বলি মহারাজ স্বর্গ জয় করলে দেবতারা সেখান থেকে পলায়ন করে, পুত্রদের সুখের জন্য দেবমাতা অদিতি পয়োব্রত পালন করে ভগবান বিষ্ণুকে তুষ্ট করেন। অদিতির অভিলাষ পূর্ণ করবার উদ্দেশ্যে ভগবান শ্রীহরি তাঁর পুত্ররূপে জগতে আবির্ভূত হন। ভাগবত পুরাণে ভগবানের এই অবতারকে বামনদেব নামে উল্লেখ করা হয়েছে।
দেবতারা স্বর্গচ্যুত হলে তাদের মা অদিতি অত্যন্ত দুঃখিত হন। অদিতি তাঁর পতিকে পরমেশ্বর ভগবানকে তুষ্ট করবার পথের সন্ধান দিতে অনুরোধ করেন। পুত্রদের বিরহে কাতর অদিতিকে দেখে তার পতি কশ্যপ মুনি দেবতাদের কল্যাণের জন্য তাঁকে ব্রত সাধন করতে বলেন। বহুকাল ব্যাপী ধ্যান করবার পর এক দিন মহাঋষি কশ্যপ তাঁর আশ্রমে ফিরে আসেন। সেখানে তিনি সর্বত্রই বিপদের চিহ্ন দেখতে পান। আশ্রমের সকলকে বিষন্ন ও দুঃখিত দেখার কারণ সম্বন্ধে মহাঋষি কশ্যপ পত্নী অদিতিকে জিজ্ঞাসা করেন। তাঁর দুঃখের কারণ–দেবতাকুল স্বর্গচ্যুত, পুত্ররা কি উপায়ে তাদের নিজ নিজ পদ লাভ করতে পারে, তারা আবার স্বর্গে ফিরে আসতে পারে। এই বিষযে পতির কাছে অদিতি উপদেশ প্রার্থনা করলেন। অদিতির অনুরোধে তুষ্ট কশ্যপ মুনি প্রথমে তাঁকে আত্মোপলব্ধি তত্ত্ব উপদেশ দেন, অদিতি তাতে তুষ্ট হয়নি। তখন কশ্যপ মুনি অদিতিকে জনার্দন বাসুদেবের উপাসনা করতে উপদেশ দেন, তিনি তাঁকে প্রতিশ্রুতি দেন যে ভগবান বাসুদেবই তাঁর সকল ইচ্ছা পূর্ণ করতে পারেন। অদিতি এইবার খুশি হলেন, জনার্দন বাসুদেবের উপাসনা করতে স্বীকৃত হলেন। তখন বারো দিন ব্যাপী পয়োব্রত নামে এক ভগবৎ উপাসনার নির্দেশ দিলেন কশ্যপ মুনি অদিতিকে। এই ভগবৎ উপাসনা পন্থা লোকপিতা ব্রহ্মার কাছে কশ্যপ মুনি শিক্ষালাভ করেছিলেন। শ্রীমদ্ভাগবতে অদিতির উদ্দেশ্যে কশ্যপ মুনির উপদেশ এইভাবে লেখা আছে–
উপতিষ্টস্ব পুরুষং ভগবন্তং জনার্দনম্।
সর্বভূতগুহাবাসং বাসুদেবং জগদ্গুরুম্ ॥
অর্থাৎ, “হে অদিতি! সকল প্রাণীর অন্তর্যামী জনার্দন পরম পুরুষ ভগবানকে ভজনা কর। একমাত্র ভগবান বাসুদেবই সকলের অন্তিম কল্যণকারী, কারণ তিনি হচ্ছেন জগৎ-গুরু।”
এখানে কশ্যপ মুনি তাঁর পত্নীকে বাসুদেব কৃষ্ণের শরণাগত হতে উপদেশ দিয়েছিলেন। ভগবানের শরণাগত হলে ভগবান কৃষ্ণ তাঁর ভক্তের সকল সমস্যার সমাধান করে দেন। তাই কশ্যপমুনি হচ্ছেন আদর্শ গুরুদেব। তিনি ভগবান কৃষ্ণ বা বাসুদেবের শরণাত হতে উপদেশ দিয়েছেন, তাই তিনি হচ্ছেন সদ্গুরু। যিনি এইভাবে কশ্যপ মুনির মতো ভগবান কৃষ্ণের শরণাগতি শিক্ষা দেন, তিনিও গুরুর ভূমিকা গ্রহণ করেন।
