ঋষভদেব ও তাঁর শিক্ষা

মহারাজ নাভি ও তাঁর পত্নী মেরুদেবী অনেক যজ্ঞানুষ্ঠান সহ ভগবান বিষ্ণুর উপাসনা করেন, এবং বহুকাল তাঁরা কঠোর তপশ্চর্যা ও কৃচ্ছ্রসাধন করেন। ভগবান বিষ্ণু মহারাজ নাভির ভগবৎ ভজনে অতীব তুষ্ট হয় এবং তাঁদের অভিলাষ পূর্ণ করবার উদ্দেশ্যে তাঁদের পুত্ররূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন।
জন্ম হওয়া মাত্র ঋষভদেবের মধ্যে সকল ভগবৎ লক্ষণসমূহ প্রকাশিত হয়েছিল। যেমন তাঁর পদতলে ধ্বজ, কমল, বজ্রাদি চিহ্নসমূহ বিরাজমান ছিল। ভগবান ধন, বীর্য, যশ, শ্রী, বৈরাগ্য আদি ষড় ঐশ্বর্যে পূর্ণ। ঋষভদেব সকল ঐশ্বর্যে পূর্ণ হলেও, শাস্ত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি কিন্তু আদৌ বিষয় ভোগে আসক্ত ছিলেন না। তাঁর মন ও ইন্দ্রিয়সমূহ বশীভূত হওয়ায় তিনি সম্পূর্ণ শান্ত ছিলেন। তিনি সকলের প্রতি সমদর্শী ছিলেন। তিনি কখনও একজনকে অনুগ্রহ ও অপরকে উপেক্ষা বা অবহেলা করতেন না। তিনি সকলেরই প্রিয় ছিলেন। প্রায়ই আমাদের দেশে বহু ভুঁইফোড় অবতার দেখা যাচ্ছে, তাই বুদ্ধিমান ব্যক্তি মাত্রই শাস্ত্রীয় লক্ষণসমূহ বিচার করে একজনের ভগবত্তা বিষয়ে নিশ্চিত হবেন।
তাঁর প্রভাব দিন দিন বৃদ্ধি পেয়েছিল। তখন রাজ্যের প্রজা, ব্রাহ্মন ও এমন কি দেবতারা পর্যন্ত তাঁকে শাসকরূপে লাভ করতে চেয়েছিল।
তাঁর দেহ জড় জাগতিক লোকের মতো ছিল না, সেটি ছিল বিমুদ্ধ সত্ত্বময় দেহ। তাছাড়া বল, শ্রী, তেজ, বীর্য, শৌর্য এবং যশস্বীসম্পন্ন হওয়ায় তিনি সকলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। অতুলনীয় বৈশিষ্ট তাঁর মধ্যে দেখা গিয়েছিল। সকল ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ লক্ষণসমূহে দেখে মহারাজ নাভি তাঁর নাম রেখেছিলেন ঋষভ।
পরমেশ্বর ভগবানকে পুত্ররূপে লাভ করে মহারাজ নাভি অতি যত্নে, পরম স্নেহে তাঁকে লালন-পালন করেছিলেন। তারপর এক সময় সংসার ত্যাগ করে ভগবৎ ভজনের উদ্দেশ্যে পত্নী সহ মহারাজ নাভী বদরিকাশ্রমে চলে গিয়েছিলেন এবং সমস্ত রাজ্যের শাসনভার অর্পণ করেছিলেন পুত্র ঋষভদেবকে।
‘যস্য হি ইন্দ্র স্পর্ধমানো’–অর্থাৎ ঋষভদেবের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে দেবরাজ ইন্দ্র জগতে বারিপাত থেকে বিরত হলে, যোগেশ্বর ঋষভদেব ইন্দ্রের আচরণে মৃদু হেসেছিলেন (ভগবানৃষভদেবো যোগেশ্বরঃ প্রহস্যাত্মযোগমায়য়া এবং স্ববর্ষমজনাভং নামাভ্যবর্ষং)– এবং তারপর যোগমায়ার মাধ্যমে ‘অজানত’ নামে নিজ রাজ্যে প্রবল বৃষ্টিপাত ঘটিয়েছিলেন।
