হে বসুদেব-তনয়, সর্বব্যাপ্ত পরমেশ্বর ভগবান। আমি আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি জানাই।
শ্রীশুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্, আপনার প্রশ্ন যথার্থই মহিমান্বিত, কেননা তা সমস্ত মানুষের পরম হিতকর। এই বিষয়টি সমস্ত শ্রবণীয় বিষয়ের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম এবং আত্মতত্ত্বজ্ঞ মুক্তকুল কর্তৃক অনুমোদিত। হে রাজশ্রেষ্ঠ, আত্মতত্ত্বজ্ঞান আলোচনায় উদাসী, বিষয়াসক্ত গৃহমেধীদের অসংখ্য শ্রবণীয়, কীর্তনীয় এবং স্মরণীয় বিষয়সমূহ আছে। এই প্রকার মাৎসর্যপরায়ণ গৃহমেধীরা নিদ্রামগ্ন হয়ে অথবা রতিক্রিয়ায় তাদের রাত্রি অতিবাহিত করে, এবং আত্মীয়-স্বজনদের প্রতিপালনের জন্য অর্থ উপার্জনের চেষ্টায় দিবাভাগের অপচয় করে। আত্মতত্ত্বজ্ঞানরহিত ব্যক্তিরা দেহ, পুত্র, পত্নী, আদি অনিত্য সৈন্যদের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত হয়ে জীবনের প্রকৃত সমস্যাগুলি সমাধানের কোন চেষ্টা করে না। এই সমস্ত বিষয়ের অনিত্যতা সম্বন্ধে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও তারা তাদের অবশ্যম্ভাবী বিনাশ দর্শন করে না। হে ভারত, সমস্ত দুঃখ-দুর্দশা থেকে যে মুক্ত হওয়ার বাসনা করে তাকে অবশ্যই পরমাত্মা, পরম নিয়ন্তা এবং সমস্ত দুঃখ হরণকারী পরমেশ্বর ভগবানের কথা শ্রবণ, কীর্তন এবং স্মরণ করতে হবে। জড় এবং চেতন সম্বন্ধীয় যথাযথ জ্ঞান লাভের পন্থা বা সাংখ্য জ্ঞান, যোগ অনুশীলন অথবা যথাযথভাবে বর্ণাশ্রম অনুশীলন- এই সবকটি পন্থারই পরম উদ্দেশ্য হচ্ছে অন্তিম সময়ে পরমেশ্বর ভগবানকে স্মরণ করা।”
হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, সব রকম বিধিনিষেধের অতীত সর্বশ্রেষ্ঠ মুনিগণ ভগবানের মহিমা কীর্তন করার মাধ্যমে অপ্রাকৃত আনন্দ আস্বাদন করেন। শ্রীমদ্ভাগবত নাম সমস্ত বৈদিক শাস্ত্রের নির্যাসস্বরূপ এই পুরাণ আমি দ্বাপর যুগের শেষে আমার পিতৃদেব শ্রীল কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসদেবের কাছে অধ্যয়ন করেছি। হে রাজর্ষি! আমি নির্গুণ ব্রহ্মে বিশেষভাবে মগ্ন থাকলেও উত্তমশ্লোক শ্রীভগবানের লীলার দ্বারা আমার চিত্ত আকৃষ্ট হওয়াতে এই আখ্যান অধ্যয়ন করেছি। আমি সেই শ্রীমদ্ভাগবত আপনাকে শোনাব, কেননা আপনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অত্যন্ত নিষ্ঠাপরায়ন ভক্ত। যে ব্যক্তি পূর্ণ মনোযোগ এবং শ্রদ্ধা সহকারে শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবণ করেন, তাঁর শ্রীঘ্রই মুক্তিদাতা ভগবান মুকুন্দে রতি উৎপন্ন হয়।”
