পরমেশ্বর ভগবান চান যে জড় জগতে মোহাচ্ছন্ন দুঃখ-দুর্দশাক্লীষ্ট জীব তার প্রকৃত আলয় চিন্ময় ভগবদ্ধাম, গোলোক বৃন্দাবনে ফিরে আসুক। জীবকে সেই সুযোগ প্রদান করবার জন্য ভগবান নানারকম আয়োজন করেছেন। যেমন সৃষ্টির শুরুতেই বেদ রূপে আধ্যাত্মিক জ্ঞানের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তারপরে যুগে যুগে তিনি এসেছেন এই জগতে ধর্ম সংস্থাপন করার জন্য, সাধুদের পরিত্রাণ করার জন্য এবং দুষ্কৃতকারীদের বিনাশ করার জন্য। আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে তিনি স্বয়ং তাঁর স্বরূপে প্রকাশিত হয়েছেন। তিনি বৃন্দাবনে তাঁর নিত্যলীলা প্রকট করে জীবকে মাধুর্যরসের উৎকর্ষতা প্রদর্শণ করেছেন। আজ থেকে পাঁচশত বছর আগে তিনি এই অঞ্চলে নবদ্বীপ মন্ডলে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুরূপে প্রকাশিত হয়ে জীবকে ভগবদ্ভক্তির পথ প্রদর্শণ করে গেছেন। মনুষ্য জন্মের প্রকৃত উদ্দেশ্যের শিক্ষা দিয়ে গেছেন। তিনি এইভাবে আমাদের এই জড় জগতের দুঃখ-দুর্দশাময় পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার লাভের নানারকম আয়োজন করে গেছেন। যাতে আমরা তাঁর কাছে ফিরে যাই। আমাদের তাঁর কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি উদ্গ্রীব হয়ে রয়েছেন। তিনি সবরকম আয়োজন করে রেখেছেন।
কিন্তু তাঁর কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য কেবল একটি প্রয়োজন আমাদের তরফ থেকে রয়েছে। সেটি হচ্ছে তাঁর কাছে ফিরে যাওয়ার বাসনা আমাদের করতে হবে। এই ব্যাপারে যে ক্ষুদ্র স্বাধীনতা ভগবান আমাদের দিয়েছেন–তাতে তিনি কখনও হস্তক্ষেপ করেন না।
ভগবান কেন জীবকে জোর করে তাঁর কাছে নিয়ে যান না? এই জড় জগতের দুঃখ-দুর্দশাময় পরিস্থিতি থেকে তিনি কেন আমাদের উদ্ধার করে তাঁর কাছে নিয়ে যাচ্ছেন না?
তার উত্তরেও, বলা হচ্ছে যে, ভগবানের সঙ্গে জীবের যে সম্পর্ক, সেটি প্রেমের সম্পর্ক, ভালবাসার সম্পর্ক। জোর করে কাউকে ভালোবাসানো যায় না। ভালবাসাটা এমনই একটি বস্তু যেটি জোর করে কখনও করা যায় না। স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাদেরকেই তাঁর প্রতি ঐকান্তিকতা অবলম্বন করে, আকৃষ্ট হয়ে, আমাদের হৃদয়ের যে প্রেম, সেটি তাঁকে অর্পণ করতে হবে। কেবল এতটুকুই ভগবান আমাদের কাছ থেকে চান। ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়ার একটি মাত্র শর্ত আমাদের জন্য রয়েছে। সেটি হচ্ছে আমাদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভগবানকে ভালবাসতে হবে। এই ভালোবাসাটুকুই তাঁকে আমাদের প্রদান করতে হবে। আর বাকী সমস্ত আয়োজন তিনিই তখন করে দেবেন। ভগবান প্রতিটি জীবের হৃদয়ে বিরাজ করছেন। কেবল সেই মুহূর্তটির জন্য তিনি প্রতীক্ষা করে রয়েছেন, তিনি আমাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন, তিনি অপেক্ষা করে রয়েছেন, কখন আমরা ঐকান্তিকতার সঙ্গে তাঁর কাছে প্রার্থনা করব, হে ভগবান এবার তুমি আমাকে তোমায় ভালবাসার সুযোগ দাও, আমার ভালবাসার প্রকাশ ঘটিয়ে তোমাকে সেবা করার সুযোগ দাও। এই জড়জগতের দুঃখদুর্দশাময় পরিস্থিতি থেকে আমাদের উদ্ধার করে চিদ্ জগতে তোমার নিত্যসেবায় আমাকে নিযুক্ত কর। কেবল এইটুকুই আমাদের করতে হবে। যদি তা করি, তাহলে আমাদের হৃদয়ে পরমাত্মারূপে বিরাজিত ভগবান তৎক্ষণাৎ আমাদের সেই প্রার্থনায় সাড়া দেবেন। আমাদের ভালোবাসা যখন তাঁর প্রতি অর্পিত হয় তখন তিনি সেই ভালোবাসটি সহস্র গুণে, লক্ষ গুণে, কোটি গুণে বর্ধিত করে আমাদেরকে তাঁর ভালোবাসা অর্পণ করেন। এইভাবে জীবের সঙ্গে যে প্রেমের ভালোবাসার আদান প্রদান শুরু হয়, তাকেই বলা হয় ভক্তি।
ভগবদ্ভক্তির পথ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু প্রদর্শন করে গেছেন। আমরা কিভাবে ভগবানের ভক্ত হতে পারি সেই শিক্ষা দেওয়ার জন্যই পরমেশ্বর ভগবান কৃষ্ণ স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যরূপে এই বঙ্গভূমিতে, এই গৌড়মন্ডলভূমিতে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তিনি চব্বিশ বছর এইখানে লীলাবিলাস করার পর সন্ন্যাস লীলা অবলম্বন করে জগন্নাথপুরীতে যান। সেখানে তিনি শ্রীজগন্নাথের শ্রীপাদপদ্মের আশ্রয় অবলম্বন করে, জগন্নাথকেই তাঁর জীবনের কেন্দ্রবিন্দু করে তিনি তাঁর বাকি চব্বিশ বছরের আঠারো বছর সেখানে কাটিয়েছিলেন। মাঝে ছয় বছর তিনি ভারতের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করেছিলেন। দাক্ষিনাত্য ভ্রমণ করেন, তারপর বৃন্দাবনে যান, বৃন্দাবন থেকে আবার ফিরে এসে তিনি জগন্নাথপুরীতেই তাঁর অন্ত্য লীলা সমাপন করেন।
যেহেতু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু হচ্ছেন স্বয়ং পরমেশ্বর ভগবান কৃষ্ণ, তাই বোঝা যাচ্ছে যে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ তাঁর ভক্তভাব অবলম্বন করে অবতীর্ণ হয়ে, কিভাবে রথযাত্রা উৎসবটি পালন করতে হবে সেটি পুরীধামে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর রথাযাত্রালীলার মধ্য