বর্তমান জগতে অনেকেই নিজেকে জগৎ-গুরু বলে প্রচার করেন। কশ্যপ মুনি নিজেকে এইভাবে কখনও প্রচার করেননি। শ্রীমদ্ভাগবতে তিনি বাসুদেব কৃষ্ণকে জগৎ-গুরু বলে তাঁর মহিমা কীর্তন করেছেন। ‘বাসুদেবং জগৎ গুরুম্।’ তাই ওঁ বিষ্ণুপাদ পরমহংস পরিব্রাজকাচার্য শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের মতে কশ্যপ মুনিই প্রকৃত জগৎ-গুরু। কিন্তু যারা নিজেদের জগৎ-গুরু বলে প্রচার করে, অথচ কৃষ্ণোপদেশ, ‘ভগবদ্গীতা যথাযথ’ প্রচার করেন না, তারা জনগণকে শুধু প্রতারণা করে। যারা সদ্গুরুপরম্পরা অনুসরণ করে শুদ্ধ ভক্তি অনুশীলন করে, কৃষ্ণানুশীলন করে, কৃষ্ণোপদেশ যথাযথ প্রচার করে, তারাই সদ্্গুরু হন। তারাই সমস্যা পীড়িত, বিভ্রান্ত ব্যক্তিকে ভগবান কৃষ্ণ বা বাসুদেবের চরণকমলে শরণাগত হতে উপদেশ দেন, তখন ভগবান শরণাগতকে ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়ার বুদ্ধি দান করেন।
ভগবদ্্গীতায় (৭/১৬) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন–
চতুর্বিধা ভজন্তে মাং জনাঃ সুকৃতিনোহর্জুন।
আর্তো জিজ্ঞাসুরর্থার্থী জ্ঞানী চ ভরতর্ষভ ॥
অর্থাৎ, “হে ভরতশ্রেষ্ঠ অর্জুন, আর্ত, অর্থার্থী, জিজ্ঞাসু এবং জ্ঞানী এই চার প্রকার পুণ্যকর্মা ব্যক্তিগণ আমার ভজনা করেন। এখানে দেবমাতা অদিতি হচ্ছেন আর্ত, কেন না দেবতারা স্বর্গচ্যুত, তাই দেবমাতা অদিতি অতীব দুঃখকাতর, পতি কশ্যপ মুনির নির্দেশে তিনি ভগবান কৃষ্ণ বা বাসুদেবে শরণাগতি কামনা করছেন।
কশ্যপ মুনি তার পত্নী অদিতির সঙ্গে কথোপকথনে বুঝলেন যে অদিতির হৃদয়ে জড় বাসনা রযেছে। কিন্ত নিষ্কপট ভক্ত শুধু কৃষ্ণের সেবাই চায়, তাই কৃষ্ণও তাকে শুদ্ধভক্তিই দান করে। শুদ্ধভক্তের কোন জড় বাসনা নেই। তবে শ্রীমদ্ভাগবতে উল্লেখ করা হয়েছে–
অকামঃ সর্বকামো বা মোক্ষকাম উদারধীঃ।
তীব্রেণ ভক্তিযোগেন যজেত পুরুষং পরম্ ॥
অর্থাৎ, “কেউ সব কিছুই কামনা করে, কেউ কিছুই কামনা করে না, কেউ বা ভগবানে লীল হতে চায়। তবে সবচেয়ে বুদ্ধিমান ভক্ত পরম পুরুষ ভগবানকে দিব্য ভগবদ্ভক্তির মাধ্যমে ভজনা করেন।” (ভাঃ ২/৩/১০)
এই জড় জগৎকে যে সব রকমভাবে ভোগ করতে চায় তাকে সর্বকাম বলা হয়। যার সব কামনা বাসনা পূর্ণ হয়ে গেছে, যে সম্পূর্ণভাবে জড় বাসনা শূন্য তাকে অকাম বলে। যে মোক্ষ কামনা করে যে পরম-ব্রহ্মে লীন হতে চায়, যে ভগবৎ সত্তায় বিলীন হতে চায়, সে শুদ্ধ নয়, সে পবিত্র নয়।
শুদ্ধভক্তের কোন জড় বাসনা নেই, কোন জড় জাগতিক বিষয়ের কামনা নেই। তাই তিনি পবিত্র, তিনি শুদ্ধ। তাই শুদ্ধভক্তির সংজ্ঞায় বলা হয়েছে–
সর্বোপাধি বিনির্মুক্তং তৎপরত্বেন নির্মলম্।
কৃষ্ণানুশীলন এমনি চমৎকার যে অন্তিমে তা সকলেরই পরম কল্যাণ সাধন করে। তাই কর্মী-জ্ঞানী-যোগী সকলেরই কৃষ্ণানুশীলন করা উচিত। তাদের সকলেরই উচিত নিষ্পাপ জীবন যাপন করা ও নিরপরাধে মহামন্ত্র কীর্তন করা–
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে ॥
ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষা আমরা শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃত থেকেও পাই। সেখানে বৈষ্ণবাচার্য শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী বলেছেন–
কৃষ্ণ কহে, –‘আমা ভজে, মাগে বিষয়-সুখ।
অমৃত ছাড়ি’ বিষ মাগে, এই বড় মূর্খ ॥
আমি–বিজ্ঞ, এই মূর্খে, ‘বিষয়’ কেনে দিব?
