বৈদিক হিসাব অনুযায়ী মহাকালের সীমার পরিমাপ করা হয়েছে যুগসমূহের মাধ্যমে। বেদে চারটি যুগের বর্ণনা করা হয়েছে–সত্য যুগ, ত্রেতা যুগ, দ্বাপর যুগ এবং কলি যুগ–আর এই সকল যুগেরা ঋতু আবর্তনের মতো বারবার আবর্তিত হতে থাকে। সত্য যুগের সময়সীমা ১৭,২৮,০০০ বৎসর, ত্রেতা যুগের সময়সীমা ১২,৯৬,০০০ বৎসর, দ্বাপর যুগের সময়সীমা ৮,৬৪,০০০ বৎসর এবং কলিযুগের সময়সীমা ৪,৩২,০০০ বৎসর।
সত্যযুগের মানুষেরা অত্যন্ত পুণ্যবান বা পবিত্র। তারা কখনও কোন পাপকর্ম করেন না বলা চলে। ত্রেতা যুগের মানুষদের মধ্যে পাপময় জীবনের প্রতি আগ্রহ দেখা দেয় এবং দ্বাপর যুগে তারা আরও বেশী পাপপ্রবণ হয়ে পড়ে। অবশেষে কলি যুগে ভগবৎ-ভক্তিহীনতা প্রায় সম্পূর্ণরূপে আধিপত্য বিস্তার করে। যুগ সমূহকে ঋতুদের সঙ্গে তুলনা করলে এই কলিযুগটি হচ্ছে শীতকালের মতো।
বৈদিক শাস্ত্রে যুগ চতুষ্টয়ের প্রত্যেকটির জন্য নির্দিষ্ট ধরনের ধর্মীয় পন্থা নির্দেশ করা হয়েছে। সত্য যুগের পন্থাটি হচ্ছে ভগবানের রূপে ধ্যান, ত্রেতা যুগের পন্থাটি হল ভগবানের উদ্দেশ্যে যজ্ঞ নিবেদন, দ্বাপর যুগের পন্থাটি হল মন্দিরে ভগবানের শ্রীবিগ্রহের অর্চনা এবং কলিযুগের পন্থাটি হচ্ছে ভগবানের পবিত্র নামের কীর্তন। ভগবান এতই করুণাময় যে, যেহেতু পাপময় জীবন ক্রমবর্দ্ধিত হওয়ার প্রতিটি যুগেই মানুষের গুণ ক্রমহ্রাসমান, তাই তিনি প্রতিটি পরবর্তী যুগ-পন্থাকে ক্রমসহজতর করেছেন।
এখন এই কলিযুগটি হচ্ছে চারটি যুগের মধ্যে সবচেয়ে অধিঃপতিত যুগ। আমাদের জীবনেই আমরা দেখতে পাচ্ছি মানুষ দিনকে দিন কিভাবে আরও পাপকর্মে রত হয়ে পড়ছে। মাংসাহার, জুয়া, মাদকদ্রব গ্রহণ এবং অবৈধ স্ত্রীসঙ্গ–পাপের এই চারটি স্তম্ভই, চতুর্দিকে ক্রমাগত বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হচ্ছে। আমরা দেখতে পারছি যে এই সমস্ত কার্যকলাপগুলি যত বৃদ্ধি পাচ্ছে এই জগতও ততই দুঃখময় হয়ে উঠছে। আর দুঃখ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য সকল শাস্ত্রই কৃষ্ণের পবিত্র নাম কীর্তনের নির্দেশ প্রদান করেছেন।
শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে যে এই যুগে ভগবানের নাম কীর্তনই একমাত্র কর্তব্য। প্রভু যীশু বলছেন “আমাদের পিতার নাম কীর্তিত হোক।” একইভাবে মহম্মদ বলেছেন “আমাদের একমাত্র আল্লার মহিমাই বর্ণনা করা উচিত।” পৃথিবীর সমস্ত মহান ধর্মে এই নির্দেশ বারবার করে প্রদান করা হয়েছে।
এখন প্রশ্ন উঠে যে, “ভগবানের নামের বিশেষত্বটি কোথায়?” আমাদের শারিরীক পরিচয়ের স্বার্থে প্রদত্ত জড় শব্দ বিশিষ্ট কোন নামের মতো ভগবানের নামটি নয়। এ ধরনের পরিচয়ত্বের ভগবানের কোন প্রয়োজন নেই। তাঁর কোন জড় শারীরিক পরিচয় নেই। কেননা তিনি সম্পূর্ণরূপে চিন্ময়। কিন্তু তাঁর দিব্য অসীম গুণাবলী ও লীলা অনুসারে তাঁর অসংখ্য নাম রয়েছে।
