মহাভারতের শিক্ষা

বিদুর ছিলেন ধৃতরাষ্ট্রের রাজসভার একজন মন্ত্রী। যদিও তিনি ছিলেন ধৃতরাষ্ট্রের কনিষ্ঠ ভ্রাতা, কিন্তু তিনি অত্যন্ত জ্ঞানী ছিলেন। তিনি ছিলেন স্বয়ং মূর্তিমান ধর্ম। তিনি ছিলেন ধর্মরাজ যমরাজের অবতার। তাই তিনি যথার্থভাবেই সর্বদা ধর্মের স্তরে অধিষ্ঠিত ছিলেন। অপরপক্ষে দুর্যোধন ছিল কলির অবতার, আর তার কাজই ছিল ধর্মকে পরাস্ত করে অধর্মের প্রতিষ্ঠা করা। তাই বারম্বার বিদুর ধৃতরাষ্ট্রকে পরামর্শ দিয়েছিলেন দুর্যোধনকে পরিত্যাগ করার জন্য। প্রকৃতপক্ষে দুর্যোধনের জন্মের পরেই তাকে পরিত্যাগ করার জন্য, দুর্যোধনকে হত্যা করার জন্য, বিদুর ধৃতরাষ্ট্রকে বলেছিলেন। কেন দুর্যোধনকে জন্মের পরেই হত্যা করা উচিত সে বিষয়ে যথেষ্ঠ যুক্তিসঙ্গত কারণও বিদুর প্রদর্শন করেছিলেন; কেননা তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে, দুর্যোধনের জন্মের পরে পরেই সমস্ত রকমের অশুভ লক্ষণসমূহ পরিস্ফুটিত হয়েছিল।
বিদুরের মতন ব্যক্তিগণ হচ্ছেন ত্রিকালজ্ঞ। সময়ের তিনটি স্তরকেই তাঁরা দর্শন করতে পারেন। কেবলমাত্র ভবিষ্যত নয়, তাঁরা অতীত, বর্তমান, সেই সঙ্গে ভবিষ্যতকেও দর্শন করতে পারেন। বিদুর দেখতে পেয়েছিলেন যে এই ব্যক্তিটি অর্থাৎ দুর্যোধন যে কেবলমাত্র তার সমগ্র পরিবারের বিনাশের কারণ হবে তাইই নয় এবং সে সমগ্র ক্ষত্রিয় কুলের বিনাশের কারণ হবে, এমনকি সে এই পৃথিবী গ্রহেরও বিনাশের কারণ হবে।
কিন্তু ধৃতরাষ্ট্র তাঁর পুত্র স্নেহে এতটাই প্রভাবান্বিত ছিলেন যে তিনি বিদুরের বিজ্ঞ উপদেশ গ্রহণ করেন নি। শ্রীল প্রভুপাদ উল্লেখ করেছেন যে ধৃতরাষ্ট্র কেবল যে জাগতিকভাবেই অন্ধ ছিলেন তা নয়, তিনি পারমার্থিক দিক দিয়েও অন্ধ ছিলেন। তিনি কেবল দেহগতভাবেই অন্ধ ছিলেন না, তার পারমার্থিক দৃষ্টিও ছিল শূণ্য। তাই তিনি কি ঠিক আর কি ভুল, কি করা উচিত আর কি করা উচিত নয় তা দর্শন করতে পারতেন না। ফলে ধৃতরাষ্ট্র সেই সময় বিদুরের উপদেশ গ্রহণ করেন নি।
বিভিন্ন সময়ে, বারংবার, ধৃতরাষ্ট্রকে বিদুর সেই একই উপদেশ প্রদান করে গেছেন। যখন দুর্যোধনেরা কুন্তীসহ পান্ডবদের হত্যা করার চেষ্টা করেছিল তখনও বিদুর ধৃতরাষ্ট্রকে বলেছিলেন “আপনার পুত্রের থেকে নিস্তার লাভ করুন। সে একটি মূর্তিমান অশুভ।” পাশা খেলায় প্রবঞ্চিত করে যখন পান্ডবদেরও সবকিছু কেড়ে নেওয়া হচ্ছিল এবং দ্রৌপদীকে টানতে টানতে রাজসভায় নিয়ে এসে সর্বসমক্ষে লাঞ্ছিত করা হচ্ছিল, বিদুর তখনও ধৃতরাষ্ট্রকে বলেছিলেন “আপনার পুত্রকে পরিত্যাগ করুন।”
