যে দিব্য সম্পর্কের স্বাদ
আমরা সকলেই পেতে পারি
বেদশাস্ত্র কহে- ‘সম্বন্ধ’, ‘অভিধেয়’, ‘প্রয়োজন’
‘কৃষ্ণ’ প্রাপ্য সম্বন্ধ, ‘ভক্তি’ প্রাপ্যের সাধন ॥
(চৈঃ চঃ মধ্য ২০/১২৪)
সমস্ত বৈদিক শাস্ত্রে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে জীবের নিত্য সম্বন্ধের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, জীব কিভাবে সেই সম্পর্কের পুনঃ প্রতিষ্ঠা করে ভগবানের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। ভগবানের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হয়ে ভগবানের দিব্য ধামে ফিরে গিয়ে তাঁর নিত্যসেবায় যুক্ত হওয়াই জীবনের পরম উদ্দেশ্য।
বৈদিক শাস্ত্র মনুষ্যকৃত নয়, তা শ্রৌত-পরম্পরার ধারায় নেমে এসেছে। অর্থাৎ নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে শ্রবণ করার ফলে আমরা এই জ্ঞান প্রাপ্ত হয়েছি। আমরা যেমন আমাদের পিতৃপরিচয় শ্রবণ করার মাধ্যমে পেয়ে থাকি, বৈদিক জ্ঞানও আমরা তেমনই নির্ভরযোগ্য সূত্রে শ্রবণ করার মাধ্যমে পেয়ে থাকি। একটি শিশুর জন্ম হয়, এবং সেই শিশুটি যখন তার বড় ভাই-বোনদের কোন একজন পুরুষকে পিতা বলে সম্বোধন করতে শোনে, তখন সেও তাকে পিতা বলে ডাকতে শুরু করে। সেই সম্বন্ধে গবেষনা করার কোন প্রশ্নই উঠতে পারে না। কেবল শ্রবণ করার মাধ্যমে এই শিক্ষা লাভ করতে হয়। যেহেতু অন্যরা সকলে পিতা বলে সম্বোধন করছে, সুতরাং সে-ও পিতা বলে সম্বোধন করতে শুরু করে। সেই সম্বন্ধে কোন প্রমাণ বা গবেষণার করার কোন প্রয়োজনীয়তা নেই।
তেমনই শ্রৌত-পরম্পরায় বৈদিক জ্ঞান নেমে এসেছে। পাঁচ হাজার বছর আগে গ্রন্থাগারে বৈদিক জ্ঞান প্রাপ্ত হওয়ার কোন প্রয়োজনীয়তা ছিল না। কারণ গুরুদেব এই জ্ঞান শোনাতেন এবং শিষ্য তা শুনতেন। তারপর শিষ্য আবার সেই জ্ঞান তাঁর শিষ্যদের শোনাতেন এবং এইভাবে গুরু-শিষ্য পরম্পরার ধারায় এই জ্ঞান প্রবাহিত হত। কিন্তু আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে যখন কলিযুগের শুরু হয়, তখন সমস্ত বৈদিক জ্ঞান গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ হয়।
পূর্বে কেবল একটি বেদ- অথর্ব বেদ ছিল। কিন্ত তা সরল এবং বোধগম্য করবার জন্য শ্রীল ব্যাসদেব সেই একটি বেদকে চারভাগে ভাগ করলেন এবং তাঁর চারজন শিষ্যের উপর সেই চার বেদের দায়িত্বভার অর্পণ করলেন। তারপর তিনি মহাভারত এবং পুরাণ প্রণয়ন করলেন যাতে জনসাধারণের কাছে এই বৈদিক জ্ঞান আরো স্পষ্টভাবে বোধগম্য হয়। কিন্তু তার মূলভাবে একই ছিল- ‘বেদশাস্ত্র কহে- সম্বন্ধ’। সম্বন্ধ- ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে যে নিত্য সম্বন্ধের কথা আমরা ভুলে গেছি, সেই সম্বন্ধের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে।
