দক্ষযজ্ঞে ব্রাহ্মণ বৈষ্ণব দেবতাগণ সকলে হোমাগ্নিতে আহুতি প্রদান করে ভক্তিভরে বৈদিক মন্ত্রাদি উচ্চারণের ফলে ভগবান শ্রীবিষ্ণু পরম সন্তুষ্ট হয়ে তাঁর বিশেষ অষ্টভুজ আদি শ্রীনারায়ণ রূপ নিয়ে সেখানে প্রকট হয়েছিলেন।
ভগবান সেখানে আবির্ভূত হওয়া মাত্রই সমস্ত দিক আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল এবং তার ফলে সেখানে উপস্থিত থাকা ব্রহ্মা এবং অন্যান্য সকলেরই জ্যোতি খর্ব হয়েছিল। ভগবান বিষ্ণুকে সমাগত দেখে ব্রহ্মা, শিব এবং সেখানে উপস্থিত সমস্ত দেবতাগণ সকলে তাঁদের সশ্রদ্ধ দন্ডবৎ প্রণতি নিবেদন করেছিলেন।
শ্রীনারায়নের দেহনির্গত রশ্মিচ্ছটায় সকলের প্রভাব ম্লান হয়ে গিয়েছিল এবং সকলেই স্তম্ভিত হয়ে নীরব হয়ে গিয়েছিলেন। সম্ভ্রম ও শ্রদ্ধায় ভয়ভীত হয়ে, উপস্থিত সকলেই কৃতাঞ্জলিপুটে অবনত মস্তকে অধোক্ষজ পরমেশ্বর ভগবানের স্তব করতে উদ্যত হয়েছিলেন।
শ্রীবিষ্ণুর আদি অষ্টভুজ শ্রীনারায়ণ রূপের সামনে প্রথমে ব্রহ্মা তাঁর স্তুতি নিবেদন করেন। পরে একে একে ঋত্বিকেরা শিব, ভৃগু, ইন্দ্র, ঋত্বিক-পত্নীরা, ঋষিরা, সিদ্ধগণ, দক্ষপত্নী প্রমুখ তাঁদের প্রার্থনা নিবেদন করবার পরে ব্রহ্মান্ডের বিভিন্ন গ্রহলোকেরা পালকেরাও ভগবানের স্তুতিবন্দনা করেছিলেন। লোকপালেরা বলেছিলেন, হে ভগবান! আমরা কেবল আমাদের প্রত্যক্ষ অনুভূতিকেই বিশ্বাস করি, কিন্তু এই পরিস্থিতিতে আমরা জানি না যে, আমরা জড় ইন্দ্রিয়ের দ্বারা আপনাকে দর্শন করেছি কি না। আমাদের জড় ইন্দ্রিয়ের দ্বারা আমরা কেবল এই দৃশ্য জগৎই দর্শন করতে পারি। কিন্তু আপনি পঞ্চভূতের অতীত। আপনি ষষ্ঠ তত্ত্ব। তাই আপনাকে আমরা জড় জগতের সৃষ্টিরূপে দর্শন করছি।
শ্রীল ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ এই বন্দনা-স্তুতির তাৎপর্য ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে ‘শ্রীমদ্ভাগবত’ গ্রন্থে (স্কন্ধ ৪) লিখেছেন, বিভিন্ন গ্রহলোকের পালকেরা অবশ্যই জড়জাগতিক ঐশ্বর্য-সমন্বিত এবং অত্যন্ত দাম্ভিক। এই প্রকার ব্যক্তিরা ভগবানের চিন্ময় শাশ্বত রূপ উপলব্ধি করতে অক্ষম। ব্রহ্মসংহিতায় বলা হয়েছে যে, যাঁদের চক্ষু ভগবৎ-প্রেমরূপ অঞ্জনের দ্বারা রঞ্জিত হয়েছে, তাঁরাই কেবল তাঁদের কার্যকলাপের প্রতি পদক্ষেপে পরমেশ্বর ভগবানকে দর্শন করতে পারেন। কুন্তীদেবীও তাঁর প্রার্থনায় (শ্রীমদ্ভাগবত, ১/৮/২৬) উল্লেখ করেছেন যে, ভগবান হচ্ছেন ‘অকিঞ্চন-গোচরম্’, অর্থাৎ যাঁরা ধনমদে মত্ত নন, তাঁরাই ভগবানকে দর্শন করতে পারেন। আর যারা মোহাচ্ছন্ন, তারা পরম তত্ত্বের কথা চিন্তা পর্যন্ত করতে পারে না।