দৌপদী লাঞ্ছনার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য রাজসভায় সকলের কাছে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু কেউই এই লাঞ্ছনার প্রতিবাদ করে উঠে দাঁড়াননি। কুরু বংশের সকল জ্যেষ্ঠ সদস্যরা তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন। স্বয়ং পিতামহ ভীষ্মদেব সেখানে উপস্থিত ছিলেন। দ্রোণাচার্য উপস্থিত ছিলেন। ধৃতরাষ্ট্র তো উপস্থিত ছিলেনই। কিন্তু কেউই এই ঘৃণ্য, অমানবিক আচরণের প্রতিবাদ করেননি। একমাত্র বিদুর উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই রাজসভায় দাঁড়িয়ে ধৃতরাষ্ট্রক সাবধান করেছিলেন, “এখনও সময় আছে, দয়া করে এই ধরিত্রীকে অবমাননাকর বিনাশসাধন থেকে রক্ষা করুন। আপনার পুত্রকে ত্যাজ্য করুন।” কিন্তু ধৃতরাষ্ট্র কর্ণপাত করেননি।
এরপর আবার কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ সংঘটিত হতে চলার ঠিক পূর্বে, বিদুর ধৃতরাষ্ট্রকে উপদেশ প্রদান করলেন, “আপনি দয়া করে আপনার পুত্রটিকে পরিত্যাগ করুন। সে ভালো নয়। সে একটি অন্ধ চক্ষুর মতো, যা কখনই কোন উদ্দেশ্য সাধন করে না। তেমনি দুর্যোধনও আপনার কোন উদ্দেশ্য সাধন করবে না, বরং আপনার দুর্দশার কারণ হবে। কেবল আপনারই নয়, সে সমগ্র পরিবারের বিনাশের কারণ হবে। সে কুলঘ্ন, সে অগ্নির মতো কুল বা বংশকে ভস্মীভূত করে। তাই দয়া করে তাকে পরিত্যাগ করুন।” ধৃতরাষ্ট্র বিদুরের কথা শুনলেন না। বরং, সেই সময় দুর্যোধন এসে কাকা বিদুরকে অত্যন্ত কর্কশ বাক্য প্রয়োগ করে অপমানিত করলেন। বিদুর গৃহত্যাগ করলেন। তিনি দেখলেন যে যা অবশ্যম্ভাবী তাকে আর এড়িয়ে থাকা সম্ভব নয়। তাই তিনি চলে গেলেন।
কেবল বিদুরই নন। বিদুরের মতো এই উপদেশ ধৃতরাষ্ট্রকে এমনকি গান্ধারীও প্রদান করেছিলেন। গান্ধারী ছিলেন দুর্যোধনের মাতা। কিন্তু তৎসত্ত্বেও তিনি দুর্যোধনকে পরিত্যাগ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। দ্রৌপদী কিভাবে রাজসভায় লাঞ্চিত হচ্ছেন, অপমানিত হচ্ছেন তা দর্শণ করে গান্ধরী ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেছিলেন। গান্ধারী রাজসভায় ছিলেন না। কিন্তু অন্দরমহল থেকে তিনি দ্রৌপদীর আর্ত-ক্রন্দন শুনতে পেয়েছিলেন; তাই তিনি দ্রুত জানালার কাছে ছুটে আসেন। বৈদিক সংস্কৃতি অনুসারে রাজসভায় সাধারণতঃ নারীগণ উপস্থিত থাকতেন না বা যেতেন না। কিন্তু কিছু ছোট ছোট জানালা ছিল, যা দিয়ে রাজসভায় কি হচ্ছে প্রয়োজন