সেই সম্বন্ধটা কি ? সেই সম্পর্কে বেদান্ত-সূত্রে বলা হচ্ছে জন্মাদ্যস্য যতঃ- সেই সম্বন্ধটি হচ্ছে প্রতিটি জীব, অর্থাৎ আমরা সকলে ভগবানের শক্তি হতে সৃষ্টি হয়েছি। তাই আমরা ভগবানকে পিতা বলে সম্বোধন করে থাকি। সব কটি ধর্মে এই সত্য স্বীকৃত হয়েছে। সেই সম্বন্ধে কোন মতভেদ নেই। সুতরাং পিতার সঙ্গে পুত্রের কি সম্বন্ধ ? সেই সম্বন্ধ প্রতিষ্ঠার ভার কি শুধু পিতারই ? না- সেই বিষয়ে পুত্রেরও কর্তব্য আছে। পুত্র যদি বুদ্ধিমান এবং উপযুক্ত হয়, তা হলে সে বুঝতে পারবে, “পিতাকে ভালবাসা আমার কর্তব্য। পিতাকে ভালবাসা খুবই সহজ ব্যাপার। আমার পিতা আমার জন্য এত কিছু করেছেন- আমি আমার পিতার উপার্জন উপভোগ করছি এবং ভবিষ্যতে আমি আমার পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হব। সুতরাং, তাঁকে ভালবাসা, তার প্রতি শ্রদ্ধাপরায়ণ হওয়াটা আমার কর্তব্য।”
তাই, যারা ভগবদ্বিদ্বেষী, যারা ভগবদ্বিমুখ, তারা হচ্ছে সব চাইতে নিকৃষ্ট শ্রেণীর জীব। ন মাং দুস্কৃতিনো মুঢ়াঃ প্রপদ্যন্তে নরাধমাঃ। যে ভগবানকে মানতে চায় না- সে নরাধম, সব চাইতে অধঃপতিত। সে মূঢ়- নির্বোধ, দুস্কৃতিনো- দুস্কৃতকারী এবং নরাধমাঃ- নরকুলে সব চাইতে অধঃপতিত।
ভগবন্মুখী হওয়াটাই মানুষের ধর্ম। সেটাই হচ্ছে যথার্থ মনুষ্য-জীবন। পশুরা বুঝতে পারে না যে, ভগবান আছেন এবং তিনিই সব কিছুর উৎস। পশুরা বৈদিক-শাস্ত্র অধ্যয়ন করতে পারে না, তারা কোন উপদেশ গ্রহণ করতে পারে না। এই সমস্ত বৈদিক-শাস্ত্র মানুষের জন্য, মানুষের মঙ্গল বিধানের জন্য। তাই তথাকথিত যে মানুষ বৈদিক শাস্ত্রের নির্দেশ গ্রহণ করতে চায় না, যে মানুষ ভগবানের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না, সে একটি পশু ছাড়া আর কিছুই নয়। সেই রকম মানুষ এবং পশুর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে যে, চারটি পায়ের পরিবর্তে তার দুটি পা আছে। ভগবদগীতায় যথাযথভাবেই তাদের নরাধম বা মানুষদের মধ্যে সব চাইতে অধঃপতিত বলে বর্ণনা করা হয়েছে। আমাদের আধুনিক সভ্যতা এই সমস্ত নরাধমদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। যদিও আমরা নিজেদের প্রগতিশীল বলে প্রচার করছি, কিন্তু এই সভ্যতা পাশবিক সভ্যতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