উদাহরণ স্বরূপ বাইবেলে তাঁর যে নাম রয়েছে সেখানে তাঁকে “Almighty” অর্থাৎ পরমেশ্বর এবং “Omnipotent” অর্থাৎ সর্বশক্তিমান রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। তেমনিভাবে সংস্কৃতে, বৈদিক শাস্ত্রসমূহে তাঁর অসংখ্য নাম রয়েছে। কৃষ্ণ নামটির অর্থ হচ্ছে “সর্বাকর্ষক”। রাম শব্দটির অর্থ হচ্ছে “পরম আনন্দ প্রদাতা”।
যেহেতু ভগবানের কোন জড় গুণাবলী নেই তাই তাঁর নামও কোন জড় শব্দ নয়। এটি চিন্ময় এবং তাঁর থেকে অভিন্ন। আর যেহেতু ভগবান হচ্ছেন পরম, তাই তাঁর নামটিও হচ্ছে পরম। যখন কেউ তাঁর নাম কীর্তন করে তখন সে সরাসরিভাবে তাঁর সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করে। আমাদের জড় কলুষময় চেতনার জন্য, আমরা যখন কীর্তন করি তখন তাঁর উপস্থিতি হৃদয়ঙ্গম করতে পারি না।
কিন্তু যেহেতু তিনি হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান, তাই তাঁর নাম গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে প্রার্থনার পন্থাটি হচ্ছে অত্যন্ত নিজজন সুলভ ও গভীর একটি প্রার্থনা। আমরা যদি ঐকান্তিকভাবে ভগবানের নাম জপ বা কীর্তন অনুশীলন করি তবে অচিরেই আমরা তাঁর উপস্থিতি হৃদয়ঙ্গম করতে পারব।
বৈদিক সাহিত্যে ভগবানের উদ্দেশ্যে অনেক মন্ত্র ও প্রার্থনা রয়েছে কিন্তু মহা-মন্ত্র বা পরম প্রার্থনা রয়েছে এই একটিই। সেই মন্ত্র বা প্রার্থনাটি হচ্ছে– হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে/হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে–যা ভগবানের পরম গরিমাময় রূপ সমূহের উদ্দেশ্যে এক সম্বোধন। কৃষ্ণ রূপে ভগবান হচ্ছেন সর্বাকর্ষক ব্যক্তিত্ব এবং রাম রূপে তিনি পরম আনন্দ প্রদাতা। এর অর্থটি হল “হে সর্বাকর্ষক পরমেশ্বর ভগবান, হে পরম ভোক্তা, দয়া করে আমাকে এই জড় অস্তিত্ব থেকে উদ্ধার কর। দায়া করে তোমার প্রেমময়ী ভক্তিতে আমাকে নিযুক্ত কর।”
আমাদের আকাঙ্ক্ষাসমূহ পূর্ণ করার জন্য ভগবানের কাছে আবেদন করার নামই প্রার্থনা। জাগতিক চেতনায় আমরা প্রার্থনা করি, “হে ভগবান, আমাকে খাদ্য দাও, হে ভগবান আমাকে অর্থ দাও।” কিন্তু পারমার্থিক জীবনে কেউ নিজের জন্য এটা সেটা চাওয়ার পরিবর্তে, তার নজরে যা কিছু আছে সে ভগবানকে তা নিবেদন করতে চায়। সে ভগবানের সেবা করতে চায়। আর সেজন্যই হরেকৃষ্ণ মন্ত্রটি হচ্ছে সর্বোত্তম প্রার্থনা। এটি কখনই ভগবানের কাছে স্বার্থযুক্ত দাবী জানায় না। এটি তাঁর ভক্তিপূর্ণ সেবায় নিযুক্তির জন্য তাঁর কাছে এক আবেদন মাত্র।
এই পবিত্র নাম কীর্তনের শিক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্যে কৃষ্ণ এই যুগে এক অদ্ভুত রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। যদিও তিনি হচ্ছেন পরম অধীশ্বর, পরম ভোক্তা, সমস্ত ঐশ্বর্যসমূহের মালিক, কিন্তু এই যুগে তিনি এক ভিক্ষাজীবী সন্ন্যাসী–শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করেছিলেন, সমস্ত ভারতবর্ষ পর্যটন করেছিলেন আর জ্ঞানীব্যক্তি, রাজা, ভিখারী সকলকেই দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে মহা-মন্ত্র কীর্তন করার কথা বলেছিলেন।