হলে তা তাঁরা দেখতে পারতেন। তাই গান্ধারী যখন দ্রৌপদীর আর্ত ক্রন্দন শ্রবণ করলেন, তখন তিনি জানালার কাছে চলে এলেন। যেহেতু গান্ধারীর চোখ দুটো সবসময় বাঁধা থাকতো, তাই তিনি দেখতে পেতেন না। কিন্তু দ্রৌপদীর আর্তক্রন্দন শ্রবণ করে এবং অন্যান্যদের কাছে বিস্তৃত জানতে পেরে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন রাজসভায় কি হচ্ছে। তিনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে তৎক্ষণাৎ ধৃতরাষ্ট্রের কাছে রাজসভায় ছুটে গেলেন এবং নিবেদন করলেন যে, “আমি এখন আপনার নিকট একটি অনুরোধ নিয়ে এসেছি।”
ধৃতরাষ্ট্র উত্তর প্রদান করলেন, “বেশ বলো। আমি তোমার অনুরোধ রক্ষা করব।”
গান্ধারী বললেন, “ওকে পরিত্যাগ করুন।”
“কাকে?” ধৃতরাষ্ট্র জিজ্ঞাসা করলেন।
গান্ধারী বললেন, “দুর্যোধনকে।”
ধৃতরাষ্ট্র কখনই আশা করতে পারেন নি যে একজন মাতা স্বয়ং তার সন্তানকে ত্যাজ্য করার কথা বলতে পারে। ধৃতরাষ্ট্র কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে রইলেন। ধৃতরাষ্ট্রকে ইতস্ততঃ করতে দেখে গান্ধারী প্রশ্ন করলেন “আপনি একজন রাজা। আপনরার কোন প্রজা যদি কোন নারীকে লাঞ্ছিত করে, আপনি তখন কি করবেন?”
“আমি তাকে নির্বাসিত করব।” ধৃতরাষ্ট্র উত্তর দিলেন।
গান্ধারী বললেন, “আপনার পুত্র সেটিই করেছে, আপনি তাকে নির্বাসিত করুন।”
কিন্তু ধৃতরাষ্ট্র তা করলেন না। তিনি যুক্তি দেখালেন, “না, না, শেষপর্যন্ত তুমি যা ভাবছ, ঠিক সেরকমটি নয়।”
তখন গান্ধারী বললেন, “দেখুন, আমি মা। আমি আমার গর্ভে তাকে দীর্ঘদিন ধারণ করেছি। আমি তাকে আমার আপন স্তন দুগ্ধ পান করিয়েছি। যখন তার ছোট ছোট হাত দুটো আমাকে জড়িয়ে ধরতো, মাতৃস্নেহে, বাৎসল্য রসে আমার হৃদয় পূর্ণ হয়ে উঠতো। সেই আমি আপনাকে এই আবেদন করছি, কিন্তু আপনি তার এতটুকু প্রয়োজন অনুভব করছেন না?”
তবুও ধৃতরাষ্ট্র গান্ধারীর আবেদন প্রত্যাখ্যান করলেন। এই হলো একজন পারমার্থিকভাবে অন্ধ ব্যক্তির আচরণ। তার চিন্তা ভাবনা, ধারণা ও বুদ্ধির মধ্যে স্বচ্ছতার অভাব থাকে।
এইজন্যই ‘মহাভারত’ আমাদের জন্য অত্যন্ত চমৎকার এক দৃষ্টি উন্মীলন প্রদায়ী জ্ঞান ভান্ডার। প্রকৃতপক্ষে মহাভারত কখন কি করা উচিত আর কখন কি করা উচিত নয় সে বিষয় আমাদের বিস্তৃতভাবে বর্ণনা প্রদান করে। আর এইভাবে ধীরে ধীরে শেষপর্যন্ত মহাভারত আমাদের কৃষ্ণ-শরণাগতির দিকে নিয়ে আসে। আমরা যখন কৃষ্ণ-শরণাগত হই তখন তাতে লাভটা কি? এবং আমরা যখন কৃষ্ণবিরোধী হই তখন আর অসুবিধাটি কি?
