ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্গীতায় (৪/৮) জড়-জগতে তাঁর অবতরণের উদ্দেশ্য প্রকাশ করে বলেছেন–
পরিত্রাণায় সাধুণাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্।
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ॥
অর্থাৎ, ভগবান জগৎ উদ্ধারের জন্য অবতরণ করেন; কিন্তু ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে দর্শন করে, উদ্ধার লাভ করবার পরিবর্তে একসময় নবদ্বীপবাসী অনেকেই তাঁর চরণে অপরাধ করতে শুরু করে। এই প্রসঙ্গে শ্রীল বৃন্দাবন দাস ঠাকুর ‘শ্রীচৈতন্য-ভাগবতে’–এর মধ্য খন্ডের ষড় বিংশ অধ্যায়ে লিখেছেন–
একদিন গোপী-ভাব জগতে-ঈশ্বর।
‘বৃন্দাবন’, ‘গোপী’ গোপী’ বলে নিরন্তর ॥
কোন যোগে তহিঁ এক পড়ুয়া আইল।
ভাব-মর্ম না জানিয়ে সে উত্তর দিল ॥
‘গোপী গোপী’ কেন বল নিমাঞি পন্ডিত।
‘গোপী গোপী’ ছাড়ি’ ‘কৃষ্ণ’ বলহ ত্বরিত ॥
কি পুণ্য জন্মিবে, ‘গোপী গোপী’ নাম লৈলে।
‘কৃষ্ণনাম’ লইলে সে পুণ্য, বেদে বলে ॥’
সেই পড়–য়াটির কৃষ্ণভক্তি সম্বন্ধে তেমন তত্ত্বজ্ঞান ছিল না। আশ্রয় বিগ্রহের শরনাগতি ছাড়া ভগবানের চরণমকমল লাভ হয় না। গোপীরা হচ্ছেন কৃষ্ণের আশ্রয় বিগ্রহ; কৃষ্ণ হচ্ছেন বিষয় বিগ্রহ। ভক্তিতত্ত্ব বিচারে আশ্রয় বিগ্রহের আনুগত্যের সেবা করলে, তবেই বিষয় বিগ্রহ কৃষ্ণের কৃপা লাভ হয়। পড়–য়ার এই জ্ঞান ছিল না।
মহাপ্রভু লাঠি হাতে নিয়ে ঐ পড়ুয়াটিকে তাড়া করেন। ভয়ে পড়ুয়াটি পালিয়ে যায়; আর মহাপ্রভুর অনুগামীরা তাঁকে এই তাড়না থেকে নিবৃত্ত করেন।
জড়-বুদ্ধিসম্পন্ন জনগণ ভগবান ও তাঁর দিব্য লীলা বিলাস বুঝতে পারে না। ভগবান হচ্ছেন অধোক্ষজ তত্ত্ব; অক্ষজ বিচারে তাঁকে হৃদয়ঙ্গম করা যায় না। পড়ুয়ারা ভগবানকে এইভাবে বিচার করে তাঁর চরণে অপরাধ করে ফেলে।
তখন সেই পড়ুয়া অন্যান্যদের সঙ্গে গিয়ে এ সম্বন্ধে আলোচনা করে, ‘নিমাই হচ্ছে জগন্নাথ মিশ্রের ছেলে; আমাদেরই সহপাঠী। সে হচ্ছে ব্রাহ্মণ; আমরাও ব্রাহ্মণ সন্তান। তাই আমরা তার এই দুর্ব্যবহার সহ্য করব না।’
ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু কিন্তু তাদের মনোভাব সবই জানতে পারলেন; কারণ তিনি সকলের হৃদয়ে অবস্থান করেন।
একদিন মহাপ্রভু হেঁয়ালিচ্ছলে পার্ষদদের কাছে সন্ন্যাস গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। সেখানে নিত্যানন্দ প্রভুই শুধু মহাপ্রভুর হেঁয়ালি বুঝতে পারলেন। অন্যান্য পার্ষদরা তা বুঝতে পারলেন না।