গতকাল একটি ছেলে এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করল ‘ভগবান কে?’ তার হাবভাব এবং পোশাক দেখে মনে হচ্ছিল যে, সে শিক্ষিত। এখন এই শিক্ষাই দেওয়া হচ্ছে- নরাধম হওয়ার শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। যথার্থ শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে নরশ্রেষ্ঠে পরিণত করা, কিন্তু আধুনিক শিক্ষা মানুষকে নরাধমে পরিণত করছে। আর, কোন শিক্ষার্থীকে যদি নরশ্রেষ্ঠ হওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়, তাহলে তাদের অভিভাবকেরা ক্রুদ্ধ হন- ‘ও স্বামীজী আমার ছেলেকে নরশ্রেষ্ঠ হওয়ার শিক্ষা দিচ্ছে। স্বামীজীর শিক্ষা অত্যন্ত বিপজ্জনক’।
এরকমই হচ্ছে। সদ্গুরু শিক্ষা দিচ্ছেন, “সিগারেট খেও না, নেশা কোর না, অবৈধ স্ত্রী-সঙ্গ কোর না, নির্ভীক হও, ভগবানের ভক্ত হও।” আর তার ফলে স্বামীজীটি ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
কিন্তু কেউ যদি শিক্ষা দেয়, “নেশা কর, এল.এস.ডি খাও, উন্মাদ হও এবং পাগলা-গারদে যাও”, তা হলে সে খুব জনপ্রীয় হবে। এখন কি করা যাবে? অবস্থাটাই এরকম। আমরা নরাধমদের সমাজে এসে পড়েছি- এটিই সবসময় মনে রাখতে হবে।
আমি কেবল আমেরিকার কথা বলছি না, সমস্ত জগতের কথাই বলছি। এমন কি ভারতবর্ষেও, সেখানকার সংস্কৃতি ভগবত্তত্ত্বজ্ঞান লাভের পক্ষে অত্যন্ত অনুকূলে, সেখানেও সমস্ত মূর্খ নেতাগুলি শিক্ষা দিচ্ছে যে, জড় জগৎটাকে ভোগ করাই জীবনের উদ্দেশ্য। এটি হচ্ছে এই যুগের প্রভাব। আপনারা মনে করবেন না যে, আমি কোন বিশেষ দেশ বা সমাজের সমালোচনা করছি। এটি হচ্ছে কলিযুগ- প্রতারণা আর প্রবঞ্চনার যুগ। জগৎ জুড়ে তাই প্রতারণা, প্রবঞ্চনা আর ভন্ডামি চলছে। তাই আমাদের খুব সাবধান হতে হবে।
দৈবী হ্যেষা গুণময়ী মম মায়া দুরত্যয়া।
মায়া বা জড়া প্রকৃতি অত্যন্ত শক্তিশালিনী, আমরা যদি একটু অসাবধান হই, একটু শিথিল হয়ে পড়ি, তা হলে যে কোন মুহূর্তে আমরা ভগবানের সঙ্গে আমাদের সম্বন্ধের কথা ভুলে যেতে পারি। সর্ব কারনের পরম কারন হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণ। কিন্তু কোন কারনবশতঃ আমরা তা ভুলে গেছি। তাই এই সমস্ত শাস্ত্র গ্রন্থ- শ্রীমদ্ভাগবত, ভগবদ্গীতা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, “ তোমার সঙ্গে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সম্পর্ক নিত্য, সনাতন।” ভয়ং দ্বিতীয়াভিনিবেশতঃ স্যাদ্ ঈশাদপেতস্য বিপর্যয়োহস্মৃতি। আমরা বিপরীত অবস্থা গ্রহণ করেছি, তাই আমরা দুঃখ ভোগ করছি। ভগবান কে? বিপর্যয়ো স্মৃতিঃ- আমাদের স্মৃতি বিপর্যন্ত হয়েছে, তাই আমরা দুঃখ ভোগ করছি। কিন্তু মানুষ তা স্বীকার করতে চায় না। “না, আমরা একটা বন্দোবস্ত করে নেব। আমরা নতুন আইন বানাব। আমরা উচ্চশিক্ষা দান করব। আমরা বড় বড় রাজনৈতিক দল বানাব। আমরা ভগবানকে অমান্য করব এবং এইভাবে আমরা সুখী হব। ”এই ভগবদ্বিমুখ সভ্যতার ফলেই কমিউনিস্ট পার্টির উদ্ভব হয়েছে এবং তার ফলে এক ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক অবস্থা দেখা দিয়েছে। কিন্তু যিনি শ্রীকৃষ্ণের আশ্রয় গ্রহণ করেছেন, তিনি কখনই বিপদগ্রস্থ হবেন না, তা সুনিশ্চিত।