ভগবানকে শাস্ত্রে যজ্ঞ, যজ্ঞপতি, বলেও অভিহিত করা হয়। তাছাড়া ভগবান হচ্ছেন সর্বশক্তিমান, তাঁর পক্ষে এই রকম কাজ অতীব তুচ্ছ। এই যুগে জনগণের অজ্ঞতা ও যজ্ঞের উপকরণের অভাবের জন্য জনসাধারণ যজ্ঞানুষ্ঠানের অবহেলা করবে, তার ফলে প্রায়ই খরা বা অনাবৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
যজ্ঞানুষ্ঠানেই ভগবান তুষ্ট হন, তাই কলিযুগে সুমেধাসম্পন্ন ব্যক্তিরা সংকীর্তন যজ্ঞ দ্বারা ভগবানকে তুষ্ট করেন বলে শ্রীমদ্ভাগবতে উল্লেখ রয়েছে।
আর ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু মহামন্ত্র কীর্তন দ্বারা জগতের অন্তিম কল্যাণের পথ দেখিয়েছেন–
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে ॥
সাম্প্রতিককালে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য পরমহংস পরিব্রাজকাচার্য শ্রীশ্রীমৎ অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ বিশ্বময় সকলকে মহামন্ত্র দিক্ষা দিয়েছেন।
ভগবান হচ্ছেন সর্বজ্ঞ, তবু জগদ্বাসীকে শিক্ষা দেওয়ার জন্যে তিনি গুরুগৃহে শিক্ষা গ্রহণ করেন। প্রকৃত শিক্ষা গুরুকুলে লাভ হয়। সেটিই হচ্ছে বৈদিক পন্থা। স্বয়ং আচরণ করে অন্যকে শিক্ষা দেওয়া যায় বলে তিনি গুরুকুলে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। শিক্ষা শেষ করে তিনি গুরুবর্গকে দক্ষিণা দান করেন। তারপর গার্হস্থ্য জীবনে প্রবেশ করেন। দেবরাজ ইন্দ্রদত্ত জয়ন্তীকে তিনি পত্নীরূপে গ্রহণ করেন।
শ্রুতি ও স্মৃতি শাস্ত্র অনুযায়ী পত্নী সহ তিনি আদর্শ জীবন যাপন করেন। ঋষভদেব ও জয়ন্তীদেবী ভগবানের মতো গুণ-সম্পন্ন একশত পুত্র সন্তান লাভ করেন। তিনি আদর্শ গৃহস্থ জীবন যাপন করেছিলেন, এবং পুত্রদের শিক্ষা দিয়েছিলেন কিভাবে দিব্য জীবন যাপন করতে হয়।
ভগবানের অবতারের কার্যাবলী জড়-জাগতিক কর্ম নয়। ভগবদ্্গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং বলেছেন, ‘পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্’–অর্থাৎ ভক্তদের উদ্ধার ও অসুরদের বিনাশ করতে ভগবান জগতে আবির্ভূত হন–এইটি হচ্ছে তাঁর অবতরণের উদ্দেশ্য। প্রত্যেক মানুষের কর্তব্য হচ্ছে ভগবানের নির্দেশ, শাস্ত্র ও ভক্তদের শিক্ষা ও আদর্শ অনুসরণ করে দিব্য জীবন লাভ করা, কৃষ্ণভাবনাময় হওয়া এবং জীবন অবসানে ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়া।
