শ্রীচৈতন্য মহাপভু যে-শিক্ষাটি আমাদের দিয়েছেন, সেটা সংকীর্ণ কোনও উদ্দেশ্য সাধনের জন্য নয়। সেটি মহাপ্রভু শুধু বাঙালীদের জন্য দিতে আসেননি, মহাপ্রভু কেবল ভারতবাসীদের জন্য আসেননি। মহাপ্রভু কেবল পৃথিবীর মানুষদের জন্যও আসেননি। মহাপ্রভু এসেছিলেন সারা পৃথিবীর–কেবল পৃৃথিবীর নয়–সারা জগতের সমস্ত জীবের জন্য। ‘জীবের নিস্তার লাগি নন্দসূত হরি’–জীবের নিস্তারের জন্য নন্দসূত যে শ্রীকৃষ্ণ, তিনিই গৌরসুন্দর রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন।
মহাপ্রভুর শিক্ষার কথা যখনই বলা হচ্ছে, তখন কোনও জায়গায় আপনি পাবেন না যে, ভারতবাসীদের জন্যই মহাপ্রভু এসেছিলেন, বা বাঙালীদের জন্য এসেছিলেন। পক্ষান্তরে, বারে বারে দেখবেন যে, সমস্ত জীবের কল্যাণের জন্যই মহাপ্রভু এসেছিলেন। কেননা, প্রতিটি জীবই হচ্ছে তাঁর সন্তান, প্রতিটি জীবই ভগবানের সন্তান এবং তাঁর সন্তানদের উদ্ধার করার জন্যই ভগবান অবতীর্ণ হন। সেই জন্য মহাপ্রভুর এই শিক্ষা প্রচারে, মহাপ্রভুর এই শিক্ষাধারায় কোনও রকম সংকীর্ণতা নেই। এটা সারা পৃথিবীর জন্য, সারা জগতের জন্য।
আমরা দেখতে পাই যে, মহাপ্রভুর মধ্যে সমস্ত প্রয়োজনীয় গুণগুলি রয়েছে। যে-গুণগুলির জন্য আমরা বিভিন্ন লোকের পূজা করি, সেই সমস্ত গুণগুলিই মহাপ্রভুর মধ্যে রয়েছে। পক্ষান্তরে, সেগুলি পূর্ণরূপেই রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা মহাপ্রভুকে স্বীকার করি না। মহাপ্রভুকে মানতে গেলেই যেন আমাদের আঁতে ঘা লাগে। আমরা ইউরোপ, আমেরিকা, চীন, জাপান, এমন কি আফ্রিকার নেতাদেরও পূজা করতে রাজি আছি, কিন্তু আমাদের শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আরাধনায় যেন আমাদের আত্মসম্মানে লাগে।
আজকের মানুষের মনোভাব হয়েছে যে, আমাদের প্রগতিশীল হতে হবে। প্রগতিশীল হওয়া মানে কি? ঐ বাইরের সব আবর্জনাগুলো ধার করে আনা, কুড়িয়ে আনা!