বাসুদেবঃ সর্বমিতি স মহাত্মা সুদুর্লভঃ। ভগবানের চরণে আত্মনিবেদন করে, তাঁর সঙ্গে আমাদের নিত্য সম্পর্কে অধিষ্ঠিত হয়ে আমাদের মহাত্মা হতে হবে। সেই আত্ম-নিবেদনের পন্থাই হচ্ছে ভক্তি। এতকাল ধরে আমরা ভগবানের অবাধ্যতা করে এসেছি। এখন আমাদের ভগবানের বাধ্য হতে হবে। সেটিই সব। যখন এই তথাকথিত সভ্য জগতের মানুষেরা ভগবানের বাধ্য হবে, তখনই সমাজে শৃঙ্খলা দেখা দেবে, শান্তির উদয় হবে।
এখন কোন শৃঙ্খলা নেই। কেউই পারমার্থিক কল্যানকর শাস্ত্রের অনুশাসন মানতে চায় না। সকলেই ভগবান হয়ে গেছে। আমরা যা ইচ্ছা তাই করতে পারি। তার অর্থ হচ্ছে সকলেই পশুতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু ভক্তিযোগের অর্থ হচ্ছে শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে জীবনযাপন করা। তার ফলে আপনা থেকে ভগবানের সঙ্গে আমাদের হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হতে পারে। তার ফলে তখন আমরা যথার্থই সুখী হতে পারব। তখন আমরা ভগবৎ-প্রেম অনুভব করতে পারব, জীবনের যথার্থ উদ্দেশ্য খুঁজে পাব।
সুনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করার কি প্রয়োজন? ভগবানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের পুনঃ প্রতিষ্ঠা যদি আমরা না করি, তাহলে ক্ষতি কি? ক্ষতিটা হচ্ছে এই যে, তখন বিশৃঙ্খলা এবং অশান্তি দেখা দেবে। আমরা শান্তি এবং সমৃদ্ধির চেষ্টা করে চলেছি। এই শান্তির ভিত্তি কি? শান্তির ভিত্তি হচ্ছে প্রেম। কেউ কি কাউকে ভাল না বেসে শান্তি পেতে পারে? না। তা কি করে সম্ভব? কিন্তু মানুষ যখন ভগবানকে ভালবাসে, তখন সে সকলকেই ভালবাসে এবং সে যদি ভগবানকে ভাল না বাসে, তা হলে সে কাউকেই ভালবাসতে পারে না। কারণ ভগবানই হচ্ছেন সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু।
যেমন, কোন পরিবারের একটি মেয়ে। তার যখন বিবাহ হয়, তখন সে তার পতির পরিবারভুক্ত হয়। পতি-পত্নীর সম্পর্ক গড়ে ওঠার ফলে মেয়েটি তার পতির ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, সে তার পতির মা-বাবার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়- পরিবারের সকলের সঙ্গেই তৎক্ষনাৎ তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আর সেই সমস্ত সম্পর্কগুলি তার পতিকে কেন্দ্র করেই। পূর্বে সেই কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আগে