ভগবানকে দর্শন অর্থাৎ তত্ত্বজ্ঞানের উপলব্ধি হয় প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর বলেছেন, তত্ত্বজ্ঞান উপলব্ধির পরোক্ষ অভিজ্ঞতার পন্থাও অবশ্য আছে–যেমন, আপনারা আমার কাছে বসে ভাগবত প্রবচন শুনছেন। তবে যত্নবান হতে হবে, যেন এই শ্রবণের মধ্যে কলুষতা না থাকে। মহামুনি ব্যাসদেব যেভাবে ভাগবতে তাঁর ভাগবত-উপলব্ধি পরিবেশন করেছেন, তার মধ্যে তার নিষ্কুলুষ উপলব্ধি বিধৃত হয়ে রয়েছে। সুতরাং মহামুনি ব্যাসদেবকৃত শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ-শ্রবণ করলে সেই নিষ্কুলুষ অভিজ্ঞতার আস্বাদন পেতে পারি।
যে কোনও গূঢ় তত্ত্বের যথার্থ উপলব্ধি করতে হলে দেহ এবং মনের সংযম একান্ত প্রয়োজন। আমরা জানি, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কুরুক্ষেত্রে যখন অর্জুনকে গূঢ় তত্ত্ব প্রদান করেছিলেন, অর্জুনের মতো অসাধারণ ব্যক্তিসম্পন্ন মানুষও তা উপলব্ধি করতে যথেষ্ট সময় নিয়েছিলেন। তাঁরও মানসিক প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়েছিল।
এর কারণ এই যে, মন বড়ই চঞ্চল–যেন বানরের মতো অস্থিরভাবে কোনও এক বিষয়ে স্থির হয়ে থাকতে পারে না। সেই চঞ্চল মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তা ছাড়া জিহ্বা, উদর ইত্যাদি অঙ্গের বেগও নিয়ন্ত্রণ করা চাই।
তবে কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের মাধ্যমে হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র নিষ্ঠাভরে জপ করলে এবং চারটি বিধিবদ্ধ জীবনধারা মেনে চললে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং ইন্দ্রিয়াদি সংযত রাখা যায়। ঐ সমস্ত জড় ইন্দ্রিযাদির সংযমের মাধ্যমে চিন্ময় ইন্দ্রিয় ক্ষমতা ক্রমশ বিকশিত হতে থাকে এবং ভক্তিমার্গের চরম লক্ষ্যই হল তাই। ভগবান শ্রীকৃষ্ণর ইন্দ্রয়াদি যেমন চিন্ময়, তেমনি চিন্ময গুণসম্পন্ন ইন্দ্রিয়াদির মাধ্যমেই তাঁর স্বরূপ যথাযথভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব হয়। মহাবিষ্ণুর নাভিপদ্ম থেকে যখন ব্রহ্মার আবির্ভাব হয়েছিল তখন ব্রহ্মা তাঁর নিজের উৎপত্তির উৎস সন্ধানের কৌতূহলে ভগবানের নাভিপদ্মের পদ্মনাল বেয়ে নিচে নেমে গিয়েও কোনও হদিশ পাননি–এমনই দুর্জ্ঞেয় ভগবানের স্বরূপ, এমনই রহস্যময় তার সৃষ্টিতত্ত্ব।