কেউ কৃষ্ণবিরোধী হলে, তার অন্তিম ফলটি অত্যন্ত অশুভ হয়ে ওঠে। সে কতটা ধার্মিক বা মহৎ সেটা কোন ব্যাপার নয়। চূড়ান্ত বিবেচনাটি হলো, সে কৃষ্ণ-শরণাগত কি না। এই শিক্ষাটিই ‘মহাভারত’ ও ‘ভগবদ্গীতা’র মতো অপূর্ব শাস্ত্রে প্রধান মণিরত্নের মতো স্থাপিত হয়েছে।
আমরা দেখতে পাই যে বিদুর ধৃতরাষ্ট্রকে উপদেশ প্রদান করলেও, ধৃতরাষ্ট্র তা শ্রবণ করতে ইচ্ছুক ছিলেন না। তিনি তার পুত্রের প্রতি আসক্তির দ্বারা এতটাই প্রভাবিত ছিলেন। কেন? সেটি ইতহাসই প্রকাশ করছে। ধৃতরাষ্ট্র ছিলেন অত্যন্ত দুর্ভাগা। তিনি ছিলেন চন্দ্র বংশের রাজ পরিবারের জ্যেষ্ঠ পুত্র। স্বাভাবিকভাবেই পরিবারের জ্যেষ্ঠ পুত্রের রাজা হওয়ার কথা, কিন্তু তিনি রাজা হতে পারছিলেন না কেননা তিনি ছিলেন জন্মান্ধ। কিন্তু তার আশা ছিল, ঠিক আশা নয়, বলা ভালো দৃঢ় প্রত্যয় ছিল যে তিনি রাজা হতে না পারলেও, তার পুত্রই রাজা হবে। এই প্রত্যাশা ও বিশ্বাসকেই তিনি মনে মনে লালন করে বেঁচে ছিলেন। কিন্তু সময়ান্তরে তাঁর পুত্রের জন্ম হবার আগেই পান্ডুর পুত্রের জন্ম হলো। ফলে ধৃতরাষ্ট্র পুনরায় আশাহত হলেন। যদিও পান্ডু ধৃতরাষ্ট্রের কনিষ্ঠ ভ্রাতা, কিন্তু পান্ডুর পুত্রই আগে জন্ম নিল। তাই বৈদিক প্রথা অনুযায়ী রাজ পরিবারের জ্যেষ্ঠ পুত্রই যেহেতু রাজা হতে পারেন, সেই ঐতিহ্য বা নিয়ম অনুযায়ী পান্ডুর পুত্র যুধিষ্ঠির মহারাজই সিংহাসনের স্বাভাবিক উত্তরাধিকারী। আর এইটিই ছিল দুর্যোধনের ঈর্ষার অন্যতম কারণ। যেহেতু সে রাজা হতে পারবে না, তাই শিশুকাল হতেই ধৃতরাষ্ট্র পুত্র দুর্যোধন ছিল অত্যন্ত ঈর্ষান্বিত। কেবল তাই-ই নয়, পান্ডবগণ বিশেষ করে ভীম, শক্তিতে ও অন্যান্য গুণাবলীতে দুর্যোধনের চেয়ে অনেক শ্রেষ্ঠ ছিলেন। সকল পান্ডবগণই ছিলেন অত্যন্ত সুবিখ্যাত। সকলেই তাদের ভালোবাসত ও শ্রদ্ধা করতো। বিশেষ করে ভীষ্ম ও দ্রোণ। দুর্যোধন সেটা সহ্য করতে পরতেন না। কেননা এই দু’জনেই ছিলেন সেই সময়ে তার জীবনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। ভীষ্মদেব ছিলেন পিতামহ এবং দ্রোণাচার্য ছিলেন তার অস্ত্রশিক্ষা-গুরু। অর্জুণ সবদিক থেকেই দুর্যোধনকে ছাপিয়ে গিয়েছিলেন। শক্তিতে ভীমও তাকে ছাপিয়ে গিয়েছিলেন। তাই দুর্যোধন অত্যন্ত ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠেছিলেন। অন্যথায় দুর্যোধনের অনেক গুণাবলী ছিল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত মহৎ। কিন্তু তার শত মহত্ত্ব, তার শত গুণাবলীকে নষ্ট করে দিয়েছিল তার এই একটিই মাত্র দোষ–ঈর্ষা।
আবার দুর্যোধনকে কলির অবতার বলা হয়ে থাকে। কলি কে? কলি হলো ঈর্ষা ও ক্রোধের পুত্র। তাই প্রকৃতপক্ষে দুর্যোধন ছিলেন ঈর্ষা ও ক্রোধের এক মিশ্র উৎপাদন। দুর্যোধন তাই অত্যন্ত ঈর্ষান্বিত থাকতেন, বিশেষ করে পান্ডবদের ক্ষেত্রে। কিন্তু এটি ছাড়া দুর্যোধন অনেক ভালো গুণে গুণান্বিত ছিলেন। অত্যন্ত ভদ্র ও উদার বা দানশীল। আর সেইজন্যই এত অসংখ্য মানুষ তাদের জীবন উৎসর্গ করার জন্য দুর্যোধনের পক্ষে যোগদান করেছিল।
