বৈষ্ণব ধর্মের ঐতিহ্যের ইতিহাস- পর্ব ৬- জগতে কৃষ্ণভক্তি প্রচার

গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের ঐতিহ্য অনেকদিন ধরে চলে আসছে। ভগবান ব্রহ্মাকে প্রথম এই জ্ঞান দান করেছেন। এই ব্রহ্মান্ডের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ যিনি তিনি হচ্ছেন বৈষ্ণব, তিনি হচ্ছেন আমাদের গুরুদেব। তার থেকে আমাদের সম্প্রদায়, ব্রহ্ম সম্প্রদায় শুরু হয়েছে। তারপর এইভাবে ব্রহ্মা থেকে মহান ভগবদ্ভক্ত নারদমুনি এসেছেন। এসেছেন ব্যাসদেব, যিনি সমস্ত বৈদিক শাস্ত্রগুলি রচনা করেছেন। এইভাবে ক্রমান্বয়ে ব্যাসদেব থেকে মধ্বচার্য এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এসেছেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু থেকে রূপ গোস্বামী, সনাতন গোস্বামী, রঘুনাথ দাস গোস্বামী এসেছেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যে অমূল্য সম্পদটি আমাদের দান করতে এসেছিলেন সেটি তিনি সারা ভারত জুড়ে প্রচার করেছেন। আজ থেকে ৫০০ বছর আগে এই পৃথিবীতে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যখন ছিলেন, তখন সারা ভারতজুড়ে কৃষ্ণভক্তির প্রচার হয়েছে। তার মানে গোটা ভারতবর্ষ তখন কৃষ্ণনগর ছিল। কিন্তু কারক্রমে মহাপ্রভুর অপ্রকটের পর ধীরে ধীর মহাপ্রভু প্রবর্তিত পন্থাটি প্রায় হারিয়ে যায় বা লুপ্ত হয়ে যায় এবং সেই সঙ্গে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ধামও লুপ্ত বা লোকচক্ষুর অগোচর হয়ে গিয়েছিল। লোকেরা ভুলে গিয়েছিল লোকেদের চোখের থেকে আড়াল হয়ে গিয়েছিল। তখন মহাপ্রভুর নাম করে কতকগুলি সুবিধাবাদী স্বার্থান্বেষী মানুষ নিজেদের মনগড়া মত প্রচার করেছিল। তারা মহাপ্রভুর নাম করে যত সমস্ত কদর্য আচরণ করত। ফলে কোন সভ্য রুচিমার্জিত ব্যক্তি মহাপ্রভুর অনুগমন করত না। তারা মনে করত এই সমস্ত অবৈধ আচরণগুলি হচ্ছে মহাপ্রভুর প্রবর্তিত মত বা পথ। সেই সময় শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর আবির্ভূত হন। শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর এখানে এসে পুনরায় কৃষ্ণভক্তির প্রচার শুরু করেন। শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর হলেন ভগবানের নিত্য পার্ষদ, কিন্তু লীলাচ্ছলে তিনি ভাব করেন যেন মহাপ্রভুকে জানেন না বা মহাপ্রভুর মত কি সেটা সম্বন্ধে অবগত নন। তারপর শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর যখন উড়িষ্যায় ছিলেন, তখন তিনি এক বৈষ্ণবের কাছ থেকে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সম্পর্কে অবগত হন। আর এইভাবে তিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রতি আকৃষ্ট হন। কিন্তু তখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সম্বন্ধে কোন গ্রন্থ পাওয়া যেত না। অনেক খুঁজে খুজে অবশেষে তিনি একখন্ড শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত প্রাপ্ত হন। সেই গ্রন্থটি পড়ে শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর এত মুগ্ধ হন যে, তিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মতটি প্রচার করতে সর্বতোভাবে বদ্ধ পরিকর হন। তিনি স্বয়ং মহাপ্রভুর শিক্ষা ও মহাপ্রভু সম্বন্ধে লিখতে শুরু করেন এবং গ্রন্থাবলী ছাপাতে শুরু করেন। এইভাবে শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর যে সংকীর্তন আন্দোলন এবং যে স্বধর্ম শিক্ষা সেটি পুনরায় স্থাপন করেন। কিন্তু শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর তখন ছিলেন একজন অত্যন্ত উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী, তাই ততটা সময় ছিল না। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি প্রচুর গ্রন্থাবলী লিখেছেন। তিনি প্রতিদিন ভগবানের নাম জপ কীর্তন করতেন। রাতের বেলা চার ঘন্টার মতো ঘুমাতেন। এইভাবে ভক্তিবিনোদ ঠাকুর ভগবানের বাণী প্রচারে বদ্ধপরিকর হয়েছিলেন। প্রচার কার্যে তার অক্ষমতা অনুভব করে, তিনি জগন্নাথের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন তিনি যেন তাকে একজন উপযুক্ত সহায়ককারী পাঠান। তারই প্রার্থনা অনুসারে জগন্নাথদেবের কৃপায় শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর তার পুত্ররূপে আবির্ভূত হন। শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর কালক্রমে শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের ধারাটি সারা ভারতজুড়ে প্রচার করেন। শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের পরে শ্রীল প্রভুপাদ, অর্থাৎ আমাদের পরম আরাধ্য গুরুদেব শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ এসে শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত ঠাকুরের ইচ্ছা অনুসারে সারা পৃথিবী জুড়ে কৃষ্ণভক্তির প্রচার করেন। আজ থেকে ৫০০ বছর আগে শ্রীচেতন্য মহাপ্রভু ভবিষ্যৎ বাণী করেছেন যে পৃথিবীর প্রতিটি গ্রামে ও নগরে কৃষ্ণভক্তির প্রচার হবে। ৫০০ বছর আগে মানুষ ভাবতেই পারত না সারা পৃথিবী জুড়ে কৃষ্ণভক্তির প্রচার হবে।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু হচ্ছেন ভগবান। ভগবান যা বলেছেন তা সত্যি হবেই। তাঁর বাণী প্রচারের জন্যই তিনি শ্রীল প্রভুপাদকে পাঠিয়েছিলেন। প্রভুপাদ ৭০ বছর বয়সে প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় আমেরিকায় গিয়েছিলেন। সেখানে প্রচুর খরচ, ওখানকার একদিনর যা খরচ, তা আমাদের এখানে ১ মাসের খরচের সমান। সেই রকম একটি পরিস্থিতিতে শ্রীল প্রভুপাদ সেখানে যান। তিনি কেবলমাত্র ১২ বছরের মধ্যে সারা পৃথিবী জুড়ে কৃষ্ণভক্তি প্রচার করেন। যা একটি অসম্ভব ব্যাপার। ভগবানের কৃপায় প্রভুপাদ এই অলৌকিক কার্যটি সম্পন্ন করলেন।

Comments are closed.

October 2015
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Blog Stats

  • 140,963 hits