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যে ভগবান এটি কোন আবেগের বশে কথা বলা নয়। অথবা এমন নয় যে আমি তাঁর অনুগামী বলে আমি এই দাবী করছি। না। শ্রীমদ্ভাগবত, মহাভারত এবং অন্যান্য শাস্ত্রগ্রন্থে তাঁর পরিচয় বর্ণনা করে বিস্তারিতভাবে তাঁর আবির্ভাবের ভবষ্যিদ্বাণী করা হয়েছে। শাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছে যে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অবতরণ যুগধর্ম প্রবতর্নের জন্য। তাঁর প্রকটকালে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন যে ভগবানের নাম কীর্তনের এই সংকীর্তন আন্দোলন একদিন জগৎজুড়ে বিস্তারলাভ করবে। আর আজ সেটি সত্য হয়েছে। সমস্ত সাম্প্রদায়িক ধারণাগুলি এড়িয়ে গিয়ে যদি কেউ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রকৃত পরিচয় অবগত হওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে সে সহজেই হৃদয়ঙ্গম করতে পারবে যে তিনি হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যে ভারতে আবির্ভূত হয়েছিলেন সেটা কোন ব্যাপার নয়। ভগবান কোন ভৌগোলিক অবস্থানে সীমাবদ্ধ নন। তিনি সকলকে তাঁর কৃপা প্রদানের উদ্দেশ্যে অবতরণ করেন। ভগবান যেখানেই আবির্ভূত হোন না কেন ঐকান্তিক ভক্ত ভগবানের অনুগমন করে থাকেন। ভক্তগণ হৃদয়ঙ্গম করেন যে প্রকৃতপক্ষে ভগবান বা তাঁর প্রতিনিধি দিব্য জগৎ থেকে আগমন করেন এবং তাঁরা কোন নির্দিষ্ট ভৌগোলিক ভূখন্ডের সাধারণ জড় ব্যক্তি নন। এই পৃথিবীর যেখানেই এই ধরনের অসাধারণ ব্যক্তিত্ব আবির্ভূত হোন না কোন সেই স্থানটি চিন্ময় জগতের বর্ধিত অংশ হয়ে যায়।
তবুও, পরমেশ্বর ভগবান একজন “ভারতীয়’ বলে তাঁকে স্বীকার করায় যদি কারোর অসুবিধা থাকে, তো ঠিক আছে। আমাদের কথাতে কারুরই তাঁকে অন্ধভাবে স্বীকার করা উচিত নয়। কিন্তু অন্তত পক্ষে একবার তিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জীবন ও শিক্ষা বিষয়ে অধ্যয়ন করতে পারেন এবং দেখতে পারেন যে সেটি তাঁর পারমার্থিক জীবনের জন্য কল্যাণকর কি না। সেটিই হলে একটি বাস্তব পরীক্ষা।
আমরা যদি হৃদয়ঙ্গম করতে পারি যে ভগবানই হচ্ছেন আমাদের আদি ও পরম পিতা তাহলে এটি উপলব্ধি করা মোটেও কঠিন হবে না যে তিনি আমাদের তাঁর কাছে ফিরিয়ে নিতে চান। এমনকি তিনি যে আমাদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন আয়োজন করে রেখেছেন সেটি বুঝতে পারাও কঠিন হবে না। এই অধঃপতিত কলিযুগে যখন আমাদের পারমার্থিক দৃষ্টির সকল স্বচ্ছতাই হারিয়ে গেছে তখন তাঁর পবিত্র নামই হচ্ছে তাঁর কাছে আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার তাঁর কৃপাময় আয়োজন।
ভগবানের পবিত্র নাম জপ বা কীর্তন করার মাধ্যমে ভগবানের রূপ, ধাম, গুণসমূহ, কার্যকলাপ এবং পার্ষদগণকে হৃদয়ঙ্গম করা যায়। পারমার্থিক জ্ঞানে স্থিরতা প্রাপ্ত হয়ে কেউ হৃদয়ঙ্গম করতে পারে যে সমস্তকিছুই হচ্ছে ভগবানের আর তাই সে পূর্ণরূপে তাঁর ভক্তিপূর্ণ সেবায় যুক্ত হয়। সেই উপলব্ধিই হচ্ছে সকল যুগের ধর্মের পূর্ণতা।