দ্রোণাচার্য যখন পান্ডব ও কৌরবদের সঙ্গে তাঁর পুত্র অশ্বত্থামার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, দ্রোণাচার্য আশা করেছিলেন যে স্বাভাবিকভাবেই অশ্বত্থামা পান্ডবদের প্রতি আকর্ষিত হবে। কিন্তু পরিবর্তে দুর্যোধনের সঙ্গে অশ্বত্থামার একটি সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এতটাই গভীর ছিল সেই বন্ধুত্ব যে, দুর্যোধনের জন্য অনেক ঘৃণ্য কাজও সে করেছিল। এইসব ঘৃণ্য কাজগুলির মধ্যে জঘন্যতম ছিল নিদ্রিত ব্যক্তিদেও হত্যা; বিশেষত দ্রৌপদীর পাঁচ পুত্রকে। অশ্বত্থামা কেবলমাত্র দুর্যোধনকে সন্তুষ্ট করার জন্যই এইসব করেছিল। অশ্বত্থামার জীবনের ব্রত, তার অস্তিত্বের উদ্দেশ্যেই যেন ছিল কেবলমাত্র দুর্যোধনকে সন্তুষ্ট করা।
ঠিক একইভাবে কর্ণের প্রতি দুর্যোধনের উদার মনোভাবের জন্য, কর্ণও দুর্যোধনের কাছে বিক্রিত হয়ে গিয়েছিল। অনেক বৎসর কুরু রাজপুত্রদের অস্ত্রশিক্ষা প্রদানের পর, কুরু রাজপুত্রেরা অস্ত্রশিক্ষায় কতখানি দক্ষতা অর্জন করল তা প্রদর্শনের জন্য দ্রোণাচার্য এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে সহসা কর্ণ এস উপস্থিত। অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্যের বিচক্ষণ চোখ কর্ণকে একবার দেখেই বুঝতে পারল, অত্যন্ত শক্তিশালী ও অত্যন্ত প্রতিভাধর এই কর্ণ। দ্রোণাচার্য সমস্যা সন্দিগ্ধ হয়ে কর্ণকে এই জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার পরিচয় কি? কি নাম তোমার?” কর্ণ স্বীকার করলেন তিনি নিম্ন জাতের। সূত পুত্র। তখন দ্রোণাচার্য তাকে বললেন, “তুমি রাজপুত্রদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবে না। তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য তোমাকে সমগোত্রীয় হতে হবে। কোন্ সাহসে এখানে এসে তুমি রাজপুত্রদের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আহ্বান করছো?”
ঠিক সেই সময় দুর্যোধন ঘোষণা করলেন, “ঠিক আছে, আমি ওকে অঙ্গ রাজ্য দান করছি।”এইভাবে তখন কর্ণকে অঙ্গরাজ্য দান করে দুর্যোধন তাকে ক্ষত্রিয় স্তরে উন্নীত করলেন।
তাহলে আমরা দেখতে পারছি যে, দুর্যোধনের অনেক ভালো গুণ ছিল। ফলে কর্ণের মতো বহু মানুষ তার প্রতি পূর্ণরূপে কৃতজ্ঞ ছিল। তাই, কর্ণ একজন অত্যন্ত মহান ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও, দুর্যোধনের সন্তোষবিধানের জন্য অত্যন্ত অধঃপতিত স্তরে নেমে যেতেও দ্বিধা করেনি।
এইজন্য শ্রীল প্রভুপাদ আমাদের নির্দেশ প্রদান করেছেন যে আমরা কি ধরনের সঙ্গ করছি সে বিষয়ে আমরা যেন অত্যন্ত সতর্ক থাকি। সঙ্গ করার ব্যাপারে আমাদের খুবই সাবধান থাকতে হবে। আমরা যদি অসৎ সঙ্গে অবস্থান করি, আমরা যতই ভালো হই না কেন সেটা কোন ব্যাপার নয়, সেই অসৎ সঙ্গের প্রভাব আমাদের উপর পড়বে। সুতরাং ‘সঙ্গ’ ব্যাপারটি অতি গুরুত্বপূর্ণ।