মহাপ্রভু গৃহত্যাগ করবেন। সন্ন্যাস গ্রহণ করলে, মস্তক মুন্ডন করলে তাঁর সুন্দর কেশ আর পার্ষদরা দর্শন করতে পারবেন না,–এইভাবে চিন্তা করে নিত্যানন্দ প্রভু বিষন্ন হলেন। তা ছাড়া মহাপ্রভু একাকী নিত্যানন্দের সঙ্গে এই সম্বন্ধে আলোচনাও করেন। তারপর মুকুন্দের গৃহে গিয়ে তাঁর কাছেও সন্ন্যাস গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। এইসব বিবরণ শ্রীল বৃন্দাবন দাস ঠাকুর তাঁর লেখা ‘শ্রীচৈতন্য-ভাগবত’- এ বিস্তারিতভাবে লিখে গিয়েছেন–
ক্ষণেকে ঠাকুর নিত্যানন্দ-হস্ত ধরি’।
নিভৃতে বসিলা গিয়া গৌরাঙ্গ শ্রীহরি ॥
প্রভু বলে,–‘শুন নিত্যানন্দ মহাশয়।
তোমারে কহিয়ে নিজ হৃদয় নিশ্চয় ॥
ভাল সে আইলাঙ আমি জগত তারিতে
তাড়ন নহিল, আমি আইলুঁ সংহারিতে ॥
আমা দেখি কোথা পাইবেক বন্ধনাশ।
এক গুণ বন্ধ ছিল- হৈল কোটি-পাশ ॥
আমারে মারিতে যবে করিলেক মনে।
তখনই পড়ি’ গেল অশেষ-বন্ধনে ॥
ভাল লোক তাড়িয়ে করিলুঁ অবতার।
আপনে করিলু সব জীবের সংহার।
দেখ কালি শিখা-সূত্র সব মুড়াইয়া।
ভিক্ষা করি’ বেড়াইমু সন্ন্যাস করিয়া ॥
তবে মোরে দেখি’ সেই ধরিবে চরণ।
এই মতে উদ্ধারিব সকল ভুবন ॥
আজ থেকে ৫০০ বছর আগে কলির প্রভাব তেমন ছিল না। তখন সাধারণ লোক সন্ন্যাসীকে তাড়না করত না। বৈদিক ধর্ম অনুযায়ী মানব সমাজে তিনটি আশ্রম–ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস। সব বস্তুর সেবা গ্রহণ প্রবৃতি পরিত্যাগ করে, ভগবানের সেবায় উন্মুখ হলেই ভক্তিমার্গে সন্ন্যাসী হয়।
মহাপ্রভু নিত্যানন্দ প্রভুকে বুঝিয়ে বললেন যে, নবদ্বীপের জনগণের নিত্য কল্যাণের জন্য তিনি হরিনাম সংকীর্তন শুরু করবেন। শুদ্ধভক্তি সম্বন্ধে তাদের কোন জ্ঞান ছিল না। তারা মহাপ্রভুকে ভুল বুঝল আর তাঁর চরণে অপরাধ করে বসল। তখন তাদের জড়-জগতের বন্ধন আরও দৃঢ় হল। ভগবদ্ভক্তের সেবা বুদ্ধির অভাব ও ভগবদ্-বিদ্বেষ–এইগুলিই তাদের আত্মবিনাশের কারণ। এইভাবে নবদ্বীপের জনগণের দুর্গতি হয়েছিল।
শচীনন্দন মুকুন্দের গৃহে উপস্থিত হলে মুকুন্দ খুব আনন্দ প্রকাশ করল। তিনি মুকুন্দকে কৃষ্ণ-কীর্তন করতে বললেন। মুকুন্দের কীর্তনে আনন্দে বিহ্বল মহাপ্রভু তাঁকে আরও কীর্তন করতে উৎসাহ দিলেন। তারপর হঠাৎ ‘ভাব’ সম্বরণ করে, তিনি মুকুন্দের কাছে সন্ন্যাস গ্রহণের কথা জানালেন। শ্রীল বৃন্দাবন দাস ঠাকুর শ্রীচৈতন্য-ভাগবতের মধ্য খন্ডে লিখেছেন–
প্রভু বলে–“মুকুন্দ, শুনহ কিছু কথা।
বাহির হইব আমি না রহিব হেথা ॥
গারিহস্ত আমি ছাড়িবাঙ সুনিশ্চিত।
শিখা-সূত্র ছাড়িয়ে চলিব যে-তে ভিত ॥ (চৈঃ ভাঃ মধ্য ২৬/১৬১-১৬২)
মুকুন্দের কাছ থেকে শচীনন্দন গদাধরের কাছে গেলেন। সেখানেও গদাধরের কাছে তাঁর সন্ন্যাস গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। গদাধরের তখনকার মনোভাব বৃন্দাবন দাস ঠাকুর শ্রীচৈতন্য-ভাগবত-এ এইভাবে বর্ণনা করেছেন,–
অন্তরে দুঃখিত হই’ বলি গদাধর।
“যতেক অদ্ভুত প্রভু, তোমার উত্তর ॥
বিনা-সূত্র ঘুচাইলেই সে কৃষ্ণ পাই।
গৃহস্থ তোমার মতে বৈষ্ণব কি নাই?