ঋষভদেবের একশত পুত্র সম্বন্ধে শ্রীমদ্ভাগবতে লেখা আছে–
যেষাং খলু মহাযোগী ভরতো জ্যেষ্ঠঃ শ্রেষ্ঠ গুণ।
অসীদ্যেনেদং বষং ভারতমিতি ব্যপদিশন্তি ॥
তাঁর পুত্রদের মধ্যে অগ্রজ ভরতই ছিল শ্রেষ্ঠ গুণসম্পন্ন, তাঁর উদ্দেশ্যে সম্মান প্রদর্শনের জন্য এই পৃথিবীর নাম হয় ভারতবর্ষ। আধুনিক যুগে কেবল হিমালয় থেকে কুমারিকা অন্তরীপ পর্যন্ত ভূখন্ডকে ভারতবর্ষ বলা হয়। এই ভূখন্ডকে পূণ্যভূমিও বলা হয়। এই ভারতভূমিতে জন্ম-গ্রহণকারী অত্যন্ত ভাগ্যবান, কারণ এখানে সহজেই কৃষ্ণানুশীলন করে সহজেই ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়া যায়। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন–
ভারত ভূমিতে হৈল মনুষ্য-জন্ম যার।
জন্ম সার্থক করি’ কর পর-উপকার ॥ (চৈঃ চঃ আদি ১০/৪১)
আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের আচার্য ও প্রতিষ্ঠাতা ওঁ বিষ্ণুপাদ পরমহংস পরিব্রাজকাচার্য শ্রীল ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের দিব্য জীবনলীলা থেকে আমরা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আদর্শ শিক্ষার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখতে পাই।
কুশাবর্ত, ইলাবর্ত, ব্রহ্মবর্ত, মলয়, কেতু, ভদ্রসেন, ইন্দ্রস্পৃক, বিদর্ভ ও কীকট–এঁরা ছিলেন যথাক্রমে ভরতের অনুজ। তা ছাড়া কবি, হবি, অন্তরিক্ষ, প্রবুদ্ধ, দ্রুমিল, চমস, করভাজনাদি ন’জন ছিলেন ভাগবত ধর্ম প্রচারক মহাভাগবত। অবশিষ্ট পুত্রদের সম্বন্ধে শ্রীল শুকদেব গোস্বামী মহারাজ পরীক্ষিৎকে বলেছেন,–‘পিতৃরাদেশকরা মহাশালীনা, মহাশ্রোত্রিয়া, যজ্ঞশীলা কর্মবিশুদ্ধা ব্রাহ্মণা’–অর্থাৎ তাঁরা পিতার আজ্ঞাপালক, বিনীত, বেদজ্ঞ, যজ্ঞশীল ও বিশুদ্ধ কর্মরত ব্রাহ্মণ গুণসম্পন্ন ছিলেন।
মহারাজ হওয়ায় ঋষভদেব নিঃসন্দেহে ক্ষত্রিয় ছিলেন। এক শত পুত্রদের মধ্যে শাসন করত দশজন অর্থাৎ গুণ ও কর্ম অনুযায়ী তারা ছিল ক্ষত্রিয়। এখান থেকে জানা যায় গুণ ও কর্ম দ্বারাই একজনের বর্ণ নিরূপণ করা যায়–জন্ম দ্বারা নয়। ভগবানের সৃষ্টি এই বর্ণাশ্রম ধর্ম সম্বন্ধে ভগবান স্বয়ং ভগবদ্গীতায় বলেছেন–
চাতুর্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ।