“হে রাজন্! মহান আচার্যদের প্রদর্শিত পন্থা অনুসরণ করে নিরন্তর ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা সকলের জন্য সিদ্ধি লাভের নিশ্চিত তথা নির্ভীক মার্গ। এমনকি যাঁরা সমস্ত জড় কামনা-বাসনা থেকে মুক্ত হয়েছেন, যাঁরা সবরকম জড়-জাগতিক সুখভোগের প্রতি আসক্ত, এবং যাঁরা দিব্য জ্ঞান লাভ করার ফলে আত্ম-তৃপ্ত হয়েছেন, তাঁদের সকলের পক্ষেই এইটিই হচ্ছে সিদ্ধিলাভের সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা। বিষয়ভোগে প্রমত্ত অনভিজ্ঞ ব্যক্তি দীর্ঘ জীবনে কি লাভ? তার থেকে বরং পূর্ণ চেতনাসম্পন্ন এক মুহূর্তও শ্রেয়, কেননা তার ফলে পরামার্থ সাধনের অন্বেষণ শুরু হয়। রাজর্ষি খট্বাঙ্গ যখন জানতে পারলেন যে তাঁর আয়ুর আর এক মুহূর্ত মাত্র অবশিষ্ট আছে, তিনি তৎক্ষণাৎ সমস্ত জড়-জাগতিক বিষয় পরিত্যাগ করে শ্রীহরির অভয়পদে শরণাগত হয়েছিলেন।”
“হে কুরুবংশ-প্রদীপ মহারাজ পরীক্ষিৎ! আপনার আয়ুষ্কালের আর মাত্র সাতদিন অবশিষ্ট আছে। অতএব এই সময়ের মধ্যেই আপনার পারলৌকিক উদ্দেশ্য সাধন করুন। জীবনের অন্তিম সময়ে মৃত্যুভয়ে ভীত না হয়ে অনাসক্তিরূপ অস্ত্রের দ্বারা দেহ ও দেহ সম্পর্কিত সমস্ত বন্ধন ছেদন করা উচিত। গৃহ থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে আত্মসংযম অনুশীলন করা মানুষের কর্তব্য। কোন তীর্থস্থানে নিয়মিতভাবে স্নাহ করে তিনি যথাযথভাবে পবিত্র হবেন এবং নির্জন স্থানে আসন রচনা করে তাতে উপবেশন করবেন। এইভাবে উপবেশন করে তিনটি চিন্ময় অক্ষর (অ-উ-ম) দ্বারা রচিত বীজমন্ত্র মনে মনে আবৃত্তি করবেন এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে মনকে বশীভূত করবেন, যাতে কখনও চিন্ময় বীজটির বিস্মরণ না হয়। মন যখন ধীরে ধীরে চিন্ময়ত্ব লাভ করে, তখন ইন্দ্রিয়ের বিষয়সমূহ থেকে তাকে সংবরণ করা হয় এবং বুদ্ধির সাহয্যে ইন্দ্রিয়গুলিকে দমন করা হয়। মন স্বভাবতই বিষয়ের চিন্তায় মগ্ন থাকে, তাই মনকে নিগ্রহ করার সর্বশ্রেষ্ঠ পন্থা হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবানের সেবায় নিযুক্ত হওয়ার মাধ্যমে পূর্ণরূপে দিব্য চেতনায় মগ্ন হওয়া। তারপর শ্রীবিষ্ণুর পূর্ণ শরীরের ধারণা থেকে বিচ্যুত না হয়ে এক একে তার অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ধ্যান করবে। তার ফলে মন ইন্দ্রিয়ের বিষয় থেকে মুক্ত