দশম অধ্যায়- ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকা যাত্রা

শৌনক মুনি জিজ্ঞাসা করলেন- “তাঁর ন্যায্য উত্তরাধিকার অপহরণকারী এবং নানাপ্রকার অনিষ্ট সাধনকারী শত্রুদিগকে অনুজগণের সহায়তায় বধ করে ধার্মিকাগ্রগণ্য রাজা যুধিষ্ঠির কিভাবে তাঁর রাজ্য শাসন করেছিলেন? অবশ্যই তিনি কুন্ঠাশূণ্য চিত্তে তাঁর রাজ্য ভোগ করতে পারেননি।”
সূত গোস্বামী বললেন- “পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, যিনি সমস্ত জগতের পালনকর্তা, ক্রোধাগ্নিরূপ দাবানলে নিঃশেষিত কুরুবংশকে পুনঃস্থাপিত করে এবং যুধিষ্ঠিরকে তাঁর রাজ্য স্থাপন করে প্রসন্ন চিত্ত হয়েছিলেন। ভীষ্মদেব এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উপদেশ শ্রবণ করে মহারাজ যুধির্ষ্ঠির মোহমুক্ত হয়ে পূর্ণজ্ঞান লাভ করেছিলেন এবং শ্রীকৃষ্ণের আশ্রয়ে তাঁর অনুগামী অনুজগণসহ ইন্দ্রের মতো সসাগরা পৃথিবী পালন করেছিলেন। মহারাজ যুধিষ্ঠিরের রাজত্বকালে মেঘরাজি মানুষের প্রয়োজন মতো যথেষ্ট বারিবর্ষণ করত এবং পৃথিবী মানুষের সমস্ত প্রয়োজনই পর্যাপ্তভাবে পূর্ণ করত। দুগ্ধবতী প্রফুল্লামনা গাভীদের স্ফীত স্তন থেকে ক্ষরিত দুগ্ধে গোচারণভূমি সিক্ত হত। নদী, সাগর, বৃক্ষ ও লতা সমন্বিত পর্বতসমূহ, শস্য, ঔষধি যুধিষ্ঠির মহারাজের রাজ্যে প্রতি ঋতুতে প্রচুর পরিমাণে ফল প্রদান করত। অজাতশ্রতু যুধিষ্ঠিরের রাজত্বকালে কখনো কোন প্রাণীদের আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক এবং আধিদৈবিক ক্লেশ, কোনরকম মনঃকষ্ট, রোগ-যন্ত্রণা এবং শীতোষ্ণদিজনিত কষ্ট ছিল না। পান্ডবদের শোক অপনোদনের জন্য এবং ভগিনী সুভদ্রার প্রীতি কামনায় শ্রীহরি, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কয়েক মাস হস্তিনাপুরে অবস্থান করেছিলেন।”
“পরে পরমেশ্বর ভগবান যাত্রার অনুমতি চাইলেন এবং মহারাজ অনুমতি দিলেন, তখন পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ মহারাজ যুধিষ্ঠিরের চরণে প্রণত হয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন এবং মহারাজ তাঁকে আলিঙ্গনবদ্ধ করলেন। তারপর পরমেশ্বর অন্যান্য সকলেও আলিঙ্গনবদ্ধ হয়ে এবং তাদের অভিবাদ গ্রহণ করে তাঁর রথে আরোহণ করলেন। তখন সুভদ্রা, দ্রৌপদী, কুন্তী, উত্তর, গান্ধারী, ধৃতরাষ্ট্র, যুযুৎসু, কৃপাচার্য, নকুল, সহদেব, ভীমসেন, ধৌম এবং সত্যবতী সকলেই শার্ঙ্গধর পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের বিরহ সহ্য করতে না পেরে শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন। সাধুসঙ্গ প্রভাবে বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা একবার মাত্র ভগবানের মহিমা শ্রবণ করে থাকলেও পরমেশ্বর