গুরু নানক শিখ ধর্মের প্রবর্তন করে।
তিনি এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
ব্রাহ্মণের পুত্র হিসাবে তাঁর পিতা তাঁকে পৈতা ধারণের জন্য এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। সকল কিছুর ব্যবস্থা শেষে তাঁকে যাজকের নিকট আনা হলো।
যাজক- প্রিয় বাছা, এখানে বসো….. আমি তোমাকে পৈতা দান করব।
বালক নানক- কিন্তু কেন?
যাজক- কারণ হলো তুমি একজন ব্রাহ্মণ।
বালক নানক- কিন্তু আমি এমন পৈতাধারী ব্রাহ্মণ হতে চাই না।
ব্রাহ্মণ- কি? এই বালক তো পাগল হয়ে গেছে! তুমি এসব কি বলছ?
বালক নানক- আমি এটি কিভাবে বলতে পারছি তার কারণ হলো আমি একজন ব্রাহ্মণ। তাঁর পিতা-মাতা আশ্চর্যান্বিত হলেন।
পিতা- কি? তুমি ব্রাহ্মণ হবে না? তুমি পৈতাও পরতে চাও না, কাশিতে যাবে না আর গঙ্গাজল পানের মাধ্যমে নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে চাও না?
বালক নানক- আমি কোন ব্রাহ্মণ পৈতা পরতে চাই না বরঞ্চ আমি মক্কায় যেতে চাই।
তৎক্ষণাৎ যাজক লাফ দিয়ে ওঠে নিজের চারিদিকে জল ছিটিয়ে দিলেন।
যাজক- হায়! হায়! এসব কি দেখছি আমি? এতো দেখি এক শয়তান ছেলে। একজন ব্রাহ্মণ বালক হয়ে বলে কিনা মক্কায় যাবে।
যাজক নিজেকে পরিশুদ্ধ করে জোরে হাঁটা শুরু করলেন।
যাজক যে দরজা দিয়ে বের হয়ে গেলেন বালক নানক তার বিপরীত দরজা দিয়ে বের হয়ে গেলেন।
বাবা- হে আমার প্রিয় বালক তুমি কোথায় যাচ্ছ?
বালক- বালখ পেছনে ফিরে বলল, আমি মক্কা যাচ্ছি।
মক্কায় যেতে তার বেশ কিছু দিন চলে গেল। যখন তিনি মক্কায় পৌছালেন তখন কালো পর্দায় ঢাকা কাবা ঘরের নিকট পৌছালেন।
ততক্ষণ সন্ধ্যা নেমে এসেছে এবং তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে তার পা কে কাবা ঘরের দিকে রেখে শুয়ে পড়লেন এবং এক সময় ঘুমিয়ে গেলেন। এই অবস্থা কিছু মোল্লার চোখে পড়ল।
এক মোল্লা তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলে বলল এই তুমি আল্লাহ্র দিকে পা দিয়ে ঘুমিয়ে আছ কেন?
নানক- তুমি আমাকে এমন কোন দিক দেখাতে পার যে দিকে আল্লাহ নেই আর আমি পা সেদিকে দিয়ে শুতে পারি।
মোল্লারা এত বিভ্রান্তকর এক অবস্থায় পতিত হল।
নানক- আল্লাহ্ যদি সব দিকেই থাকে তবে আমি কোন দিকে পা দিব।
মোল্লারা এতে অধিক রাগান্বিত হল, তারা তাকে বলল….
তুমি এই শহর থেকে এখনই বিদায় হও, বের হয়ে যাও।
সে মক্কা ত্যাগ করল।
মক্কা থেকে তিনি বাগদাদ গেলেন এবং এভাবে ঘুরতে ঘুরতে হরিদ্বারে এসে পৌছলেন। এই সময়ে তিনি মধ্য বয়সী হয়ে পড়লেন। হরিদ্বারে এসে দেখলেন যে, কিছু ব্রাহ্মণ পূর্বমুখী হয়ে সূর্যদেবকে জল দ্বারা তর্পন করছেন। তখন ছিল ভোর বেলা, এটি দেখে নানক ভাবলেন আমি ব্যতিক্রম কিছু করব। আর চিন্তা অনুযায়ী সে পশ্চিমে ঘুরে দাঁড়িয়ে জল দ্বারা তর্পন করতে শুরু করল। ব্রাহ্মণগুলো এটি কিছুক্ষণের জন্য সহ্য করলেন। ব্যাপারটা কিছুক্ষণ পর হাস্যকর হয়ে দাঁড়াল। প্রত্যেকে পূর্বদিকে জল তর্পন করছে আর এই ব্যক্তিটি কি না পশ্চিম দিকে তর্পন করছে। অবশেষে তারা লোকটি কে জিজ্ঞাসা করলেন।
ব্রাহ্মণ- তুমি এসব কি করছ।
সে ঘুরিয়ে জবাব দিল…..
নানক- তোমরা কি করছিলে?