দিয়ে আমাদের শিক্ষা প্রদান করেছেন। আর রথযাত্রার সেই ভাবটি হচ্ছে বৃন্দাবনের গোপীদের ভাব। তার কারণ, শ্রীকৃষ্ণ, বলরাম ও সুভদ্রাদেবীকে রথে আরোহন করিয়ে প্রথম এই রথযাত্রার সুচনা করেছিলেন বৃন্দাবনের গোপীগণ। সেই কাহিনীটি হল–একবার শ্রীকৃষ্ণ, বলরাম ও সুভদ্রাদেবী সূর্যগ্রহণ উপলক্ষে কুরুক্ষেত্রে স্যমন্তপঞ্চকতীর্থে স্নান করতে যান। এখনও করুক্ষেত্রে সূর্যগ্রহণকালে স্নান করতে বহু পুণ্যার্থী গমন করেন। এই রীতিটি হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসছে। সেই রীতি অনুসরণ করে আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে শ্রীকৃষ্ণ দ্বারকা থেকে গিয়েছিলেন কুরুক্ষেত্রে। সূর্যগ্রহণকালে বৃন্দাবন থেকে ব্রজবাসীরাও সেখানে গিয়েছিলেন। সূর্যগ্রহণের স্নানের পর সকলে যে যাঁর নিজস্থানে ফিরে যাবার আয়োজন করেছেন। তখন ব্রজবাসীরা সংবাদ পেলেন কৃষ্ণ কুরুক্ষেত্রে এসেছেন। শোনামাত্রই তাঁরা ছুটলেন কৃষ্ণকে দর্শন করার জন্য।
কংসকে বধ করবার জন্য কৃষ্ণ যখন বৃন্দাবন থেকে মথুরায় গিয়েছিলেন, তখন কৃষ্ণ মথুরা থেকে দ্বারকায় চলে যান। প্রায় একশ বছর ধরে ব্রজবাসীরা কৃষ্ণের দর্শন পাননি। যে ব্রজবাসীরা, যে ব্রজগোপিকারা এক নিমেষেরও অদর্শণ সহ্য করতে পারতেন না, অর্থাৎ চোখের যখন পাতা পড়তো–সেই চোখের পলক পড়ার ক্ষণটি বা নিমেষ–সেই সময়টুকু তারা কৃষ্ণকে দেখতে না পারা সহ্য করতে পারতেন না। সেই জন্য তাঁরা আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ব্রহ্মা যে কি সৃষ্টি করেছেন, চোখের পাতার পলক পড়ছে–এভাবে ব্রহ্মার সৃষ্টিকর্মে তাঁরা ভুল প্রদর্শণ করেছিলেন। সেই ব্রজগোপিকারা একশো বছর শ্রীকৃষ্ণের বিরহে ব্যথিত ছিলেন।
এখন যখন শুনতে পেলেন কৃষ্ণ এসেছেন কুরুক্ষেত্রে–সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা ছুটলেন কৃষ্ণকে দর্শন করতে। কৃষ্ণ তখন রথে উঠে বসেছেন, তিনি কুরক্ষেত্র থেকে তাঁর রাজধানী দ্বারকায় ফিরে যাবেন, সঙ্গে রয়েছেন শ্রীবলরাম ও সুভদ্রা। চারপাশে অনেক রাজপুরুষ, সৈনিক। কৃষ্ণের বেশও অন্যরকম। গোপবেশের পরিবর্তে রাজবেশ। হাতে বাঁশীর পরিবর্তে ধনুর্বাণ। কোমরে তলোয়ার, বর্ম, মাথায় মুকুট, পরণে রাজবেশ। কৃষ্ণকে এভাবে দর্শন করে গোপীদের মন ভরল না। বিশেষ করে রাধারাণী বললেন–এই কৃষ্ণ আমাদের সেই কৃষ্ণ নয়, যাঁকে আমরা চিনতাম, বৃন্দাবনের বনে বনে আমাদের সঙ্গে যে লীলাখেলা করত, সেই কৃষ্ণের মাথায় ময়ূরের পাখা, তাঁর পরণে পীতবসন, গলায় বনমালা, হাতে বাঁশি, আর এই কৃষ্ণের পরণে তো রাজবেশ।