আমাদের দেশের বৈদিক দৃষ্টিভঙ্গির বা বৈদিক নীতির কোন রকম সমাদর নেই। কিন্তু ওরা রাশিয়া, চীন, জাপান, জার্মানী, ইতালী–সব জায়গা থেকে এক-একটা মতবাদ নিয়ে আসছে। মার্কস-ইজ্ম্, লেনিন্-ইজম্, হেন্-ইজ্ম্, তেন্-ইজ্ম্–এটাকেই আমরা আমাদের প্রগতি বলে দেখাই। কিন্তু এতে আমাদের কাজ কিছু হচ্ছে না। লোকেরা দুঃখ-দুর্দশা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
কিন্তু আজ যদি আমরা মহাপ্রভুকে গ্রহণ করতাম, তা হলে আমাদের দুঃখ-দুর্দশার তখনি নিবৃত্তি হতো এবং তাঁর যে মতবাদ আমরা গ্রহণ করতাম, সেটা সর্বকালের, সর্বশ্রেষ্ঠ মতবাদ। মহাপ্রভু যে-জিনিসটি দিয়ে গেছেন, সেটি সর্বশ্রেষ্ঠ মতবাদ, সেটা সর্বশ্রেষ্ঠ সাম্যবাদ, সেটি সর্বশ্রেষ্ঠ নীতি, সেটি সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম–সেটি সব কিছুরই শিরোমণি।
এক কথায়, মহাপ্রভু যে-জিনিসটি দিয়ে গেছেন, সেটি সর্বশ্রেষ্ঠ বস্তু। কিন্তু আমরা এতই মূর্খ যে, আমরা সেটা গ্রহণ করতে রাজী নই। তার কারণ–মূর্খ বলছি এই কারণে যে, মহাপ্রভু যে কে, সেটা জানবার কোনও রকম চেষ্টাই আমরা করি না।
মহাপ্রভুর নামে পদযাত্রা আন্দোলন বাংলায় চলছে, কিন্তু বাঙালীদের মধ্যে কতটুকুই বা সাড়া পড়েছে? আপনারা কয়েকজন কেবল আমাদের এই প্রচেষ্টায় সহযোগিতা করছেন; আমরা যেটা বলতে চাই, তার জন্য কিছুটা আগ্রহ প্রকাশ করছেন। কিন্তু অধিকাংশ লোকই সেটা মানতে চাইছে না। সুতরাং তার ফলে আমাদের কষ্ট বাড়ছে, দুঃখ-দুর্দশা বাড়ছে, পৃথিবীর মানুষের দুঃখ-দুর্দশা বেড়ে যাচ্ছে।
বিশেষ করে একটা জিনিস বিচার করে দেখুন–আমরা সকলেই আনন্দ চাই। প্রতিটি জীব, সে ধনী হোক, গরিব হোক, মানুষ হোক, পশু হোক, সকলেই কিন্তু আনন্দ চায়। সকলের জীবনে একটি প্রবল সত্য হচ্ছে আনন্দের অনুসন্ধান। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষাতে সেই আনন্দের পথনির্দেশই রয়েছে। তবে সেটি প্রথমে একটু কষ্টসাধ্য, বা বলা যায় প্রথমে বিষময়। কেননা বদভ্যাস ছাড়তে প্রথমে একটু কষ্টই হয়। যার ধরুন নেশা রয়েছে–বড় কিছু নেশার কথায় যাওয়ার দরকার নেই–ধরুন, যার সিগারেট খাওয়ার নেশা রয়েছে, তার পক্ষে সিগারেট-খাওয়াটা ছাড়া খুব কঠিন, কষ্টকর। কিন্তু যখন সে ছেড়ে দেয়, তখন সে ভাল অনুভব করে। সুতরাং প্রথমে তা বিষময় মনে হলেও, পরিণামে তা অমৃত।
তো এইভাবে আমাদের এই যে জীবন, তাতে কষ্টের কি আছে? যখন প্রকৃতপক্ষে কেউ বলে যে, আপনাদের এই যে, জীবন, আহা, না জানি আপনারা কত কষ্ট ভোগ করেন, তখন আমরা বলতে বাধ্য হই যে, আসলে কি জানেন তো, আমরা খুব আনন্দ উপভোগ করি। আমাদের জীবনে কোনই কষ্ট নেই। যেটি রয়েছে, সেটি হচ্ছে নিত্য আনন্দ।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেটা আপনারা বুঝতে পারবেন না। কিন্তু আপনার যদি এসে কিছু দিন আমাদের সঙ্গে থাকেন, আমাদের এই জীবন যদি আপনারা অবলম্বন করেন, লোক দেখানোর জন্য নয়, আন্তরিকভাবে যদি আপনারা গ্রহণ করেন, তা হলে আপনারাও সেই আনন্দের স্বাদ পাবেন।