হবে। অন্য কোন কিছুর চিন্তা করবে না। কেননা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীবিষ্ণু হচ্ছেন পরম সত্য, অতএব তাতেই কেবল মন সম্পূর্ণরূপে প্রসন্নতা লাভ করে। মন সর্বদাই রজোগুনের দ্বারা বিক্ষিপ্ত এবং তমোগুণের দ্বারা বিভ্রান্ত হয়। কিন্তু শ্রীবিষ্ণু সম্বন্ধীয় ধারণার দ্বারা মনের এই বিরুদ্ধে প্রবৃত্তিগুলি সংশোধন করা কর্তব্য, কেননা শ্রীবিষ্ণুর ধারণাই রজো ও তমোগুণপ্রসূত সমস্ত মল অপনোদন করতে পারে।”
“হে রাজন্! এই প্রকার স্মরণের দ্বারা এবং সর্বমঙ্গলময় ভগবানের সবিশেষ রূপ দর্শনের অভ্যাস করার ফলে অচিরেই সাক্ষাৎ ভগবানের আশ্রয় লাভ করে তাঁর প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত হওয়া যায়।”
ভাগ্যবান রাজা পরীক্ষিৎ জিজ্ঞাসা করলেন, “হে ব্রাহ্মণ, দয়া করে আমাকে বিস্তারিতভাবে বলুন মনকে কোথায় এবং কিভাবে একাগ্র করতে হবে এবং কিভাবে ধারণা স্থির করতে হবে, যার ফলে মনের সমস্ত কলুষ দূর করা যায়।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী উত্তর দিলেন, “আসন নিয়মাদির দ্বারা জিতাসন, প্রাণায়াম দ্বারা জিতশ্বাস, জিতেন্দ্রিয় ও সঙ্গরহিত হয়ে প্রথমে বুদ্ধিযোগে ভগবানের স্থলরূপে (বিরাট নামক রূপে) মনকে নিযুক্ত করতে হবে। এই বিস্ময়কর জড় জগতের বিরাট রূপ ভগবানেরই স্বরূপ। ভূত, ভবিষ্যৎ এবং বর্তমান কাল সমন্বিত এই সমগ্র বিশ্ব তাতেই প্রকাশিত হচ্ছে। ব্রহ্মান্ডরূপ বিরাট দেহ সপ্ত আবরণের দ্বারা আবৃত। তার মধ্যবর্তী বিরাট পুরুষই ধারণার আশ্রয় স্বরূপ। তত্ত্বজ্ঞ ব্যক্তিরা অধ্যয়ন করেছেন যে পাতাললোক সেই বিরাট পুরুষের পাদমূল, রসাতল তাঁর পদের অগ্র ও পশ্চাৎভাগ, মহাতল তাঁর পদদ্বয়ের গুল্ফ প্রদেশ এবং তল ও অতল লোক তাঁর জঙ্ঘাদ্বয়। সুতল সেই বিশ্বমূর্তি বিরাট পুরুষের জানুদ্বয় এবং বিতল ও অতল তাঁর ঊরুদ্বয়, মহীতল তাঁর জঘন দেশ, নভস্তল বা ভুবলোক তাঁর নাভি সরোবর। স্বর্গলোক তাঁর বক্ষস্থল, মহর্লোকে তাঁর গ্রীবা, জনলোক তাঁর মুখমন্ডল, তপলোক তাঁর ললাট এবং সত্যলোক সেই সহস্র শীর্ষ বিরাট পুরুষের শিরদেশ। ইন্দ্রাদি দেবতারা বিরাট পুরুষের বাহু, দিকসমূহ তার কর্ণ, শব্দ তার কর্ণপুট, অশ্বিনীকুমার দ্বয় সেই পরম পুরুষের দুটি নাসারন্ধ, দীপ্ত অনল তাঁর মুখ। আকাশ তাঁর নেত্রগোলক, সূর্য তার নেত্র, দিন ও রাত্রি তাঁর দুটি নেত্র-পত্র, ব্রহ্মপদ তাঁর ভ্রূ-ভঙ্গি, জলের নিয়ন্ত্রণকর্তা বরুণ তাঁর তালুদেশ এবং রস তাঁর জিহ্বা। কথিত হয় যে বেদসমূহ সেই