রাধারাণীর সেই মনোভাব বুঝতে পেরে ব্রজবাসীরা কৃষ্ণের রথের দড়ি ধরে, কৃষ্ণের রথের ঘোড়াগুলি ধরে টানতে টানতে নিয়ে চললেন বৃন্দাবনের দিকে। সঙ্গে বলরাম–তিনিও ব্রজবাসীদের শৈশবের, কৈশোরের সাথী। তাঁকেও রথে চড়ালেন। সুভদ্রা বোন–তাঁকে তো ফেলে রাখা যায় না, তাঁকেও তারা নিয়ে চললেন। এইটি হচ্ছে রথযাত্রার ইতিহাস। সেই সময় থেকে এই রথযাত্রার অনুষ্ঠান হয়ে আসছে। বিশেষ করে জগন্নাথ পুরীতে।
জগন্নাথ পুরীর এই রথযাত্রাটি হচ্ছে গোপীদের সেই কুরুক্ষেত্র রথযাত্রার দ্যোতক। রথের সময় জগন্নাথ বা কৃষ্ণকে নিয়ে যাওয়া হয় নীলাচল থেকে সুন্দরাচলে। অর্থাৎ গুন্ডিচা মন্দিরে–সেটিই বৃন্দাবন, যেখানে কৃষ্ণ ব্রজবাসীদের সঙ্গে আটদিন ছিলেন। এদিকে কৃষ্ণ দ্বারকায় ফিরে এলেন না দেখে দ্বারকাবাসীরা সকলে অত্যন্ত উৎকন্ঠিত হয়ে রয়েছেন–কেন কৃষ্ণ ফিরে এলেন না। খবর নিয়ে জানতে পারলেন, ব্রজবাসীরা কৃষ্ণকে চুরি করে নিয়ে চলে গেছে বৃন্দাবনে। কুরুক্ষেত্রে থেকে কৃষ্ণকে তারা চুরি করে নিয়ে চলে গেছে। মহালক্ষ্মী রুক্মিনীদেবী অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন। তিনি তখন সৈন্য সামন্ত নিয়ে বৃন্দাবনকে অবরোধ করে ঘিরে রাখলেন। ব্রজবাসীদের গ্রেফতার করলেন। তাঁদের দন্ড দেবেন। দন্ড দেওয়ার সময় বিচার হচ্ছে। ব্রজবাসীদের পক্ষে ললিতাদেবী। দ্বারকাবাসীদের পক্ষে কথা বলছেন নারদমুনি। তাঁদের মধ্যে বাকবিতন্ডা হচ্ছে।
কথায় কথায় প্রশ্ন উঠল, কৃষ্ণ যদিও দ্বারকাতে থাকেন,–রুক্মিনীদেবীই প্রশ্নটি তুললেন–কিন্তু তাঁর মনটি যেন অন্য কোথাও থাকে। সবসময় দ্বারকাতে কৃষ্ণ অন্যমনস্ক। তাঁর শরীরটি রয়েছে দ্বারকায়, তার মন রয়েছে অন্য কোথাও। রাত্রিবেলায় নিদ্রাকালে তিনি ব্রজবাসীদের, ব্রজগোপীদের, ব্রজের গাভীদের নাম ধরে ডাকেন। এভাবে রুক্মিনীদেবী বুঝতে পেরেছিলেন যে কি জাগ্রত অবস্থায় এবং কি নিদ্রিত অবস্থায় কৃষ্ণের মনটি পড়ে রয়েছে বৃন্দাবনে। প্রশ্নটি ছিল–দ্বারকায় বহু কিছু ঐশ্বর্য থাকা সত্ত্বেও কেন কৃষ্ণের মন সবসময় পড়ে রয়েছে বৃন্দাবনে।
তার উত্তরে ললিতাদেবী জানালেন–এই বৃন্দাবনের প্রতিটি গাছ কল্পবৃক্ষ, প্রতিটি গাভী হচ্ছে সুরভী, ভূমি হচ্ছে চিন্তামণি, অতএব এগুলির প্রভাবে এখানে সবকিছু ঐশ্বর্যই থাকতে পারে। যদি ব্রজবাসীরা চায় তা হলে তারা কল্পবৃক্ষের কাছে, সুরভী গাভীদের কাছে, চিন্তামণি ভূমির কাছে সবকিছু ইপ্সিত বস্তু লাভ করতে পারেন। কিন্তু বৃন্দাবনে তারা ঐশ্বর্য চান না। বৃন্দাবনবাসীদের একমাত্র চাওয়া হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণ। সর্বক্ষণই কৃষ্ণকে চাইছেন। আর কোনও কিছু চান না। সেজন্য বৃন্দাবনে ঐশ্বর্য প্রকাশিত হয়নি, যদিও ঐশ্বর্যের পরাকাষ্ঠা হচ্ছে এই বৃন্দাবন।
