এক ব্যক্তি অসৎভাবে বহু অর্থ সংগ্রহ করে ধনবান হয়েছেন। শেষে কিন্তু তিনি গ্যাষ্ট্রিক রোগে আক্রান্ত হন। পেটের যন্ত্রনায় ছট ফট করতে থাকেন। যা খায় সব বমি হয়ে যায়। সংসারের কোন বস্তু তাঁর আর ভাল লাগে না। প্রিয় বস্তুও তার কাছে বিষময়। দিন-রাত তাঁর ঘুম নেই। রাম-হরি নামে পাশের বাড়ীর এক দরিদ্র লোক তাঁর বাড়ীর নিকটে রাস্তায় জুতা মেরামত করে এবং মনের আনন্দে গান করে। ধনী ব্যক্তির নিষেধ সত্ত্বেও রামহরি গান গেয়েই চলে। বিরক্ত হয়ে তিনি নিজেই এসে রামহরিকে বলতে লাগলেন, “ওহে! এত আনন্দ কিসের ? আমি অস্বস্তি¡তে দিন কাটাচ্ছি, আর তুমি আমার পাশে থেকে মহানন্দে গান গাইছ ? তুমি কি ভবিষ্যতের চিন্তা কিছু করনা ? রামহরি বলল-“বাবু ! প্রতিদিন যা ঠাকুরের কৃপায় পাই তাই, পেটপুরে খাই আর গান গাই। তখন ভদ্র-লোক বললেন-“তোমার নাম কে রেখেছে ?” রামহরি বলল-“আমার মা রাম-ভক্ত, বাবা হরি-ভক্ত। তাই মা রেখেছেন ‘রাম’ ও বাবা রেখেছেন ‘হরি’ তাই আমার নাম রামহরি। ভদ্রলোক চিন্তা করলেন- কোন প্রকারে এর গান বন্ধ করা যায়। বললেন-“ওহে রামহরি ! তোমার ভবিষ্যতের জন্য আমি তোমাকে দুই হাজার টাকা দিলাম।” রামহরি বলল- হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ! এই বিপদের সম্মুখে আমায় ফেলে দেবেন না বাবু। আমি আপনার পায়ে ধরি বাবু। ভদ্রলোক বললেন- বোকা কোথাকার। মানুষ টাকা টাকা করে করে পাগল, আজ টাকা তোমার ঘরে এসেছে তুমি তা ত্যাগ করছ কি প্রকারে ? এটা তোমার পাগলাগি। সুতরাং তোমার ভবিষ্যতের জন্য এ টাকা তুমি গ্রহণ কর। অসন্তুষ্ট হয়ো না এ টাকা পুনরায় আমাকে দিতে হবে না। আমি তোমাকে দিয়ে দিলাম। গোপনে যত্ন করে রাখবে।”
এখন রামহরি বিরাট বিপদের সম্মুখীন। সে টাকার থলে নিয়ে কোথায় রাখবে, এই নিয়েই ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। তার গান গাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। টাকার থলের কথা কাউকেও বলে না। একদিন টাকাগুলো একটি কৌটায় করে উঠানের মাঝে পুতে রাখল। দিনরাত খাওয়া ঘুম বন্ধ করে সেই টাকা পাহারা দেয়। রাতেও আলো নিয়ে মাঝে মাঝে উঠানের মাঝে বসে থাকে। তার স্ত্রী-পুত্র ভাবল রামহরি বোধহয় পাগল হয়ে গেছে। আবার একদিন সেই টাকা তুলে নিয়ে ঘরে রাখল। বাড়ীর কেউ জানে না। রামহরি কাজকর্ম সব ত্যাগ করে বসেছে, সত্যি সে পাগল হয়েছে। একদিন রামহরি উঠানের মাঝে টাকার কৌটা মাটিতে পুঁতে রাখল। কাপড় শুকানোর জন্য একটি বাঁশ পুঁতে দড়ি টানাবে বলে তার ছেলে ঐ জায়গায় খুঁড়তে বসল। রামহরি তৎক্ষণাৎ সেখানে গিয়ে থপ করে বসে পড়ল। বলল,“এটা আমার জায়গা। খুঁড়তে দেবনা।” কেউ তাকে বোঝাতে পারছে না। কি জানি কি ভেবে হঠাৎ একদিন টাকা নিয়ে সেই ভদ্রলোকের কাছে ফেলে দিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগল-“আপনার টাকা আমার খাওয়া-ঘুম-গান-আনন্দ সব কিছুই কেড়ে নিয়েছে। দরকার নেই আপনার টাকার। আপনার টাকা আপনি রাখুন। আমি পূর্বে যেমন করে খেতাম ও গান গাইতাম, সেই আমার কাছে ভাল।” রামহরি পূর্বের ন্যায় মনের আনন্দে গান করতে করতে চলে গেল।
। হিতোপদেশ।
অর্থ অনর্থেল মূল আবার অর্থ পরমার্থ। অধিকার অনুসারে জগতের বস্তু স্বীকার করলে এবং ভগবানের সেবা পরায়ন হলে অর্থ পরমার্থ। আর অর্থ অনধিকারভাবে স্বীকার করলে বিষময় হয়। এবং সেই বিষয় হল বিষয় অর্থাৎ অনর্থ।
শ্রীহরি সেবায় যাহা অনুকূল।
বিষয় বলিয়া ত্যাগে হবে ভুল।।
জগতে প্রত্যেক বস্তু ভগবানের। ভগবানের ভজন করলে, ভগবানের সেবা করলে প্রত্যেক ঋণ থেকে মুক্ত হওয়া যায়। এবং ভজন করলে ভগবানের সেবা লাভ করা যায়। অতএব জগতের কোন বস্তু আমাদের নয়, ভগবানের। যেমন গঙ্গাজলে গঙ্গাপূজা হয়, সেইরূপ ভগবানের বস্তু ভগবানের সেবায় লাগাতে পারলেই, নিজের আত্মকল্যাণ হয়।