর্গ ভবিষ্যতে আপনার এই অসাধারণ ও অত্যাশ্চর্য লীলাবিলাস দর্শন করে আপনার গুণকীর্তন করবে।
বানর সেনাপতির করস্পর্শে প্রকম্পিত বৃক্ষরাশিপূর্ণ পর্বতশৃঙ্গ সমুদ্রজলে নিক্ষেপ করে সেতুবন্ধন করে শ্রীরাম লঙ্কায় প্রবেশ করেন, হনুমান পূর্বে যে লঙ্কাপুরীকে অগ্নি দগ্ধ করেছিল, রাবণের ভ্রাতা বিভীষণের পরামর্শে সুগ্রীব, নীল ও হনুমানাদি বানর সেনাপ্রধান সহ শ্রীরাম সেই লঙ্কাপুরীতে প্রবেশ করেন।
এখানে রাবণকে বিশ্রবা মুনির মুত্রের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, কথায় বলে পুত্র ও মূত্রের উৎস এক– তা হচ্ছে জননেন্দ্রিয়। কিন্তু পুত্র কৃষ্ণভক্ত হলে সে বংশের গৌরব বৃদ্ধি করে, আর অযোগ্য হলে সে মূত্রের মতো হেয়। এই রকম হেয় রাবণকে শ্রীরাম বধ করুন, এইটি মূর্তিমান সমুদ্রের ইচ্ছা।
ভগবদ্গীতায় (৪/৯) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন–
জন্ম কর্ম চ মে দিব্যমেবং যো বেত্তি তত্ত্বতঃ।
ত্যক্তা দেহং পুনর্জন্ম নৈতি মামেতি সোহর্জুন ॥
ভগবানের এই উক্তি থেকে প্রতিপন্ন হয়, ভগবানের কার্যাবলী সবই অসাধারণ দিব্য ও অদ্ভুত। ভগবান হচ্ছেন সর্বশক্তিমান, এই জন্য শাস্ত্রে এই সব কার্যাবলী উল্লেখ করা হয়েছে।
আজকাল প্রায়ই একটু যাদু, ভোজবাজী বা ম্যাজিক দেখিয়ে মূর্খ জনসাধারণের কাছে যে সব ভগবান নির্বাচন করা হচ্ছে, তারা যে প্রকৃতপক্ষে ভগবান নয়–আসলে মেকি, কৃত্রিম তা ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের সেতুবন্ধনলীলার অসাধারণ কার্যদ্বারা আমাদের শিক্ষা দান করে গেছেন। যে কোন কাজ অসম্ভব হলেও ভগবানের পক্ষে সবই সম্ভব কারণ তিনি সর্বশক্তিমান। ব্রহ্মসংহিতায় উল্লেখ করা হয়েছে–
যস্যাজ্ঞয়া ভ্রমতি সংভৃতকালচক্রো
ভগবানের ইচ্ছায় বিশাল সূর্য মহাকাশে ভ্রমণ করে চলেছে; এই রকম তুচ্ছ ভারহীন তুলাখন্ডের মতো অসংখ্য গ্রহ, নক্ষত্র আকাশে ভগবদিচ্ছায় ভাসমান হতে পারলে, সমুদ্রে বানর সেনাদের নিক্ষিপ্ত বৃক্ষ লতাপূর্ণ বিরাট বিরাট পর্বতশৃঙ্গ ভগবদিচ্ছায় ভাসমান হবে না কেন?
লঙ্কায় প্রবেশ করে সুগ্রীব, নীল, হনুমান আদির নেতৃত্বে বানরসেনারা ক্রীড়াস্থল, ধান্যাগার, কোষ, গৃহদ্বার, সভাগৃহ, প্রাসাদের অগ্রভাগ, কপোতকক্ষ অধিকার করে নেয়। লঙ্কাপুরীর জনপথের সংযোগস্থল, বেদী, প্রাসাদের উপর পতাকা, স্বর্ণকলস আদি ধ্বংস করা হলে সমগ্র লঙ্কাপুরীকে হস্তীকুলদ্বারা বিধ্বস্ত এক নদীর মতো দেখাচ্ছিল। এই সব দেখে রাক্ষসরাজ রাবণ নিকুম্ভ, কুম্ভ, ধু¤্রাক্ষ, দুর্ম্মুখ, সুরান্তক, নরান্তক, আদি রাক্ষস ও পুত্র ইন্দ্রজিৎ এবং পরে প্রহস্ত, অতিকায়, বিকম্পন ও অবশেষে কুম্ভকর্ণকে ডেকে শত্রুদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য উত্তেজিত করেন।