পঞ্চতত্ত্বের দ্বারা জড় জগতে সমস্ত সৃষ্টি গড়ে উঠলেও জানতে হবে যে, সব কিছুর পিছনে এক অতীন্দ্রিয় চিন্ময় সত্তার সক্রিয়তা থাকে বলেই সেগুলিকে রহস্যময় মনে হয়। একমাত্র কৃষ্ণভাবনাময় ভক্তগণ তাঁদের শুদ্ধ ভক্তির মাধ্যমেই সেই চিন্ময় রূপ উপলব্ধি করতে পারেন। কারণ ভগবদ্ভক্তির অনুশীলনের সাহায্যেই জড় ভাবনায় কলুষিত জীবন চিন্ময় স্তরের উপলব্ধি লাভ করতে পারে।
এই জন্যই ‘অকিঞ্চন-গোচর’ কথাটি এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে প্রযোজ্য। ভক্তিভাবাপন্ন ভক্ত যখন দীনহীন, নিরহঙ্কারী এবং নির্মৎসরভাবে আচরণ করতে শেখেন, তখনই তাঁর গোচররীভূত হতে থাকে সমস্ত কিছু যা অজ্ঞেয়, দুর্বোধ্য, অপ্রত্যক্ষ এবং অনির্বচনীয়। ভক্তের আত্মসমর্পিত চিত্ত অনায়াসে পরমেশ্বর ভগবানের অচিন্ত্য সত্তার উপলব্ধির পথে অগ্রসর হতে পারে এবং বাস্তবিকই তাঁর অন্তরে ভগবানের চিন্ময় রূপ দর্শন করা সম্ভব হয়। তাই ভগবৎ সেবোন্মুখ ভক্তই পরমেশ্বর ভগবানের রূপ দর্শন করতে পারেন। ভক্ত তাঁর প্রেমাঞ্জনচ্ছুরিত নয়নেই ভগবানের রূপ দেখতে পান, অন্য কেউ তা পায় না।
সেই জন্যই ব্রহ্মান্ডের বিভিন্ন গ্রহলোকের লোকপালেরা ভগবানের সান্নিধ্য লাভ করেও শুধুমাত্র তাঁদের শ্রেষ্ঠত্বের অহঙ্কারে ভগবানের রূপ চাক্ষুষ অবলোকন করেও তা বিশ্বাস করতে পারেননি।
এর দ্বারা বোঝা যায় যে, বাস্তবিকই জড়জাগতিক জীবমাত্রেরই ইন্দ্রিয়গুলির অনুভূতি অত্যন্ত সীমিত, আর সেই জন্যই তা দিয়ে বিশাল রহস্যমন্ডিত কোন পারমার্থিক সত্তা উপলব্ধি করা দুঃসাধ্য। তাই লোকপালেরা তাঁদের চোখের সামনে আবির্ভূত শ্রীবিষ্ণুর মহাপ্রভাময় শ্রীনারায়ণরূপ দর্শন করেও নিজেদের উপলব্ধিকেই স্বীকার করতে দ্বিধা বোধ করছিলেন। বাস্তবিকই, জড় ইন্দ্রিয়াদির ক্ষমতা এমই সীমিত যে, তার সাহায্যে দুর্জ্ঞেয় কোনও বস্তুর দর্শন লাভের সৌভাগ্য হলেও তা অবিশ্বাস্য বলেই মনে হতে পারে।
ভক্ত যখন ভগবৎ-প্রেমের যোগ্যতা অর্জন করে, তখন সেই অবিশ্বাস্য দর্শন-ক্ষমতা জাগরিত হয়, একথা বদ্ধ জীবেরা তথা নাস্তিকেরা হয়ত বিশ্বাস করবেন না। কিন্তু এখানে ভাগবতের দক্ষযজ্ঞ কাহিনীতে লোকপালকদের সামনে শ্রীনারায়ণের চাক্ষুষ আবির্ভাব সত্ত্বেও তাঁদের অবিশ্বাস, দ্বিধা, বিস্ময় ইত্যাদি মিশ্রিত অনুভূতির অভিপ্রকাশ থেকে সেই অনুভূতির বাস্তবতা কিছুটা উপলব্ধি হতে পারে।