ভগবানকে উপলব্ধি করার ফলে বিষয়ীর অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করে ভগবানের মহিমা শ্রবণ করা থেকে মুহূর্তের জন্যও নিরস্ত হতে পারেন না; তাহলে পান্ডবেরা, যাঁরা ঘনিষ্ঠভাবে সর্বদা ভগবানের দর্শন, স্পর্শন, আলাপ, শয়ন, অবস্থান ও একত্রে আহার করেছিলেন, কি করে তাঁদের পক্ষে তাঁর বিরহ সহ্য করা সম্ভব ? তাঁদের সকলের হৃদয় স্নেহপাশে আবদ্ধ হয়ে বিগলিত হচ্ছিল। তাঁরা অপলক নেত্রে শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন করছিলেন, এবং হতবুদ্ধি হয়ে ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। দেবকীনন্দন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যখন প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এলেন, তখন অতিশয় উৎকন্ঠা হেতু আত্মীয় রমণীগণের নয়ন অশ্রুপ্লাবিত হয়েছিল; কিন্তু যাত্রার সময় শ্রীকৃষ্ণের যাতে কোন রকম অমঙ্গল না হয়, সেইজন্য তাঁরা বহু কষ্টে তাঁদের বিগলিত অশ্রু সংবরণ করেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ যখন হস্তিনাপুর থেকে বিদায় নিচ্ছেলেন, তখন তাঁকে সম্মান প্রদর্শন করার জন্য বিভিন্ন ধরনের ঢাক-ঢোল, মৃদঙ্গ, নাগড়া, ধুন্ধুরী, আনক, দুন্দুভি এবং নানা রকমের বাঁশি, বীণা, গোমুখ ও ভেরী আদি সমস্ত বাদ্যযন্ত্র এক সাথে বাজতে লাগল। ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন করার বাসনায় কুরুরাজবংশীয় ললনাগণ প্রাসাদ-শীর্ষে আরোহণ করে অনুরাগ ও লজ্জাভরে স্মিতহাস্যযুক্ত নয়নে তাঁকে দর্শন করতে করতে তাঁর উপর পুষ্পবর্ষণ করতে লাগলেন। সেই সময়ে পরমেশ্বর ভগবানের অন্তরঙ্গ সখা মহাযোদ্ধা এবং জিতেন্দ্রিয় অর্জুন প্রিয়তম পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মস্তকে মুক্তামালামন্ডিত ও রত্ননির্মিত দন্ডযুক্ত শ্বেতছত্র ধারণ করলেন। উদ্ধব ও সাত্যকি অতি চমকপ্রদ চামর দ্বারা পরমেশ্বর ভগবানকে ব্যজন করতে লাগলেন, এবং মধুপতিরূপে পরমেশ্বর ভগবান কুসুমাকীর্ণ আসনে উপবিষ্ট হয়ে পথ চলতে চলতে তাঁদের নির্দেশ দিতে লাগলেন। ব্রাহ্মণগণ কর্তৃক উচ্চারিত আশীর্বাদ-ধ্বনি সর্বত্র শোনা যেতে লাগল। ত্রিগুণাতীত পরমানন্দস্বরূপ শ্রীকৃষ্ণের প্রতি এই প্রকার আশীর্বাদ যদিও অনুপযুক্ত, কিন্তু নবরূপে লীলা অভিনয়কারী ভগবানের প্রতি ব্রাহ্মণদের এই আশীর্বাদ উপযুক্তই হয়েছিল। উত্তমশ্লোকের দ্বারা বন্দিত ভগবানের অপ্রাকৃত গুণাবলীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে কুরু-কুলরমণীরা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা আলোচনা করতে লাগলেন। তাঁদের এই আলোচনা বৈদিক মন্ত্রের চেয়েও অর্ধিক আকর্ষণীয় হয়েছিল।”