সেই ছেলেটির মা, বাবা, ভাই, বোন এবং অন্যান্য সমস্ত আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে সেই মেয়েটির কোনই সম্পর্ক ছিল না। সুতরাং সেই কেন্দ্রবিন্দু থাকতেই হবে। আপনি যদি ভগবানকে ভালবাসতে পারেন, তা হলে ভগবানের সম্পর্কে সম্পর্কিত প্রতিটি জীবকেই আপনি ভালবাসতে পারবেন। আপনি প্রতিটি মানুষকে ভালবাসতে পারবেন। আপনি আপনার দেশকে ভালবাসতে পারবেন। আপনি আপনার সমাজকে ভালবাসতে পারবেন। আপনি আপনার বন্ধুকে ভালবাসতে পারবেন-সকলকেই। সেটিই হচ্ছে আসল কথা।
মানুষ কিন্তু অন্যভাবে ভাবছেঃ “আমি কেন শুধু ভগবানকে ভালবাসব ? ভগবানকে ভালবেসে লাভ কি? আমি ভালবাসব আমার পরিবারকে। আমি ভালবাসত আমার দেশকে। আমি ভালবাসব আমার ………..” কিন্তু না, এগুলিকে আপনি ভালবাসতে পারেন না। তা সম্ভব নয়, কারণ আপনি কেন্দ্রবিন্দুটি হারিয়ে ফেলেছেন। সেটিই হচ্ছে আসল কথা। হরাবভক্তস্য কুতো মহদ্ গুণা- জড়জাগতিক দিক বা শিক্ষাগতভাবে মানুষ যতই গুণসম্পন্ন হোক না কেন, সে যদি ভগবদ্ভক্ত না হয়, তা হলে তার কোন সদ্গুণই থাকতে পারে না। কেন? কারণ মনোরথে চড়ে নানা রকম জল্পনা-কল্পনা করতে করতে সে জড়া প্রকৃতির কবলগ্রস্থ হয়ে অধঃপতিত হয়। কিন্তু শ্রীমদ্ভাগবতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, যস্যস্তি ভক্তির্ভগবত্যকিঞ্চনা- মানুষ যখন ভগবদ্ভক্তির পথে অগ্রসর হয়, তখন তার মধ্যে সমস্ত সদ্গুণগুলি আপনা থেকেই বিকশিত হয়।
শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃতে ভক্তের ছাব্বিশটি গুণের উল্লেখ আছে-
১। তিনি সকলের প্রতি কৃপালু।
২। তিনি কারো সঙ্গে শত্রুতা করেন না।
৩। তিনি সত্যবাদী।
৪। তিনি সমদর্শী।
৫। কেউ তার মধ্যে কোন দোষ দেখতে পায় না।
৬। তিনি উদার।
৭। তিনি কোমল।
৮। তিনি সর্বদাই অত্যন্ত পবিত্র।
৯। তিনি নিষ্কঞ্চন।
১০। তিনি সকলের মঙ্গলসাধন করেন।
১১। তিনি অত্যন্ত শান্ত।
১২। তিনি সর্বদাই শ্রীকৃষ্ণের শরণাগত।
১৩। তাঁর কোন জাগতিক বাসনা নেই।
১৪। তিনি অত্যন্ত নম্র।
১৫। তিনি ধীর।
১৬। তিনি জিতেন্দ্রিয়।
১৭। তিনি প্রয়োজনের অতিরিক্ত আহার করেন না।
১৮। তিনি ভগবানের বহিরঙ্গা শক্তি ‘মায়ার’ দ্বারা প্রভাবিত নন।
১৯। তিনি সকলকে যথাযোগ্য সম্মান দান করেন।
২০। তিনি নিজে কোনরকম মানের আকাঙ্ক্ষা করেন না।
২১। তিনি অত্যন্ত গম্ভীর।
২২। তিনি অত্যন্ত দয়ালু।
২৩। তিনি বন্ধুভাবাপন্ন।
২৪। তিনি কবি।
২৫। তিনি দক্ষ।
২৬। তিনি মৌন।