অর্থাৎ বৃন্দাবনে ব্রজবাসীদের কৃষ্ণের প্রতি যে অনুরাগ, যে প্রীতি, যে ভক্তি, সেটিই হচ্ছে ভক্তির চরম পরিণতি। ভক্তির স্তরে স্তরে ক্রমোন্নতি–সেই ক্রমোন্নতির চরম স্তর হচ্ছে বৃন্দাবনের মধুর রসে পরকীয়াভাবে কৃষ্ণের প্রতি তাঁদের যে প্রেম, অন্তরের ভালবাসা। সেজন্য বৃন্দাবনই হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান। অর্থাৎ, চিদ্জগতে বৈকুন্ঠলোকের ঊর্ধ্বে হচ্ছে বৃন্দাবন। এই জড়জগৎ–ব্রহ্মান্ড, ব্রহ্মান্ডের বাইরে রয়েছে বিরজা নদী, বিরজার অপর পাড়ে রয়েছে ব্রহ্মজ্যোতি, ব্রহ্মজ্যোতি ভেদ করে বৈকুন্ঠলোক, বৈকুন্ঠের উপরে অযোধ্যা, তার উপরে দ্বারকা, তার উপরে মথুরামন্ডল। মথুরামন্ডলের কেন্দ্রস্থল হচ্ছে বৃন্দাবন। আর সেই বৃন্দাবনে যাওয়ার জন্য দ্বারকাধীশ কৃষ্ণ পর্যন্ত আকুল হন। সেই ভাবটি রথযাত্রা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
বৈকুন্ঠে ঐশ্বর্য রয়েছে। বৈকুন্ঠে আছেন লক্ষ্মীদেবী। নারায়ণের বক্ষবিলাসিনী লক্ষ্মীদেবী সেখানে বিরাজ করছেন। তাই সেখানে সবরকম ঐশ্বর্য প্রকাশিত হয়েছে। সেই বৈকুন্ঠের সর্বোচ্চ স্থান হচ্ছে দ্বারকা। সেখানে থাকেন মহালক্ষ্মী। বৈকুন্ঠে লক্ষ্মী, দ্বারকার রুক্মিনী হচ্ছে মহালক্ষ্মী। সমস্ত লক্ষ্মীর উৎস রুক্মিনীদেবী।
এখানে আমরা দেখতে পাই সেই রুক্মিনী দেবী বৃন্দাবনের মাধুর্য, বৃন্দাবনের মহিমা অবলম্বন করে বৃন্দাবনের কাছে নতি স্বীকার করছেন। তিনি স্বীকার করছেন, বৃন্দাবন দ্বারকারও ঊর্ধ্বে। তাই কৃষ্ণকে অপহরণকারী ব্রজবাসীদের গ্রেফতার করতে এসে তিনি তাঁদের কাছে নতি স্বীকার করলেন।
তারপর রুক্মিনীদেবী বললেন, আমি তো শুনেছি রাসলীলার কথা, তাই রাসলীলা দর্শন করতে চাই। ব্রজগোপিকরা তখন কৃষ্ণকে নিয়ে রাসলীলা নৃত্য করলেন এই রথযাত্রার সময় নববৃন্দাবনে। কুরুক্ষেত্রের কাছেই একটি স্থানে যেখানে গোপেরা সূর্যগ্রহণ উপলক্ষে এসে অবস্থান করেছিলেন, তাকেই বলা হয় নব-বৃন্দাবন। সেখানেই কৃষ্ণ, বলরাম ও সুভদ্রাকে তাঁরা নিয়ে গিয়েছিলেন।