স্ব-চরণামৃত দিয়া ‘বিষয়’ ভুলাইব ॥ চৈঃ চঃ মধ্য ২২/৩৮-৩৯)
কেউ যদি শুদ্ধ ভক্ত হতে চায়, অথচ তার হৃদয়ে জড় বসনাও পোষণ করে, তখন কৃষ্ণ তাকে বিশেষ কৃপা দান করেন এইভাবে,–তিনি সব কিছু জড় জাগতিক যা তার আছে সব কেড়ে নেন। তাকে নিঃস্ব করে দেন এবং অবশেষে ভগবান তাকে অনন্য শুদ্ধভক্তি দান করেন।
কশ্যপ মুনি অদিতিকে বলেন–‘ফাল্গুন মাসের শুক্লপক্ষে দ্বাদশ দিন পয়োব্রত পালন করবে এবং অরবিন্দাক্ষ পরমেশ্বর ভগবানকে ভক্তিভরে ভজনা করবে।” এখানে কশ্যপ মুনি ‘অর্চয়েৎ’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। ভক্তিভরে ভগবান বিষ্ণুর আরাধনার অর্থ হচ্ছে অর্চন মার্গ, তা শাস্ত্রে এইভাবে উল্লেখ করা হয়েছে–
শ্রবণং কীর্তনং বিষ্ণোঃ স্মরণং পাদসেবনম্।
অর্চনং বন্দনং দাস্য সখ্যমাত্মনিবেদনম্ ॥
শ্রীশ্রীমৎ অভয়চরণাবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ এই তাৎপর্যে লিখেছেন–ভগবান বিষ্ণু বা কৃষ্ণের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করা চাই। শাস্ত্রানুযায়ী সুগন্ধি পুষ্পমালা ও সুন্দর পোষাক দ্বারা শৃঙ্গার করে ভক্তিসহকারে তাঁকে সব রকম ফুল, ফল, সাত্ত্বিক, অন্নব্যঞ্জন নিবেদন করা চাই। ঘন্টা, শঙ্খ, ধূপ, দীপ আদি দ্বারা আরতি করা চাই। এইভাবে ভগবান বিষ্ণু বা কৃষ্ণের উপাসনা করা উচিত। ‘ভক্ত্যা’ শব্দ ব্যবহার করেছেন কশ্যপ মুনি, অর্থাৎ শুদ্ধভক্তিযুক্ত হয়ে পয়োব্রত ও ভগবৎ অর্চন করা চাই। যিনি ভগবানকে জানতে চান তাকে শুদ্ধ ভক্ত হতে হবে। তাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্গীতায় অর্জুনকে বলেছেন–
ভক্ত্যা মামভিজানাতি যাবান্ যশ্চাস্মি তত্ত্বতঃ।
দেবমাতা অদিতি তাঁর পতি কশ্যপ মুনির কাছে পয়োব্রতের উপদেশ পেয়ে কঠোরভাবে তার পালন করেছিলেন ও অনলস হয়ে সেই ব্রত অনুষ্ঠান করেছিলেন।
শ্রীল প্রভুপাদ শ্রীমদ্ভাগবতে এর সম্বন্ধে মন্তব্য করেছেন যে, পারমার্থিক জীবনে উন্নতির জন্য সদ্্গুরুর উপদেশ কঠোরভাবে পালন করা উচিত। দেবমাতা অদিতি তাই করেছিলেন। তিনি কঠোরভাবে তাঁর প্রতি ও গুরুর উপদেশ পালন করেছিলেন। বৈদিক নির্দেশেও তার প্রতিপন্ন হয়েছে, যেমন–
‘যস্য দেবে পরা ভক্তির্যথা দেবে তথা গুরৌ।’
গুরুর কথায় সম্পূর্ণ বিশ্বাস থাকা চাই। তিনি শিষ্যের পারমার্থিক জীবনের উন্নতিতে সাহায্য করেন। সদ্গুরুর উপদেশ অনাদর করা–উপেক্ষো করা মাত্র শিষ্যের প্রয়াস ব্যর্থ হবে–‘যস্য অপ্রসাদান্ন গতিঃ কুতোহপি।’ অদিতি কঠোরভাবে তার পতি ও গুরুদেবের উপদেশ পালন করেছিলেন। এইভাবে তার প্রয়াস সফল হয়েছিল।