তাঁরা বলেছিলেন- “ইনিই সেই আদি পুরুষোত্তম ভগবান, যাঁর কথা আমরা স্মরণ করে থাকি। প্রকৃতির গুণসমূহ সৃষ্টি হওয়ার পূর্বে তিনিই কেবলমাত্র বিরাজমান ছিলেন এবং যেহেতু তিনিই পরমেশ্বর ভগবান, তাই কেবলমাত্র তাঁরই মধ্যে নিশাকালে নিদ্রা যাওয়ার মতো সমস্ত জীব শক্তিরহিত হয়ে লীন হয়ে যায়। পরমেশ্বর ভগবান পুনরায় তাঁর বিভিন্ন অংশস্বরূপ জীবদের নাম এবং রূপ প্রদান করার বাসনায়, জড়া প্রকৃতির তত্ত্বাবধানে তাদের ন্যস্ত করেন। তাঁরই শক্তির প্রভাবে, জড়া প্রকৃতি পুনরায় সৃষ্টি করার শক্তি অর্জন করেন। জীবকুলের কর্তব্য-কর্মাদি বিধান করবার উদ্দেশ্যে তিনিই শাস্ত্রাদি প্রণয়ন করেন। ইনিই সেই পরমেশ্বর ভগবান, যাঁর অপ্রাকৃত রূপ জিতেন্দ্রিয সংযত-চিত্ত অমলাত্মা মহান ভক্তগণ ঐকান্তিক ভক্তিযোগের মাধ্যমে দর্শন করে থাকেন। জীবের অস্তিত্ব নির্মল ও শুদ্ধ করার সেটিই হল একমাত্র পন্থা।”
“হে সখি, ইনিই সেই পরমেশ্বর ভগবান, যাঁর আকর্ষণীয় ও গুহ্য লীলাসমূহ বৈদিক শাস্ত্রের অতি প্রচ্ছন্ন অংশগুলিতে তাঁর মহান ভক্তগণের দ্বারা বর্ণিত হয়েছে। ইনিই সেই একমাত্র পুরুষ যিনি এই জড় জগতের সৃষ্টি, স্থিতি এবং প্রলয়কার্য সাধন করে থাকেন এবং তা সত্ত্বেও তিনি তার দ্বারা প্রভাবিত হন না। যখনই রাজা ও শাসকবৃন্দ তমোগুণের দ্বারা আচ্ছাদিত হয়ে অধর্ম আচরণপূর্বক পশুর মতো জীবন যাপন করে, তখন এই ভগবান শ্রীকৃষ্ণই তাঁর অপ্রাকৃত রূপে বিভিন্ন যুগে প্রকটিত হয়ে তাঁর সর্বশক্তিমত্তা পরমসত্যতা বিশ্বস্তজনের প্রতি বিশেষ কৃপা ও অদ্ভুত ক্রিয়াকলাপ সম্পাদন আদি লীলা-বিক্রম প্রকাশ করে থাকেন। আহা, যদুবংশ পরম মহিমায় মহিমান্বিত এবং মথুরা সবচাইতে পুণ্যময় কেননা এই পুরুষোত্তম লক্ষ্মীপতি শ্রীহরি স্বয়ং যদুবংশে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং শৈশবে মথুরায় বিহার করেছেন। নিঃসন্দেহে এটি পরম আশ্চর্যের বিষয় যে দ্বারকা স্বর্গের মহিমাকেও লাঞ্ছিত করেছে এবং পৃথিবীর পুণ্য প্রসিদ্ধ বৃদ্ধি করেছে। দ্বারকাবাসীরা সর্বদাই সমস্ত জীবাত্মার আত্মা শ্রীকৃষ্ণকে তাঁর প্রেমময় রূপ-বৈশিষ্ট্যে দর্শন করছেন। তিনি মধুর হাস্যময় কৃপাদৃষ্টি দ্বারা তাঁদের অনুগৃহীত করছেন।”
“হে সখিগণ, তিনি যাঁদের পাণিগ্রহণ করেছেন, সেই সমস্ত গৃহিণীদের কথা একবার চিন্তা কর। তাঁর অধরোষ্ঠ থেকে এখন অহরহ (চুম্বনের মাধ্যমে) সুধা আস্বাদনের জন্য নিশ্চিতভাবে পূর্বজন্মে তাঁরা কতই না ব্রত পালন, পূত স্নান, যজ্ঞহোমাদি, আর পরমেশ্বরের সম্যক্‌ আরাধনা করেছেন। ব্রজভূমির ললনাগণ শুধু তেমনই অনুকম্পার আশায় মুহুর্মুহু মূর্ছাপ্রাপ্ত হতেন। প্রদ্যুম্ন, সাম্ব, অম্ব প্রমুখ সন্তানের জননী, রুক্মিণী, সত্যভামা এবং জাম্ববতীর মতো রমণীদের তিনি বলপূর্বক তাঁদের