এক ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের খুব লম্বা গোঁফ-দাড়ি ছিল। জ্যৈষ্ঠ মাসে সাহেবকে একজন লোক কাঁঠাল দিয়েছিল। সাহেবের আদেশে পাকা কাঁঠালটি আরদালি নিয়ে সাহেবের খাস কামরায় রেখে দিল। অবসর পেয়ে কাউকে না জানিয়ে দরজা বন্ধ করে সাহেব কাঁঠাল খেতে শুরু করল। কাঁঠাল ভেঙে কোয়াগুলি বাদ দিয়ে খোসার উল্টো পিঠে মুখ দিতেই সাহেব মিষ্ট রস পেয়ে আনন্দে ভোঁতাটি চুষতে শুরু করল। এদিকে কাঁঠালের সমস্ত আঠা তার গোঁফে ও দাড়িতে আচ্ছামতো জড়িয়ে গেল। গোঁফ-দাড়ির অবস্থা ভাল নয় দেখে তার আরদালিকে ডেকে ভীষণ তর্জন-গর্জন করতে লাগল, যেন সে-ই সাহেবের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। কিন্তু সে বেচারা তো ভয়েই কাঁদতে শুরু করল। আর বলতে লাগল, “সাহেব, ঐ জিনিস খাওয়ার পদ্ধতি আলাদা। আপনি যা খাচ্ছিলেন, তা ফেলে দিতে হয়। কিন্তু তার মধ্যে যে কুসুম আছে, সেইটি খেতে হয়। এতে আপনার কোনও টি হয়নি। এখন দয়া করে আপনি আমার প্রতি যা ইচ্ছা বিধান করুন।
সাহেব নিজের দোষ বুঝতে পেরে আরদালিকে বলল- “নাপিত ডাকো। সাবধান, যেন কউকে বলোনা। আর নাপিতকেও সাবধান করে দাও, সে যেন কারও কাছে না বলে। কারও কানে না যায়। আরদালি তখন এক নাপিত ডেকে আনল। নাপিত ভাল করে সাহেবের আঠালো গোঁফ-দাড়ি কামিয়ে দিল।
পরদিন গোঁফ-দাড়ি কামানো সাহেবকে এজলাসে দেখে অনেকে পরস্পর মুখের দিকে তাকাতে লাগল। সাহেব বিচারে মন দিয়েছেন। সাক্ষীদের এজাহার হচ্ছে। এমন সময় একজন গোঁফ-দাড়ি কামানো বাঙালী ভট্টাচার্য্য পন্ডিতের সাক্ষ্য দেবার পালা এল। তাঁকে এরূপ দেখেই সাহেব হেসে বলতে লাগলেন, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি সব বুঝেছি। তোমার গোঁফ কাঁঠালে খাইছে।” ম্যাজিস্ট্রেটের হঠাৎ এই কথা মর্ম না বুঝেই ভট্টাচার্য মাশাই তো কেঁদেই ফেললেন। সাহেব সান্ত¦না দিয়ে ভট্টাচার্য্যকে বলতে লাগলেন, “উহাটে কি দোষ আছে? আপনি কি কাঁঠাল খাইচে দাড়ি গোঁফ কামাইচে। আপনি খবরদার কভি কাঠাল খাইবে না কাঠাল খাইতে অত্যন্ত কষ্ট।”
সেই কথা শুনে ভট্টাচার্য মশাই ভারি বিপাকে পড়লেন। তিনি বেচারা মোটেই কাঁঠাল খাননি। শ্বশুরবাড়ী যাবার জন্য গোঁফ-দাড়ি কামিয়েছেন। সাহেব তাঁকে নিজের মতো ভুক্তভোগী মনে করেছেন। যাই হোক, সাহেব ভট্টাচার্যকে দেখে খুশি হয়ে পাঁচ টাকা বকশিস দিয়ে বিদায় দিলেন। ভট্টাচার্য মশায় হাসবেন কি কাঁদবেন কিছু ভেবে না পেয়ে পাঁচ টাকা নিয়ে অব্যাহতি পেলেন।
। হিতোপদেশ।
জগতে বহু মানুষ আছে যারা নিজেদের দোষগুলি অপরের মধ্যেও আছে বলে মনে করে। নিজেরা যদি ত্রুটিপূর্ণ ও অসৎ হয়, তবে অন্য সাধুব্যক্তি বা সাধারণ নিরীহ ব্যক্তির মধ্যেও অসৎ দোষগুলি খুঁজে বেড়ায়। সারা জগৎটাকে তারা নিজের মতোই মন্দ বলে মনে করে। যারা নিজেরা সংযত জীবনযাপনে অক্ষম, তারা মনে করে সকলেই বুঝি তাদের মতো অক্ষম। উক্ত সাহেবের মতো বোকা লোকরা অন্যদেরও নিজেদের মতো বোকা বলে সাব্যস্ত করে বসে।