ব্রজবাসীরা যেহেতু তারা গোপালক, তাঁরা তাই বনের কাছে ছিলেন। কৃষ্ণকে তাঁরা সেই বনেই নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে আটদিন কাটিয়ে ছিলেন। তারপর রাসনৃত্য দর্শন করে রুক্মিনীদেবী বলেছিলেন–আহা অপূর্ব এক সম্পদ আমি দর্শন করলাম। ব্রজগোপীরা উত্তর দিয়েছিলেন, বৃন্দাবনের যে রাসনৃত্য, তার কাছে এই রাসনৃত্য কিছুই নয়। এভাবে বৃন্দাবনের মহিমার উৎকর্ষ ক্রমশঃ প্রকাশিত হয়েছে। আমরা এখানে দেখতে পাচ্ছি, কৃষ্ণের সঙ্গে রয়েছেন বলরাম ও সুভদ্রা। কৃষ্ণের সঙ্গে লক্ষ্মীদেবী বা রু´িনীদেবী নেই। সুভদ্রা–যোগমায়া। এখানে বৃন্দাবন লীলা ব্যক্ত করতে ঐশ্বর্যের অধিষ্ঠাত্রী লক্ষ্মীদেবী দূরে সরে গেছেন। এখানে যোগমায়ার প্রকাশ হয়েছে। যোগমায়ার প্রভাবে শ্রীকৃষ্ণের এই ব্রজলীলা প্রদর্শিত হচ্ছে।
অর্থাৎ এই রথযাত্রা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমরা ঐশ্বর্যপর ভগবদ্ভক্তিকে অতিক্রম করে মাধুর্যপর ভক্তিকে প্রদর্শনের সুযোগ লাভ করছি। আমাদের কাছে এই রথযাত্রা অনুষ্ঠান এক বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমন্বিত। সেজন্য শ্রীল প্রভুপাদ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বাণী প্রচার করার জন্য যখন পাশ্চাত্য দেশে গিয়েছিলেন তখন তিনি সেখানে গিয়ে এই রথযাত্রার আয়োজন করেন। রথযাত্রা শুরু করেন। বহু মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছেন। প্রভুপাদ বহু মানুষকে কৃষ্ণভক্তে পরিণত করেছেন। সেইসঙ্গে এই রথযাত্রার অনুষ্ঠান করেছিলেন। প্রথমে সানফ্রান্সিসকো শহরে, তারপর আমেরিকার বিভিন্ন শহরে–নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন, ডালাস, শিকাগো ইত্যাদি। তারপর লন্ডন। লন্ডনের কেন্দ্রস্থলে প্রভুপাদ জগন্নাথের রথযাত্রা মহোৎসবের আযোজন করেছিলেন। লন্ডনের ট্রাফেলগার স্কোয়ারে প্রতি বছর মহাসমারোহে আজও রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়।
শ্রীল প্রভুপাদের সময়ে পৃথিবীর আট দশটি শহরে কেবল রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হত। এখন পৃথিবীর শত শত শহরে রথযাত্রা অনুষ্ঠান হচ্ছে। জগন্নাথের রথযাত্রা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমরা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষা যথাযথভাবে হৃদয়ঙ্গম করার মাধ্যমে আমাদের মানব জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য অবগত হতে পারি। শাস্ত্রে বলা হয়েছে রথারূঢ় পরমেশ্বর ভগবানকে দর্শন করলে এই জড় জগতের জন্ম মৃত্যুর আবদ্ধতা থেকে তৎক্ষণাৎ মুক্তি লাভ করা যায়। তাই যথার্থভাবেই এই রথযাত্রার উৎসব জীবের প্রতি ভগবানের এক করুণার প্রকাশ।