এখন কথা হচ্ছে, কৃষ্ণভক্তির অর্থ কি? তা কি এক-রকমের আবেগ বা গোঁড়ামী ? না, এটি একটি বিজ্ঞান। কেউ যদি সেই নিয়মকানুনগুলি মেনে চলে, তা হলে আপনা থেকেই তার মধ্যে এই সমস্ত সদ্গুণগুলি বিকশিত হবে। এটি আপনারা নিজেরাই দেখতে পারেন, এবং যখন এই সমস্ত গুণগুলির প্রকাশ হয়, তখনই কেবল আপনি যথার্থ দেশপ্রেমিক হতে পারেন, যথার্থ জনসেবক হতে পারেন, তখন আপনি সকলেরই বন্ধু হতে পারেন, ভগবৎ-প্রেমিক হতে পারেন- সব কিছু। সুতরাং সকলেই যদি এই রকম হয়, তা হলে যে অবস্থাটি কত সুন্দর হবে, তা আপনারা সকলেই অনুমান করতে পারেন।
অবশ্য সকলেই যে এই রকম হবে, তা আশা করা যায় না। কিন্তু তবুও যদি সারা পৃথিবীর জনসংখ্যার শতকরা দশজন লোকও কৃষ্ণভক্ত হয়, তা হলে সারা বিশ্বে শান্তি আসবে। কেন? কারণ একশ্চন্দ্র– আকাশে অনেকগুলি চাঁদের দরকার হয় না। অন্ধকার দূর করার জন্য একটি চাঁদই যথেষ্ঠ- বরমেক গুণীহত্রো নির্গুণেন শতেন কিম্। চাণক্য পন্ডিত বলেছেন যে, শত শত নির্গুণ পুত্র থাকার চাইতে একজন গুণী পুত্র থাকা শ্রেয়। আধুনিক সভ্যতা সেই পথেই চলছে- ভগবদ্বিমুখ সভ্যতা। কিন্তু যদি সভ্য সমাজের কিছু সংখ্যক মানুষ কৃষ্ণভাবনাময় হয়, কৃষ্ণভক্ত হয়, তা হলে সারা বিশ্বে শান্তি আসবে। তা না হলে তা সম্ভব নয়। কৃষ্ণভক্তি অবলম্বন করা তাই অত্যন্ত প্রয়োজন।
আজ থেকে প্রায় পাঁচশ বছর আগে যখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু আবির্ভূত হয়েছিলেন, তখন তিনি শিক্ষা দিয়ে গিয়েছিলেনঃ প্রেমা পুমর্থো মহান্– তিনি শিক্ষা দিয়ে গেলেন যে, মানব জীবনের পরম উদ্দেশ্য হচ্ছে ভগবৎ-প্রেম লাভ করা। সেটিই হচ্ছে আসল কথা। তার ফলে জীবন সার্থক হয়। এর থেকে বেশি আর কিছু প্রয়োজন নেই। বৈষ্ণবাচার্য শ্রীনাথ চক্রবর্তী ঠাকুর শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অবতরনের উদ্দেশ্য বর্ণনা করে বলেন-
আরাধ্যো ভগবান ব্রজেশতনয়ঃ
শ্রীকৃষ্ণ, পরমেশ্বর ভগবান হচ্ছেন আরাধ্য। তিনি পরম আরাধ্য। তদ্ধাম বৃন্দাবনম্– এবং শ্রীকৃষ্ণ যেমন আরাধ্য , তেমনই তাঁর লীলাভূমি বৃন্দাবনও আরাধ্য, এবং শ্রীকৃষ্ণের আরাধনার শ্রেষ্ঠ পন্থা কি? রম্যা কাচিদুপাসনা ব্রজবধূবর্গেন যা কল্পিতা- শ্রেষ্ঠ আরাধনা হচ্ছে, পাঁচ হাজার বছর আগে বৃন্দাবনে গোপবালিকারা যেভাবে তাঁর আরাধনা করেছিলেন। তারা সর্বক্ষণ শ্রীকৃষ্ণের চিন্তায় মগ্ন থাকতেন। কৃষ্ণ যখন বৃন্দাবনের বনে গরু চরাতে যেতেন, তখন তাঁরা বাড়িতে বসে সর্বক্ষণ চিন্তা করতেন, “আহা, কৃষ্ণের পদযুগল কত কোমল! বৃন্দাবনের বনে কত পাথরের কুচি, কাঁটা রয়েছে, কিভাবে সে বনে বনে ঘুরছে ? তাঁর নিশ্চয় অত্যন্ত কষ্ট হচ্ছে।” কৃষ্ণ বনে ছিলেন, আর তাঁরা ছিলেন বাড়িতে। কিন্তু তাঁরা শ্রীকৃষ্ণের চিন্তায় মগ্ন ছিলেন- কিভাবে তিনি হাঁটছেন, কিভাবে তাঁর কোমল পদযুগল পাথরের খোঁচা লেগে কষ্ট পাচ্ছে- এইভাবে তাঁরা সর্বক্ষণ শ্রীকৃষ্ণের ভাবনায় মগ্ন থাকতেন।