অদিতি একাগ্র চিত্তে পরমপুরুষ পরমেশ্বর ভগবান বিষ্ণুর চিন্তা করে প্রবল পরাক্রান্ত দুর্দমনীয় মন ও ইন্দ্রিয়গুলিকে সম্পূর্ণ বশীভূত করে ভগবানের পাদপদ্ম-সেবায় নিয়োজিত করেছিলেন। শ্রীল প্রভুপাদ এ সম্বন্ধে মন্তব্য করেছেন যে–শুদ্ধভক্তি অনুশীলনকারীর মনকে এইভাবে শুধু ভগবান কৃষ্ণের চরণারবিন্দে নিবিষ্ট করতে হবে। এইভাবে দুর্জয় মন ও ইন্দ্রিয়গুলিকে দমন করে সম্পূর্ণভাবে কৃষ্ণানুশীলন করা যায়। অনন্য কৃষ্ণভক্তির দ্বারা এইভাবে ভক্তরা যা করে, তা অন্য যৌগিক পন্থায় প্রায় অসম্ভব। তাই মনকে জয় করবার জন্য ভক্তিযোগই শ্রেষ্ঠ পন্থা। শাস্ত্রে উল্লেখ করা হয়েছে–স বৈ মনঃ কৃষ্ণ-পদারবিন্দয়োঃ।
পীতবসন, শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারী চতুর্ভুজ আদি পুরুষ ভগবান দেবমাতা অদিতির সম্মুখে আবির্ভূত হয়েছিলেন। ভগবানকে দেখে দিব্য আনন্দে অভিভূত অদিতি প্রথমে উঠে দাঁড়ান। তারপর শ্রদ্ধাবনত হয়ে দন্ডবৎ প্রণাম করেন। ভগবদ্ধক্তিতে আপ্লুত অদিতির বাক্্ রুদ্ধ হল। তাঁর সমস্ত শরীর কম্পমান হল। ভগবানের বন্দনা করতে চাইলেও অদিতি সমর্থ হলেন না। আনন্দে তার বদন অশ্রু প্লাবিত হল। কিছুক্ষণ এইভাবে অতিবাহিত হল। ভগবানের দিব্যরূপ দর্শন করে অদিতি শান্ত হলেন, তখন অদিতি ভগবানের বন্দনা করলেন। সর্বান্তর্যামী পরমেশ্বর ভগবান শ্রীহরি অতীব তুষ্ট হলেন, এবং ভগবানের অংশাবতারের মাধ্যমে তাঁর পুত্ররূপে আবির্ভূত হতে স্বীকার করলেন। ভগবান ইতিপূর্বেই কশ্যপ মুনির কৃচ্ছ্রসাধনায় তুষ্ট হয়েছিলেন। এইভাবে ভগবান শ্রীহরি তাঁদের পুত্ররূপে দেবতাদের প্রতিপালনে স্বীকৃত হলেন।
ভগবানের নির্দেশে অদিতি ভক্তিভরে কশ্যপ মুনির সেবায় নিয়োজিত হলেন। ভগবানের জন্ম ও কর্ম সবই দিব্য। ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষীয় শুভ শ্রবণা নক্ষত্রযুক্ত দ্বাদশী তিথিতে অভিজিৎ মুহূর্তে ভগবান পীত বসনে শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্ম ধারণ করে অদিতির গর্ভ থেকে শ্যামবর্ণ দেহে আবির্ভূত হলেন। সচ্চিদানন্দ দেহে আবির্ভূত ভগবানকে পুত্ররূপে দেখে অদিতি ও কশ্যপ মুনি আনন্দিত হলেন। তখন ভগবান বামন রূপ ধারণ করলেন। তখন উপস্থিত সকলেই আনন্দে ভগবানের স্তবস্তুতি করতে লাগলেন।