আর সেটা করতে হলে যে সব কিছু ছেড়ে দিতে হবে, তা নয়। পক্ষান্তরে, চারটি খারাপ কাজ ছেড়ে দিতে হবে। আর বাকি যা কিছু পাবেন, তা সবই আনন্দ এবং তার সুফলও হচ্ছে। আজকে ধরুন, আমাদের এই কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের প্রচারের জন্য বহু পরিবার আজ নিরামিষাশী হয়ে গেছে। যারা, ধরুন, বছর খানেক আগে পর্যন্ত ভাবতে পারেনি বা বছর দুয়েক আগে পর্যন্ত ভাবতে পারেনি, যে, তারা মাছ মাংস খাওয়া ছেড়ে দিতে পারে।
আমি কিছুদিন আগে চন্ডীগড়ে ছিলাম–সাত দিন ওখানে ছিলাম। এই সাতদিনে প্রায় ১৫টি পরিবার মাছ মাংস খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। ওদের অবশ্য আগে থেকেই সংস্কার ছিল, আগে থেকেই খেত না। কিন্তু ইদানিং তথাকথিত আধুনিক অসভ্যতার প্রভাবে, তারা মাছ-মাংস খাওয়া ধরেছিল। কিন্তু ওদের বোঝানো মাত্রই তারা ছেড়ে দিয়েছে। কেউ কেউ পেঁয়াজ রসুন খেত, নিরামিষাশী ছিল বাড়িতে কিন্তু পেঁয়াজ রসুন খেত। তারাও পেঁয়াজ রসুন খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।
এখন পাঞ্জাবীদের পক্ষে এটা ছাড়াটা খুব একটা কঠিন নয়, কিন্তু বাঙালীদের পক্ষে ছাড়াটা খুবই কঠিন। কেননা বাঙালীরা অন্নপ্রাশনের সময় থেকেই মাছ খাওয়া শুরু করে। এত দিন ধরে, এত গভীর যে সংস্কার বা কুসংস্কার, সেটাকে সংশোধন করা সহজ নয়। কিন্তু তারাও করছে, তারাও ছেড়ে দিচ্ছে।
এখানে অনেকে আছেন, যাঁরা ছেড়ে দিয়েছেন। এটা কেন হচ্ছে? এর কারণ হচ্ছে, তাঁরা নিজেরাই অনুভব করছেন যে, হ্যাঁ, সত্যিই জিনিসটা তো আমাদের ভাল দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এখন দেখুন, ভাল হতে সবাই চায়। যে-লোকটা মানুষ খুন করছে, সে-ও মনে করছে, আমি এটা ভালোর জন্যই করছি।
দস্যু রত্নাকর, সে দস্যুবৃত্তি করতো। নারদ মুনি এসে যখন তাকে বললেন যে, জানো, তুমি কি করছো? এর জন্য তোমার কত পাপ হচ্ছে? উত্তরে রত্নাকর বলল, পাপ কেন হবে? এটা তো আমি ভালোর জন্যে করছি। আমি তো খুব ভালো কাজ করছি। ভাল কাজটি কি? না, আমি আমার পরিবার প্রতিপালনের জন্য করছি।
তখন, নারদ মুনি বললেন, ঠিক আছে। পরিবার প্রতিপালনের জন্য যে করছো, কিন্তু পাপের ভাগী কি তোমার পরিবার পরিজনেরা হবে?
দস্যু রত্মাকর বলল, কেন হবে না? ওদের জন্যে আমি যখন করছি, তখন ওরা নিশ্চয় ভাগী হবে।
–তো ঠিক আছে, তুমি গিয়ে ওদের জিগেস করে এসো।
রত্নাকর যখন গেল, তখন কেউই সম্মত হলো না পাপের ভাগী হতে।
এখন, রত্নাকর যেমন মনে করেছিল যে, সে দস্যুবৃত্তি করে সকলের ভালো করছে, ভালো কাজ করছে–এখনও তেমনি গুন্ডা বদমাশেরা মনে করছে–আমরা তো ভালো কাজই করছি। রাজনৈতিক খুন আজকাল দৈনিক খবরের কাগজ খুললেই দেখা যায়। এখন যারা খুন করছে, তারা কিন্তু মনে করছে–আমি দেশের জন্যই করছি, আমি সকলের ভালোর জন্যই করছি।
এইভাবে প্রতিটি লোকই যা করছে, সে মনে করে সে ভালোর জন্য করছে। কিন্তু যতক্ষণ না সে প্রকৃত ধর্মপথে অবস্থিত হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে কখনও ভালো কাজ করতে পারে না। যে ভগবানের ভক্ত নয়, সে ভালো কাজ করবে কি করে? তার সৎগুণ আসবে কোথা থেকে? অসৎ পথে যে চলেছে, তার মধ্যে সৎ গুণাবলী আসবে কোথা থেকে?