দুর্যোধন, এইভাবে কর্ণকে জয় করেছিল। কর্ণের আর কি কথা, এমনকি মাদ্রীর ভ্রাতা, পান্ডবদের মামা শল্যকেও সে জয় করেছিল। শল্য কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পান্ডব পক্ষেই যোগদান করতে এসেছিলেন। কিন্তু দুর্যোধনের ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে অবশেষে কৌরব পক্ষে যোগদান করেন।
যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে কর্ণের একটি সমস্যা ছিল। সেটি হলো, কর্ণ যখন জানতে পারল যে কৃষ্ণ হবেন অর্জুনের রথের সারথি, কর্ণ দুর্যোধনকে বললো, “দেখো, দুর্যোধন, কৃষ্ণের মতো একজন সারথি যদি অর্জুনের থাকে, তাহলে আমি তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সমর্থ হব না।” দুর্যোধন জিজ্ঞাসা করল, “তাহলে কে তোমার রথের সারথি হতে পারে? কর্ণ বললো, “সবচেয়ে দক্ষ সারথি হচ্ছে মদ্ররাজ শল্য, কিন্তু সে পান্ডবদের মাতুল। তাকে কি করে পাওয়া যাবে?” এই কথা শুনে দুর্যোধন শল্যের সঙ্গে সাক্ষাতের আয়োজন করলেন। শল্য আগমন করলে পর, দুর্যোধন তার সঙ্গে এমন সুন্দর ব্যবহার করলেন যে তার সুহৃদরূপে শল্য দুর্যোধনের পক্ষে যোগদান করতে বাধ্য হলেন তার আপন ভাগ্নে পান্ডবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য।
তো এইজন্য দুর্যোধনকে কেউ কেউ অত্যন্ত সুকৌশলি পরিকল্পক বলে অভিহিত করে থাকে। তার প্রতিটি আচরণ ও কাজের পেছনে কোন লক্ষ বা উদ্দেশ্য অবশ্যই কাজ করতো, কিন্তু তবুও দুর্যোধন এমন উপায়ে সেইসব কাজ করতো যে সকলেই তাকে অত্যন্ত ভদ্র, সুন্দর ব্যক্তিত্ব বলে স্বীকার করতে বাধ্য হতো। তার ফলে অনেক মানুষ দুর্যোধনের পক্ষে যোগদান করেছিল। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ আয়োজিত হলে, পান্ডবগণের পক্ষে ছিল সাত অক্ষৌহিনী সেনা, কিন্তু কৌরব পক্ষে ছিল এগারো অক্ষোহিণী সেনা। পান্ডবদের পক্ষে যারা ছিলেন তারা সকলেই ছিলেন রক্তের সম্পর্কে পান্ডবদের আত্মীয়, যেমন, দ্রুপদ, ধৃষ্টদ্যুম্ন, বিরাট ও অন্যান্যরা। কিন্তু কৌরব পক্ষে আত্মীয় স্বজন ছাড়াও এমন অসংখ্য মানুষ ছিল যারা কেবল দুর্যোধনের ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে যোগদান করেছিল। এইভাবে আমরা দেখতে পারি যে দুর্যোধনের অনেক ভালো গুণ থাকা সত্ত্বেও, কেবলমাত্র একটি জিনিস, তার ঈর্ষা দোষের জন্য শেষ পর্যন্ত দুর্যোধন এক মূর্তিমান অশুভ।
ঈর্ষা, ক্রোধ আনয়ন করে। অতএব এই দুটির প্রভাবকে পরাস্ত করার জন্য আমাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। কেবলমাত্র পারমার্থিক অগ্রগতি সাধনের জন্যই নয়, এমনকি আমাদের যথার্থ জীবনযাপনেও। আর এই উদ্দেশ্যেই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু আগমন করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এই জগতে অবতরণ করেছিলেন কলির প্রভাবকে প্রতিহত করার জন্য। কলির প্রভাবের ফল হচ্ছে কলহ, যা ঈর্ষা ও ক্রোধ থেকে উৎপন্ন হয়। তাই কলির আরেকটি নাম হচ্ছে মূর্তিমান কলহ।