মাথা মুড়াইলে প্রভু, কিবা কর্ম হয়।
তোমার সে মত, এ বেদের মত নয় ॥
অনাথিনী, মায়েরে বা কেমত ছাড়িবে।
প্রথমেই জননী-বধের ভাগী হবে ॥
তুমি গেলে সর্বথা জীবন নাহি তান।
সবে অবশিষ্ট আছে তুমি তাঁর প্রাণ ॥
ঘরেতে থাকিলে কি ঈশ্বরের প্রীতি নয়।
গৃহস্থ সে সবার প্রীতের স্থলী হয় ॥
তথাপিও মাথা মুন্ডাইলে স্বাস্থ্য পাও।
যে তোমার ইচ্ছা তাই করি’ চলি’ যাও ॥”
মর্মাহত গদাধর অভিমান করে মহাপ্রভুকে এইভাবে উত্তর দিয়েছিলেন। তারপর একের পর এক অন্যান্য ভক্তদের কাছে শচীনন্দন সন্ন্যাস গ্রহণের কথা বললে ভক্তরা সকলেই ক্রন্দন করতে থাকেন।
প্রত্যেক মানুষের কর্তব্য কৃষ্ণানুলীশন করা। যে আশ্রমেই তিনি থাকুন না কেন, সদা সর্বদা কৃষ্ণানুশীলনই সকলের কৃত্য।
‘সংসার কৃষ্ণানুশীলনের প্রতিকূল, তাই সংসার ত্যাগ করা চাই’,–এই শিক্ষা দেওয়াই ছিল শচীনন্দনের উদ্দেশ্য। এই জন্য তিনি সহপাঠীদের সঙ্গ ত্যাগ করলেন। তা ছাড়া, আরও একটি তার উদ্দেশ্য ছিল। প্রাকৃত সহজিয়ায় আজ সারা ভারত ছেয়ে গেছে। এরা অবৈধ গৃহস্থ জীবন যাপন করে চলেছে। এর থেকে জনগণকে মুক্ত করবার ইচ্ছা ছিল শচীনন্দনের।
শচীনন্দন সকলকে ত্যাগ করে সন্ন্যাস গ্রহণ করে চলে যাবেন। তাই তাঁর বিচ্ছেদের কথা ভেবে ভক্তরা সকলেই ক্রন্দন করতে থাকেন। তাঁরা আহার্য পানীয় সবই ত্যাগ করে। তাঁদের দুঃখ মহাপ্রভু সহ্য করতে পারেননি। তাই শচীনন্দন তাঁর প্রিয়জনদের প্রবোধ দান করেন। শচীনন্দন ভক্তদের ভালবাসেন। তাই সস্নেহে তাদের বললেন যে, তাঁরা সবাই তাঁর নিত্য পরিকর। তাঁরা না থাকলে তাঁর কোন লীলাবিলাসই হয় না। প্রভুর লীলায় অংশগ্রহণের জন্য তারা জন্মে জন্মে অবতরণ করেন। শচীনন্দনের কাছে এই সব সান্ত¦নার কথা শুনে, তাঁর প্রেমালিঙ্গন লাভ করে, অবশেষে তাঁরা স্থির হন।
মাতাকে দুঃখে অত্যন্ত কাতর দেখে শচীনন্দন মাথা নিচু করে রইলেন; কোন কথাই বললেন না। এ দিকে শচীমা নিমাই-এর সন্ন্যাস নেওয়ার ইচ্ছা শুনে অবিরাম ক্রন্দন করতে থাকেন। কখনও মূর্ছিত হয়ে ভূমিতে পড়েন, কখনও তাঁকে দেখে নিষ্প্রাণ মনে হয়। তখন তার অবস্থা বর্ণনা করা যায় না। শোকে মুহ্যমান হয়ে তিনি তার স্নেহের পুত্রকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলেন, যদিও তাঁর বাক্রোধ হচ্ছিল। তিনি বলেছিলেন–
না যাইয় না যাইয় বাপ, মায়েরে ছাড়িয়া।
পাপ জীউ আছে তোর শ্রীমুখ চাহিয়া।
কমল-নয়ন তোর শ্রীচন্দ্র-বদন।