জন্ম অনুসারে ঋষভদেবের পুত্ররা ক্ষত্রিয় হলেও, কিন্তু গুণ ও কর্ম অনুযায়ী কেউ ক্ষত্রিয়, কেউ ব্রাহ্মণ, আবার কেউ কেউ তাদের চেয়ে অনেক উন্নত শ্রীমদ্ভাগবতের প্রচারক মহাভাগবত ছিলেন। জনগণকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য ঋষভদেব বহু অনুষ্ঠান করেছিলেন এবং সঙ্গ সঙ্গে তিনি পুত্রদের প্রজাপালন শিক্ষাও দিয়েছিলেন।
পরমেশ্বর ভগবান হওয়ায় ঋষভদেব সম্পূর্ন স্বতন্ত্র কেন না তিনি ছিলেন সৎ, চিৎ ও আনন্দঘন এবং জন্ম, মৃত্যু, জরা ও ব্যাধির ঊর্ধ্বে। তা ছাড়া তিনি সকলের প্রতি সমভাবাপন্ন ছিলেন। তিনি অন্যের দুঃখে দুঃখী এবং সকল জীবের কল্যাণকামী সুহৃৎ ছিলেন। সকলের পরম নিয়ামক, পূর্ণ ব্যক্তিত্ব হলেও একজন সাধারণ বদ্ধ জীবের ন্যায় আচরণ করতেন। তাই তিনি কঠোরভাবে বর্ণাশ্রম ধর্ম আচরণ ও পালন করতেন। কালক্রমে বর্ণাশ্রম ধর্ম অবহেলিত হলে নিজ ব্যক্তিত্ব ও আচরণ দ্বারা অজ্ঞ জনসাধারণকে বর্ণাশ্রমোচিত কর্তব্য শিক্ষা দিয়েছিলেন। এইভাবে তিনি গৃহস্থ জীবনে ধর্ম, অর্থ, যশ, পুত্র-কন্যা, জড়ভোগ, অনন্ত জীবন লাভে জনগণকে নিয়ন্ত্রিত করেছিলেন। উপদেশের মাধ্যমে তিনি তাদের শিক্ষা দিয়েছিলেন কিভাবে গৃহস্থ জীবনে বর্ণাশ্রম ধর্ম আচরণ করেও তারা জীবনে সফল হতে পারে, ভগবদ্গতি লাভ করতে পারে।
ভগবান ঋষভদেব বিশ্ব পরিভ্রমণকালে একসময় ব্রহ্মবর্তে উপস্থিত হন। সেখানে ব্রাহ্মণ রাজপুত্র ও প্রজাদের এক সমাবেশ হয়; সংযত, বিনয়সম্পন্ন ও ভক্তিমান হলেও নিজ পুত্রদের তিনি শিক্ষা দিয়েছিলেন। ঋষভদেব বলেন, “হে পুত্রগণ, এই জগতে জীবকুলের মধ্যে মনুষ্য জীবন কুকুর বিষ্ঠাভোজী শূকরের সহজলভ্য ইন্দ্রিয় সুখভোগের উদ্দেশ্যে দিবারাত্র পরিশ্রম করাবার জন্য নয়। মনুষ্য জীবন কৃচ্ছৃসাধন ও তপশ্চর্যার জন্য–যার দ্বারা সত্ত্ব শুদ্ধ হয় ও অনন্ত চিন্ময় সুখ অনুভব করা যায়।”
“মহাত্মার সেবার মাধ্যমে ভববন্ধন মোচন হয়। ভগবৎ সত্তায় লীনে ইচ্ছুক বা ভগবৎ সঙ্গ লাভে অভিলাষী উভয়কেই মহাত্মার সেবা করা চাই। মহতের সেবাহীন স্ত্রীসঙ্গ ও স্ত্রীসঙ্গীর সঙ্গ অভিলাষীদের জন্য নরকের দ্বার উন্মুক্ত। মহাত্মারা সকলেই সুহৃৎ, প্রশান্ত, ক্রোধহীন, সাধু ও সর্বজীবে সমদৃষ্টিসম্পন্ন।”
“এই মহাত্মার কৃষ্ণভাবনার পুনর্জাগরণ করে ভগবদ্ভক্তি বৃদ্ধিতে আগ্রহী–যাতে কৃষ্ণের সুখ হয় না, এমন কর্মে তারা নিযুক্ত হন না।