ব্রাহ্মণ- আমরা সূর্যদেবকে তর্পন করছিলাম।
নানক- ওহ আচ্ছা, আমার পাঞ্জাবে কিছু জমি ছিল আর আমি সেখানে জল দিচ্ছিলাম।
ব্রাহ্মণ- এই ফকির, তুমি কি পাগল হয়ে গেছ? তুমি এই হরিদ্বার থেকে পাঞ্জাবের জমিতে জল দিচ্ছো?
নানক- কিন্তু এ সূর্য তো অনেক দূরে। আর তোমরা যদি এখান থেকে সূর্যকে জল দান করতে পার তাহলে আমি পাঞ্জাবের মাঠে জল দান করতে পারব না কেন? পাঞ্জাব তো সূর্যের তুলনায় অনেক অনেক নিকটে।
ব্রাহ্মণরা এ বিষয়ে আর কোন তর্ক করল না। তারা ঐ স্থান তাড়াতাড়ি পরিত্যাগ করল। ওখানে আসা অনেক যুবক ছেলে নানকের সঙ্গে যোগ দিল। তারা বলর আমরাও পাঞ্জাবে জল দিতে চাই। তারাও কাজটির পুনরাবৃত্তি করল।
সে একটি ভাল কাজ করেছিল, সে জগন্নাথপুরীতে গিয়ে মহাভাগবত স্বরূপ দামোদার গোস্বামীর সাথে দেখা করেছিল। তুমি পরম সত্যের অনুসন্ধান করছ এবং তুমি নিজের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছো যে পরম সত্য নিরাকার না সবিশেষ। আর তাই আমি তোমাকে দেখাব যে পরম তত্ত্ব পূর্ণ রূপেই সাকার। তুমি এই সিংহ দরজায় গিয়ে অপেক্ষা কর তিনি এই দরজা দিয়েই আসবেন।
নানক- তুমি এসব কি বলছ, পরমতত্ত্ব আবার হাঁটতে পারে নাকি?
স্বামীজি- হ্যাঁ, আমি সত্যই বলছি, তুমি বলছিলে পরম সত্য সাকার না নিরাকার? আমি তোমাকে দেখাব যে পরম সত্য সাকার এবং তিনি আর কিছুক্ষণের মধ্যেই এই দিকে দিয়ে হেঁটে আসবেন। আমিও তার সাথে থাকব। এবং তিনি গিয়ে চৈতন্য মহাপ্রভুকে নিয়ে এলেন। চৈতন্য মহাপ্রভু হেঁটে আসছিলেন এবং সিংহ দরজার দিকে তাকালেন। তিনি উর্ধ্বমুখে তাকালেন। তাঁর বাহু উর্ধ্বে তুলে ধরলেন আর মহানাম জপ করতে থাকলেন।
মহাপ্রভু- হে প্রাণনাথ, আমার প্রিয় প্রাণস্বামী।
নানক- আমি কখনো ভক্তির এমন স্তর পূর্বে দেখিনি।
মহাপ্রভু যা যা করছিলেন তিনিও তাই করছিলেন। মহাপ্রভু যখন লাফ দিচ্ছিলেন সেও লাফাচ্ছিল, মহাপ্রভু যখন নৃত্য করছিলেন সেও নৃত্য করছিল, মহাপ্রভু যখন মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছিলেন, তিনিও মেঝেতে গড়াগড়ি দিচ্ছিলেন।
কিন্তু তিনি মহাপ্রভুর মতো এত প্রসন্নতা অনুভব করছিলেন না। তিনি মহাপ্রভুর নিকটে বসে জিজ্ঞাসা করলেন- আপনি ভাবনামৃতের কোন কোন স্তরে উন্নীত? এটি একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে কখনই সম্ভব নয়। আমি আমার জীবনে সাধনার অনেক স্তর অতিবাহিত করেছি। কিন্তু আপনার এমন উন্মাদনার স্তর কিভাবে সম্ভব?
মহাপ্রভু- তুমি জগন্নাথের কাছে জিজ্ঞাসা কর। একমাত্র তিনিই এটি ব্যাখ্যা করতে পারেন। আমার পক্ষে এমন ভাবুকতার কোনো ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব নয়, আমি এতে এতই নিমগ্নচিত্ত থাকি যার ফলে তা ব্যাখ্যাতীত। আর তখন নানক জগন্নাথ দেবের নিকট গিয়ে প্রার্থনা করলেন- হে জগন্নাথ, মহাপ্রভুর এমন ভাবাবেগের কারণ কি? দয়া করে তা আমার নিকট প্রকাশ করুন। সেই রাত্রেই স্বপ্নে ভগবান তাকে নির্দেশনা দিলেন তুমি কীর্তনে নিমগ্ন হও। এরই সাথে সে তাঁর অনুসন্ধানের ভ্রমণ সম্পূর্ণ করলেন এবং ফিরে গিয়ে কীর্তনে মনোনিবেশ করলেন।
। হিতোপদেশ।
সমস্ত জীবের জন্য ভগবানের দিব্যনাম কীর্তন হলো গুরুনানকের অন্তিম বার্তা।