অধর সুরঙ্গ, কুন্দ-মুকুতা-দশন ॥
অমিয়া বরিখে যেন সুন্দর বচন।
না দেখি বাঁচিব কি সে গজেন্দ্র-গমন ॥ (চৈঃ চঃ মধ্য ২৭/২২-২৪)
শচীমাতা নিমাইকে এই বলে বোঝাতে চেষ্টা করেছিলেন,–‘তুমি সকলকে ধর্মোপদেশ দাও। নিজের মা’কে ত্যাগ করে, গৃহ ত্যাগ করলে, কিভাবে জগতে ধর্ম-শিক্ষা দিবে? নিত্যানন্দ, অদ্বৈত, শ্রীবাস আদিকে নিয়ে গৃহে থেকেই সানন্দে সঙ্কীর্তন করতে পার।’
মহাপ্রভু তখন শচীমাকে অনেক প্রবোধ দিলেন এবং নিজের স্বরূপ প্রকাশ করলেন। জন্মে জন্মে মাতারূপে শচীমার সঙ্গে তাঁর সম্বন্ধ ও লীলাবিলাস কাহিনী প্রকাশ করলেন। এক জন্মে তাঁর নাম ছিল পৃশ্নি; তখনও তিনি ছিলেন তাঁর মা। তাঁর বামন অবতারে, তাঁর মারূপে তাঁর নাম ছিল অদিতি। তা ছাড়া কৌশল্যা ও শ্রীরামচন্দ্র, এবং দেবকী ও কৃষ্ণরূপেও তাঁরা দুজন জগতে লীলা করেছিলেন। এইভাবে মহাপ্রভু শচীমাকে বুঝালেন যে, দুঃখ করবার কিছুই নেই। জন্মে জন্মে তাঁদের মাতা-পুত্রের সম্বন্ধ চলে আসছে। তাদের মধ্যে কোন বিচ্ছেদই নেই। তখন শচীমার মন কিছুটা স্থির হল।
সন্ন্যাস গ্রহণের আগের দিন নিত্যানন্দ প্রভুকে নির্জনে ডেকে মহাপ্রভু বললেন, আমার সন্ন্যাস গ্রহণের কথা কেবল পাঁচজনকে বলবেন। কাটোয়া গ্রামে ইন্দ্রাণী নামে এক জায়গায় আমি নিশ্চয় আগামীকাল সন্ন্যাস গ্রহণ করতে কেশব ভারতীর কাছে যাব। এই সংবাদটি শুধু আমার মা, গদাধর, ব্রহ্মানন্দ, শ্রীচন্দ্রশেখর আচার্য আর মুকুন্দ–এদের জানাবেন। তা ছাড়া অন্য কেউই এই কথা জানতে পারল না।
সেদিন মহাপ্রভু সকল বৈষ্ণবদের নিয়ে সংকীর্তনানন্দে কাটালেন। সর্বাঙ্গে মালা সুগন্ধি চন্দনে সজ্জিত কমললোচন শচীনন্দন সকল অনুচরদের নিয়ে বসলেন। বিদায়ের আগে সকলকে শচীনন্দন আকর্ষণ করে নিয়ে এলেন। সকলেই এসে শচীনন্দনকে প্রণাম করতে লাগলেন। নিজের গলার মালা তিনি একে একে সকলকে পরিয়ে দিতে লাগলেন। তাঁদের তিনি কৃষ্ণ-কীর্তন করতে উপদেশ দিলেন।
তিনি তখন বললেন,–
“বল কৃষ্ণ, ভজ কৃষ্ণ, গাও কৃষ্ণ-নাম।
কৃষ্ণ বিনু কেহ কিছু না ভাবিহ আন ॥
যদি আমা’ প্রতি স্নেহ থাকে সবাকার।
তবে কৃষ্ণ-ব্যতিরিক্ত না গাইবে আর ॥
কি শয়নে, কি ভোজনে, কি জাগরণে।
অহর্নিশ চিন্ত কৃষ্ণ, বলহ বদনে ॥” (চৈঃ ভাঃ মধ্য ২৮/২৬-২৮)
এইভাবে শচীনন্দন সকলকে শুভদৃষ্টি দান করলেন। ফুল চন্দনে তাঁর যে শোভা হয়েছিল তার কাছে চন্দ্রের শোভা তুচ্ছ। তখন সকলেই উচ্চস্বরে ‘হরি-ধ্বনি’ করছিল।