লক্ষণ, সুগ্রীব, গন্ধমাদ, নীল, অঙ্গদ, জাম্ববান ও পানসাসি সহ রামচন্দ্রের অসি, শূল, ধনুক, প্রাস, ঋষ্টি, শক্তিশর, খড়গ ইত্যাদি ভীষণ অস্ত্রে সজ্জিত রাক্ষস সেনাদের আক্রমণ করেছিলেন।
অঙ্গদাদি বানর সেনাপ্রধানরা হস্তী, পদাতিক, রথ ও অশ্ব–চার রকম রাবণ সৈন্যদের সম্মুখীণ হয়ে বিশাল বৃক্ষ, পর্বতশৃঙ্গ, গদা ও শর নিক্ষেপ করেছিল। এইভাবে সীতাদেবীর ক্রোধে হৃতমঙ্গল রাবণের সেনাকুল ধ্বংস হয়েছিল। নিজ সেনানী ধ্বংস হতে দেখে ক্রোধানলে প্রজ্জ্বলিত রাক্ষসরাজ রাবণ পুষ্পক বিমানে আরোহন করে শ্রীরামচন্দ্রের দিকে ধাবিত হয় এবং তাঁকে তীক্ষ্ণ শরদ্বারা আঘাত করেন।
এই সম্পর্কে শ্রীল প্রভুপাদ মন্তব্য করেছেন যে, রাবণের সৈন্যরা আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত; আর শ্রীরামের সৈন্যরা ছিল বানর, তাদের উপযুক্ত অস্ত্রশস্ত্র ছিল না। শুধু শ্রীরাম ও লক্ষণেরই ধনুর্বাণ ছিল। বানর সেনারা শুধু পাথর, বৃক্ষ ও পর্বত-শৃঙ্গ অস্ত্ররূপে ব্যবহার করেছিল, মা সীতাদেবীর অভিশাপের ফলেই রাক্ষসরা সহজেই বানরসেনা দ্বারা ধ্বংস হয়। বল বা শক্তি দু’রকম-দৈব ও পুরুষাকার। দৈব বল জড়-জাগতিক বুদ্ধি বল অপেক্ষা শ্রেয়। এমন কি আধুনিক অস্ত্রশাস্ত্রে সজ্জিত না হলেও, ভগবৎ কৃপার উপর নির্ভর করে শত্রুর সঙ্গে সংগ্রাম করতে হবে, সমস্ত শক্তি দিয়ে শত্রুর সঙ্গে লড়াই করতে হবে, কিন্তু সাফল্যের জন্য ভগবান শ্রীহরি উপর নির্ভর করতে হবে। ভগবান এই শিক্ষাই দিয়েছেন ভগবদ্গীতায়–‘মাম্ অনুস্মর যুদ্ধ চ’–ভক্তশ্রেষ্ঠ অর্জুন এই উপদেশ পালন করে যুদ্ধে জয় লাভ করেছিলেন।
তারপর শ্রীরামচন্দ্র রাবণকে কঠোর ভাষায় তিরস্কার করে বললেন, তুই হীনচেতা রাক্ষস পুরীষ, কুকুরের মতো আমার অনুপস্থিতিতে আমার পত্নী সীতাকে অপহরণ করেছিস্, তুই নির্লজ্জ, জঘন্য পাপী, তাই যমরাজ যেমন পাপীকে দন্ডদান করে, আজ অলঙ্ঘ্য বীর্য আমিও তোকে সমুচিত দন্ড দিব। এইভাবে তীব্র ভাষায় ভর্ৎসনা করে শ্রীরামচন্দ্র রাবণকে লক্ষ করে যে বাণ নিক্ষেপ করলেন, তা বজ্রের মতো রাবণের হৃদয় বিদীর্ণ করল। দশানন রাবণ বিমান থেকে ভূপতিত হল। অনুগামী রাক্ষসও রাবণের পতœী মন্দোদরীসহ সকল পতিহীনা রাক্ষসীরা লঙ্কাপুরী থেকে বের হয়ে নিজ নিজ পতির মৃতদেহের কাছে গিয়ে করুণ সুরে ক্রন্দন করতে লাগল। তখন রামভক্ত বিভীষণ কোশলরাজ শ্রীরামচন্দ্রের অনুমতি নিয়ে শাস্ত্রসম্মতভাবে পিতৃমেধ বিধান অনুযায়ী ঔর্দ্ধদেহিক ক্রিয়া অনুষ্ঠান করেন। তারপর বিভীষণকে এককল্পকাল লঙ্কার শাসনভার দান করে শ্রীরামচন্দ্র সীতাদেবীকে অশোকবন থেকে উদ্ধার করেন এবং বনবাসকালের অবসান হলে হনুমান, সুগ্রীব ও ভ্রাতা লক্ষণসহ পত্নী সীতাদেবীকে সঙ্গে নিয়ে বিমানে অযোধ্যায় ফিরে যান। রাজধানী অযোধ্যায় পৌছলে, রাজপথে রাজকীয় লোকপালরা সুগন্ধি পুষ্প বর্ষণ দ্বারা শ্রীরামচন্দ্রকে স্বাগত জানান, আর ব্রহ্মাদি শ্রেষ্ঠদেবতারা বিজয়োল্লাসে শ্রীরামচরিত কীর্তন করেন।