ব্রজগোপিকারা বৈদান্তিক ছিলেন না, তাঁরা শিক্ষিতাও ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন গোপবালিকা। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের প্রতি তাঁদের ভালবাসা এত গভীর ছিল যে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন, “বৃন্দাবনে গোপ-বালিকাদের চেয়ে মহত্তর আরাধনা আর কেউ করতে পারেনি। ” এখন শ্রীকৃষ্ণকে জানবার উপায় কি ?
শ্রীমদ্ভাগবতম্ প্রমাণমমলম্– শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ করে সব কিছু জানতে পারা যায়। জীবনের পরম সার্থকতা- পূর্ণরূপে কৃষ্ণপ্রেম লাভ করা যায়। সুতরাং সেই গ্রন্থ রয়েছে-শ্রীমদ্ভাগবত, এবং আদর্শ উপাসনা বা আরাধনা রয়েছে- ব্রজবধূদের মতো আরাধনা এবং আরাধ্য বস্তু- শ্রীকৃষ্ণ, এবং জীবনের পরম প্রয়োজন-ভগবৎ প্রেম লাভ করা। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভোর্মতমিদম্– এটিই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষার সার-অংশ।
ধর্মঃ প্রতিটি সভ্য দেশেরই কোন-না কোন ধর্ম রয়েছে। কারণ ধার্মিক না হলে অর্থ বা স্থায়ী শান্তি এবং সমৃদ্ধি লাভের কোন সম্ভাবনা নেই।
ধর্ম, অর্থঃ যদি সব মানুষই ধার্মিক হন, তা হলে তাঁদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হবে, এবং অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি সাধনের উদ্দেশ্য কি? কাম, অর্থাৎ, জীবনের সমস্ত প্রয়োজনীয়তাগুলি সুন্দরভাবে পূর্ণ হবে- ধর্ম, অর্থ, কাম। তারপরে জীবনের পরম লক্ষ কি? মোক্ষ। শান্তিপূর্ণভাবে সমাজে বাস করলে জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার জ্ঞান লাভ করা যায়- ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ।
সুতরাং, সাধারণত এই চতুর্বর্গ হচ্ছে মানব-সমাজের লক্ষ্য। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন, “হ্যাঁ, এগুলি খারাপ নয়। কিন্তু প্রেমা পুমর্থো মহান্– এই সব কিছুই থাকতে পারে, কিন্তু ভগবদ্ প্রেম যদি না থাকে, তা হলে এই সবই নিরর্থক, সম্পূর্ণ নিরর্থক। ” তাই ভগবানকে ভালবাসার চেষ্টা করা উচিত, এবং তা হলেই সব কিছু সর্বাঙ্গসুন্দর হয়ে উঠবে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন যে, ভগবানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক সম্বন্ধে অবগত হয়ে সেই অনুসারে আচরণ করা উচিত। অর্থাৎ, ভক্তিভরে তাঁর সেবা করা উচিত। তা হলেই জীবনের পরম পূর্ণতা প্রাপ্ত হওয়া যাবে- ভগবৎ-প্রেম লাভ করা যাবে, এবং তখনই আমাদের মানব জীবনের উদ্দেশ্য সার্থক হবে।