“আহার, নিদ্রা, মৈথুন ও আত্মরক্ষাই যাদের জীবন, মহাত্মারা তাদের সঙ্গ করেন না। মহাত্মারা গৃহী হলেও তারা স্ত্রী-পুত্র-গৃহ ও অর্থ-সম্পদে আসক্ত নন। তবে নিজ নিজ কর্তব্য কর্মে তারা উদাসীন নয়। দেহ ও আত্মা রক্ষার্থে যতটুকু অর্থ একান্তই প্রয়োজন ততটুকু মাত্র তারা সংগ্রহ করেন।”
“ইন্দ্রিয়-তর্পণকেই যারা জীবনের চরম লক্ষ বিবেচনা করে, বিষয় ভোগে প্রমত্ত হয়ে তারা নানা রকম পাপকর্মে লিপ্ত হয়। তারা জানে না যে পূর্বের পাপ কর্মের ফলে তারা অনিত্য ক্লেশপ্রদ ভৌতিক দেহ লাভ করেছে। প্রকৃতপক্ষে জীবাত্মার জন্য জড় দেহ নয়, কিন্তু ইন্দ্রিয় ভোগের জন্য সে এই জড় দেহ প্রাপ্ত হয়। তাই যে ইন্দ্রিয়ভোগময় কর্মের ফলে বার বার বিভিন্ন জীবদেহ প্রাপ্তি হয়, বুদ্ধিমান ব্যক্তির সেই কর্মে রত হওয়া অনুচিত বলে আমি মনে করি।”
“এই জীবনে আত্মতত্ত্ব সম্বন্ধে উদাসীন ব্যক্তির জীবনে সকল প্রয়াসই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় এবং অজ্ঞতার ফলে জীবন দুঃখপূর্ণ হয়ে উঠে। পাপ বা পুণ্য কর্মের ফল রয়েছে। সাধারণত কাম্য কর্মে রত ব্যক্তির মন অশুদ্ধ, আর চেতনা অপবিত্র। কর্মফলে অভিলাষী ও আবিষ্ট হওয়ায় তাকে আবার ভৌতিক দেহ ধারণ করতে হবে।
“অজ্ঞানাচ্ছন্ন জীবন আত্মা ও পরমাত্মাকে উপলব্ধি করতে পারে না এবং তার মন সকাম কর্মের বশীভূত হয়। তাই ভগবান বাসুদেব, আমাতে প্রীতির উদয় না হলে, তার ভববন্ধন মোচন হয় না।”
“স্ত্রী-পুরুষের মিথুনীভাবই সংসার জীবনের মূল ভিত্তি। স্ত্রী-পুরুষের বন্ধনের ফলে দেহ, গেহ, সুত, ধন-সম্পদ আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। এইভাবে মোহাচ্ছন্ন হয়ে ‘আমি আমার দুর্বুদ্ধির উদয় হয়।”
“কর্মবন্ধনের ফলস্বরূপ দৃঢ় হৃদয়গ্রন্থী যখন শিথিল হয়, তখন বিষয়ভোগী জীবের গৃহ, স্ত্রী, সুতের প্রতি আসক্তি ক্ষয় হয়। এইভাবে তার (আমি ও আমার) মোহ বিদূরিত হয়, এবং সে তখন মুক্ত হয়ে পরাভক্তিতে উন্মুখ হয়।”
“হে পুত্রগণ, একজন পরমহংসকে দীক্ষাগুরুরূপে বরণ করবে। এইভাবে তোমাদের শ্রদ্ধা ও প্রীতি পরমেশ্বর ভগবান আমাদের অর্পণ করবে। শীত-গ্রীষ্ম ঋতুর পরিবর্তনের মতো দ্বন্দ্বময় সুখ-দুঃখে সহনশীল হয়ে ইন্দ্রিয় ভোগে বিতৃষ্ণা হবে, এমন কি ঊর্ধ্বলোকেও জীবকুলের দুর্দশাপূর্ণ অবস্থা উপলব্ধির চেষ্টা করবে। সত্যানুসন্ধান করা চাই। ভগবদ্ভক্তি লাভের জন্য সব রকমের কৃচ্ছ্রসাধন ও তপশ্চর্যা করা চাই। ইন্দ্রিয়-ভোগের প্রয়াস ত্যাগ করে ভগবদ্ভক্তি অনুশীলন কর। ভগবৎ কথালোচনা শ্রবণ কর, চিন্ময় ভূমিকায় সকলের