স্বয়ংবরসভা থেকে হরণ করে এবং ভৌমাসুর ও তাঁর সহস্র-সহস্র সহচরকে নিহত করে পরে তিনি অন্যান্য মহিলাদেরও বলপূর্বক হরণ করেন। এই সব মহিলারা সকলেই মহিমান্বিত। সেই সমস্ত নারীগণ নিতান্ত অপবিত্র ও স্বাতন্ত্র্যহীন হওয়া স্বত্ত্বেও পবিত্রভাবে মহিমান্বিত হয়েছেন। তাঁদের প্রতি কমললোচন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বহুমূল্য সামগ্রী আহরন করে উপহারস্বরূপ প্রদানপূর্বক তাঁদের হৃদয়ের আনন্দ বর্ধন করেছেন এবং তাঁদের নিঃসঙ্গ রেখে কখনো তিনি গৃহ থেকে নির্গমন করেন নাই। রাজধানী হস্তিনাপুরের পুরনারীগণ যখন এইভাবে বাক্যালাপ করছিলেন এবং তাঁকে অভিনন্দন জানাচ্ছিলেন, তখন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীহরি স্মিতহাস্যে তাঁদের শুভ অভিনন্দন গ্রহণ করলেন এবং তাঁদের উপরে কৃপাদৃষ্টি নিক্ষেপপূর্বক নগর পরিত্যাগ করে চলে গেলেন। মহারাজ যুধিষ্ঠির অজাতশত্রু হলেও, অন্যান্য শত্রুদের হাতে মধু আদি অসুরদের শত্রু ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কোনও অনিষ্টের আশঙ্কায় তাঁর প্রতিরক্ষার জন্য এবং স্নেহবশেও তাঁর সাথে হস্তী, অশ্ব, রথ এবং পদাতিক সৈন্য সমন্বিত এক বিরাট চতুরঙ্গ-বাহিনী প্রেরণ করেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণের প্রতি গভীর স্নেহের বশে বিচ্ছেদ-ব্যাকুল কুরুবংশীয় পান্ডবেরা বহুদূর পর্যন্ত শ্রীকৃষ্ণের সহগমন করেছিলেন। তখন তাঁদের ফিরে যেতে রাজী করিয়ে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর অন্তরঙ্গ অনুগামীদের সঙ্গে স্বীয় দ্বারকাপুরীতে গমন করলেন।”
“হে ভৃগুনন্দন শৌনক, তারপর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যমুনা তটবর্তী কুরুজাঙ্গল, পাঞ্চাল, শূরসেনা, ব্রহ্মাবর্ত, কুরুক্ষেত্র, মৎস্যা, সারস্বতা প্রদেশ এবং বারিহীন ও অল্প জলবিশিষ্ট মরুপ্রদেশ সমুহ ধীরে ধীরে অতিক্রম করে ঈষৎ পরিশ্রান্ত অবস্থায় অশ্ববাহিত হয়ে সৌভীর ও আভীর দেশের পশ্চিমবর্তী প্রদেশ দ্বারকায় অবশেষে উপস্থিত হলেন। এই সমস্ত প্রদশেগুলির মধ্য দিয়ে পরিভ্রমণকালে সেখানকার স্থানীয় অধিবাসীরা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীহরিকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন, আরাধনা করেছিল এবং বিভিন্ন উপহার-সামগ্রী নিবেদন করেছিল। সন্ধ্যাবেলায় সকল স্থানেই পরমেশ্বর ভগবান সান্ধ্যকালীন ধর্মীয় কৃত্যসমূহ আচরণের জন্য তাঁর ভ্রমণ স্থগিত রাখতেন। পশ্চিম দিগন্তে সমুদ্রবক্ষে সূর্য অস্তমিত হলে নিয়মিতভাবেই তিনি এই বিধি পালন করতেন।”

Leave a Reply

October 2021
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031

Blog Stats

  • 140,943 hits