অনন্ত বিরাট পুরুষের ব্রহ্মরন্ধ্র, মৃত্যুর দেবতা যমরাজ হচ্ছেন তাঁর দংষ্ট্রা, স্নেহকলা হচ্ছে তাঁর দন্তপংক্তি এবং অত্যন্ত আকর্ষণীয় মায়াশক্তি তাঁর হাস্য। অপার সংসার সমুদ্র তাঁর কটাক্ষপাত। লজ্জা তাঁর উপরের ওষ্ঠ, লোভ তাঁর অধর, ধর্ম তাঁর স্তন, অধর্ম তাঁর পৃষ্টদেশ, প্রজাপতি তার শিশ্ন, মিত্রাবরুণ তাঁর অন্ডকোষ দ্বয়, সমুদ্র সকল তাঁর কুক্ষি এবং পর্বত সমূহ তার অস্থিরাজি। হে রাজন! নদীসমূহ সেই বিশ্বতনু বিরাট পুরুষের নাড়ী, বৃক্ষসমূহ তাঁর রোম, অনন্ত বিক্রম বায়ু তাঁর নিঃশ্বাস, কাল তাঁর গমন এবং প্রকৃতির তিনগুণের প্রতিক্রিয়া হচ্ছে তাঁর দিব্য কার্যকলাপ। হে কুরুশ্রেষ্ঠ! জলবাহী মেঘ হচ্ছে তার কেশদাম, সন্ধ্যা তাঁর বসন, জগৎ প্রধান কারণ হচ্ছে তাঁর বুদ্ধি এবং সমস্ত বিকারের আশ্রয়স্বরূপ চন্দ্রমা হচ্ছে তাঁর মন। অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বলেন যে মহতত্ত্ব সেই সর্বব্যাপ্ত বিরাট পুরুষের চেতনা এবং রুদ্রদেব তাঁর অহঙ্কার। অশ্ব, অশ্বতরি, উষ্ট্র, হস্তি প্রভৃতি তাঁর নখ এবং সমস্ত চতুষ্পদ পশু তাঁর কটিদেশ। বিভিন্ন প্রকার পাখীরা তাঁর বিচিত্র শিল্প নৈপুণ্য। মানবজাতির পিতা মনু তাঁর বিচারবুদ্ধির প্রকাশ এবং মানবজাতি তাঁর আবাসস্থল। গন্ধর্ব, বিদ্যাধর, চারণ, অপ্সরা আদি উচ্চতর লোক নিবাসী মানুষেরা তাঁর সঙ্গীতাত্মক স্বরলহরী এবং আসুরিক সৈনিকেরা তাঁর শক্তি। ব্রাহ্মণগণ সেই বিরাট পুরুষের মুখ, ক্ষত্রিয়গণ তাঁর বাহু, বৈশ্যগণ তাঁর ঊরুযুগল, কৃষ্ণবর্ণ শুদ্রগণ তাঁর পদাশ্রিত। সমস্ত পূজনীয় দেবতারাও তাঁর অধস্তন এবং সকলেরই কর্তব্য হচ্ছে উপযুক্ত দ্রব্য-সামগ্রীর দ্বারা যজ্ঞ সম্পাদন করার মাধ্যমে সেই ভগবানের সন্তুষ্টি বিধান করা। এই বিরাট বিগ্রহের যে সমস্ত অবয়ব সংস্থান, সেসব আমি আপনার কাছে বর্ণনা করলাম। মুক্তিকামী ব্যক্তিরা তাঁদের বুদ্ধিযোগে ভগবানের উক্ত স্থুল শরীরে তাঁদের মন একাগ্রী করেন, কেননা এই জড় জগতে তা ছাড়া আর কিছু নেই। মানুষের কর্তব্য পরমেশ্বর ভগবানে মনকে একাগ্র করা, যিনি বিভিন্নরূপে নিজেকে প্রকাশ করেছেন, ঠিক যেমন মানুষ স্বপ্নে হাজার হাজার রূপ সৃষ্টি করে। সেই সর্বানন্দময় পরম সত্যেই কেবল মনকে একাগ্র করা উচিত, তা না হলে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে অধঃপতিত হতে হবে।”
প্রথম অধ্যায়- ভগবদ্-উপলব্ধির প্রথম স্তর
23 Apr 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, দ্বিতীয় স্কন্ধ- জগতের প্রকাশ