প্রতি সমদৃষ্টিসম্পন্ন হও। বৈরীভাব ত্যাগ কর, শোক ক্রোধের বশীভূত হয়ো না। দেহ-গৃহে আত্মবুদ্ধি ত্যাগ করে শাস্ত্র অধ্যয়ন অনুশীলন কর। ইন্দ্রিয়, মন ও প্রাণবায়ুকে এই পন্থায় সম্পূর্ণভাবে সংযত করা চাই। বৈদিক শাস্ত্র বাক্যে পূর্ণ বিশ্বাস করে সর্বদা ব্রহ্মচর্য রক্ষা করতে হবে এবং পরমেশ্বর ভগবানকে মনে রাখতে হবে। এইভাবে ভক্তিযাগ অনুশীলন করে জড় অহংকারকে ত্যাগ করবে।
“যে ঐকান্তিকভাবেই ভগবদ্ধামে যেতে চায়, পরমেশ্বর ভগবানের কৃপা লাভকে তার জীবনের পরম লক্ষ্যরূপে বিবেচনা করা চাই। পিতা, গুরু বা রাজা–পুত্র, শিষ্য ও প্রজাদের আমার মতোই উপদেশ দিবেন। এইগুলি বুঝতে বা পালনে তারা কখনও কখনও অসমর্থ হলেও, তাদের উপদেশ দেওয়া উচিত, ক্রদ্ধ হওয়া উচিত নয়। পাপ ও পুণ্য কর্মে নিযুক্ত ব্যক্তিদের সর্ব প্রকারে ভগবৎ ভজনে নিয়োগ করা উচিত। দিব্যজ্ঞানহীন অন্ধ নেতা তার অনুগামীদের সংসারকূপে পতন ঘটায়, কিন্তু পিতা, গুরু বা রাজা অনুগামীদের ভগবৎ সেবায় নিয়োগ করে।”
“আপাত দৃষ্টিতে জড় মানব দেহ হলেও আমার এই শরীর সৎ, চিৎ ও আনন্দময়–অপ্রাকৃত ও অবিচিন্ত্য। আমি জড় মায়ার প্রভাবে বিশেষ দেহ ধারণ করি না, পক্ষান্তরে আত্মমায়ায় স্বয়ং প্রকাশিত হই। আমার হৃদয়ও অপ্রাকৃত, আমি সর্বদাই আমার ভক্তদের কল্যাণ চিন্তা করি। তাই আমার হৃদয়ে শুধু ভক্তিই বিরাজমান দেখা যায়। অধর্ম, অভক্তি আমার হৃদয় থেকে বহু দূরে পরিত্যক্ত। এইগুলি আমার হৃদয়কে স্পর্শও করে না। এ সব দিব্য গুণাবলীর জন্য জণগণ আমাকে পরমেশ্বর (সর্বশ্রেষ্ঠ জীব) ঋষভদেব রূপে বন্দনা করে।”
“হে পুত্রগণ, তোমরা সকলেই আমার হৃদয় থেকে উৎপন্ন হয়েছ, তাই বিদ্বেষী ও বিষয়ীর মতো আচরণ করো না, তোমাদের অগ্রজ মহাভাগবত ভরতের সেবা করো, তা হলে আমার সেবা হবে ও তোমরা স্বতঃই প্রজা পালন করবে। জন্ম-মৃত্যুময় সংসার থেকে যিনি তার অধীনস্থ প্রিয়জনকে উদ্ধার কতে পারেন না তাঁর কখনও গুরু, পিতা, পতি বা জননী হওয়া উচিত নয়।”
“সকল জীবসমূহের মধ্যে ব্রাহ্মণরাই শ্রেষ্ঠ, কিন্তু ব্রাহ্মণের চেয়েও বৈষ্ণবেরা শ্রেষ্ঠ। বৈষ্ণবের সেবা করা হলেই পরমেশ্বর ভগবানের সেবা হয়ে যায়।”
এইভাবে জীবকুলের পরম সুহৃৎ পরমেশ্বর ভগবান ঋষভদেব নিজ পুত্রদের উপদেশ দিয়েছিলেন।

Comments are closed.

November 2015
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30  

Blog Stats

  • 140,963 hits