শ্রীধর মহাপ্রভুর জন্য একটি লাউ নিয়ে এসেছিলেন। অন্য একজন লোক দুধ নিয়ে এসেছিলেন। ভক্তবৎসল গৌরহরি ভক্ত দত্ত লাউ সহ দুধ দিয়ে শচীমাকে রান্না করতে বললেন। নিমাই-এর কথা শুনে শচীমা খুশি হলেন। সকলকে বিদায় দিয়ে শচীনন্দন ভোজন করলেন। তিনি শয়ন করলে, গদাধর ও হরিদাস মহাপ্রভুর গৃহের অতি নিকটেই শয়ন করলেন। রাত্রি আর চার দন্ড আছে তখন মহাপ্রভু শয্যা ত্যাগ করলেন। নিমাই গৃহত্যাগ করবে বুঝতে পেরে শচীমা দরজায় বসে রইলেন। শচীমার হাত ধরে, মহাপ্রভু তাঁর কাছে বসে, অনেক প্রবোধ দিলেন, তিনি তখন বললেন,–
“বিস্তর করিলা তুমি আমার পালন।
পড়িলাম, শুনিলাম তোমার কারণ ॥
আপনার তিলার্ধেকো না লৈলা সুখ।
আজন্ম আমার তুমি বাড়াইলা ভোগ ॥
দন্ডে দন্ডে যত স্নেহ করিলা আমারে।
আমি কোটি-কল্পেও নারিব শোধিবারে ॥
তিনি আরোও বললেন–
শুনমাতা, ঈশ্বরের অধীন সংসার।
স্বতন্ত্র হইতে শক্তি নাহিক কাহার ॥
সংযোগ বিয়োগ যত করে সেই নাথ।
তান ইচ্ছা বুঝিবারে শক্তি আছে কাত ॥
তারপর বুকে হাত রেখে মহাপ্রভু প্রতিশ্রুতি দিলেন যে তাঁর সমস্ত ভার তিনি গ্রহণ করবেন। শচীমার পদধূলি শিরে নিয়ে, তাঁকে প্রদক্ষিণ করে মহাপ্রভু গৃহত্যাগ করলেন। জড় প্রায়, নির্বাক ও শোকাকুল অবস্থায় শচীমা বাড়ির বাহির দরজায় বসে রইলেন।
মহাপ্রভু কাটোয়ায় কেশব ভারতীর কাছে গিয়ে তাঁর স্তব স্তুতি করলেন এবং তাঁকে কৃপা প্রদর্শণ করতে অনুরোধ করলেন। মুকুন্দ ও অন্যান্যদের কীর্তনে মহাপ্রভু নৃত্য করতে লাগলেন। বহু লোক সেখানে আসতে লাগল। ক্ষৌরকার শচীনন্দনের কেশ মুন্ডন করতে গিয়ে ক্রন্দন করতে লাগলেন। অলক্ষ্যে দেবতারাও সেখানে উপস্থিত হলেন। তাঁরাও শোকাকুল হলেন।
সন্ন্যাসীর বস্ত্র পরিধান করলে, মহাপ্রভুকে অপূর্ব সুন্দর দেখাচ্ছিল। সকলের গুরু গৌরহরি এক ছলনা করে সন্ন্যাস মন্ত্রটি কেশব ভারতীকে বলে জিজ্ঞাসা করলেন সেটি সন্ন্যাস মন্ত্র কি না।
শুদ্ধা সরস্বতীর প্রেরণায় শচীনন্দনের সন্ন্যাস নাম হল ‘শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য’ কেন না কৃষ্ণকীর্তনের মাধ্যমে তিনি জগতে চেতনার উন্মেষ ঘটান। মহাপ্রভুর সন্ন্যাস নাম শুনে চতুর্দিক থেকে বৈষ্ণবগণ সকলে আনন্দে উচ্চস্বরে হরি-ধ্বনি করে উঠলেন।
এই কাহিনী বর্ণনা করে শ্রীল বৃন্দাবন দাস ঠাকুর লিখেছেন যে, মহাপ্রভুর সন্ন্যাসলীলা যিনি শ্রদ্ধা ভরে শ্রবণ করবেন, তিনি অচিরেই কৃষ্ণপ্রেম-রূপ ধন লাভ করবেন।