“করালবদন ক্রুরঃ কলিশ্চ কলহ।” কলিকে অত্যন্ত বীভৎস দর্শন, অত্যন্ত দুর্নীতিপরায়ণ ও নৃশংস রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। সে অত্যন্ত অসৎ এবং সর্বদা কলহ উৎপন্ন করছে। কলহ সৃষ্টি করে, কলহের মাধ্যমে সকলকে বিভক্ত করে সে তার প্রভাব বিস্তার করে।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু আমাদের সকলকে ভগবৎ-প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ করে, ঐক্যবদ্ধ করে কলির প্রভাব প্রতিহত করার জন্য অবতরণ করেছিলেন। পারস্পারিক ঈর্ষা বা ঘৃণার থেকে কলহের উৎপত্তি হয়। এখন আমরা কিভাবে ঈর্ষা বা ঘৃণাকে প্রতিরোধ করব? প্রেমের মাধ্যমে। প্রেম কি? সে সম্বন্ধে শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃতে বর্ণনা করা হয়েছে “কৃষ্ণেন্দ্রিয় প্রীতি-ইচ্ছা ধরে ‘প্রেম’ নাম।” পরমেশ্বর ভগবান কৃষ্ণের প্রীতি বা সন্তোষবিধানের চেষ্টাই হচ্ছে প্রেম। তাই সেই ভগবৎ-প্রেমের মাধ্যমে, ভগবানের শরণাগত হওয়ার মাধ্যমে, আমরা আমাদের জীবনে কলির প্রভাবকে প্রতিহত করতে পারব। ঈর্ষা ও ক্রোধ কলহের সৃষ্টি করে। আমরা কিভাবে ঈর্ষা ও ক্রোধকে দমন করব? নম্র ও বিনীত এবং সহ্যশীল হওয়ার মাধ্যমে। যারা ভগবৎ-বিজ্ঞান হৃদয়ঙ্গম করেছেন তাঁরাই যথার্থ নম্র বা বিনীত এবং সহ্যশক্তিসম্পন্ন হন। কখনও কখনও আমরা ক্রুদ্ধ হওয়ার কারণ দেখাই। বিশেষ করে যদি কখনও কেউ আমার ভুলটি কেথায় তা দেখিয়ে দেবার বা তা সংশোধন করানোর চেষ্টা করেন, আমরা তৎক্ষণাৎ রেগে গিয়ে তাকে প্রশ্ন করি “আমার ভুল সংশোধন করার আপনি কে? কিন্তু আমরা যদি রেগে না গিয়ে বিনীতভাবে ভাবি “হয়তো আমিই ভুল ছিলাম, তিনিই ঠিক”, তাহলে আর ঝগড়ার আর কলহের সৃষ্টি হয় না।
আমরা ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠি। কেন আমরা ঈর্ষান্বিত হই? কিভাবে একজন আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ হয়ে উঠছে, তা দেখে আমরা ঈর্ষান্বিত হই। অন্যের উন্নতি করছে, তাদের সবাই প্রশংসা করছে, তারা এত যোগ্য হয়ে উঠছে–এসব দেখে আমরা ঈর্ষান্বিত হই। “কেন আমি নই?” এই ভেবে আমরা যন্ত্রণাকাতর হই। “কেন তারা দেখছে না যে আমিও কতটা শ্রেষ্ঠ?”
ধৈর্য ধরুন। সঠিক সময়ে কৃষ্ণ আপনারও মহিমা কীর্তন করবেন। আজ হোক অথবা কাল। সকলেরই পূর্ণতার সময় বা তুঙ্গী অবস্থা আসবে। আমাদের মুধু বিনম্র ও সহ্যের মনােভাব নিয়ে ভাবতে হবে যে যেহেতু সমস্ত কিছুই কৃষ্ণের ইচ্ছায় পরিচালিত হচ্ছে, তাই সবকিছু ঠিকই আছে। এই ধরনের কৃষ্ণভাবনামৃত থেকে এক অদ্ভুত শক্তি উৎপন্ন হয় যা আমাদের কলির প্রভাব থেকে দূরে রাখে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সেই শিক্ষাই প্রদর্শণ করে গেছেন। মহাভারতেরও সেটিই শিক্ষা।

Comments are closed.

October 2015
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Blog Stats

  • 140,943 hits