বেদের উদ্দেশ্য হচ্ছে ভগবানকে জানা

কলিযুগের মানুষদের অধঃপতিত অবস্থার কথা চিন্তা করে ব্যাসদেব বেদকে সহজবোধ্য করার কথা বিবেচনা করেন। পূর্ণরূপে বেদকে জানা না হলে বেদের প্রকৃত তত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব নয়। বেদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবানকে জানিয়ে দেওয়া। যতক্ষণ পর্যন্ত বেদের মাধ্যমে সেই ভগবানকে জানা না যাচ্ছে ততক্ষণ বেদের মূলতত্ত্ব জানা হয় না। তাই বেদকে গাভীর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। গাভীর মূখ্য প্রয়োজনীয়তা হচ্ছে তার দুধের জন্য। কিন্তু গাভীর দুধ না গ্রহণ করে যদি তার ঠ্যাং অথবা শিং নিয়ে টানাটানি করা হয়, তাহলে তাতে কোন লাভ হয় না। তেমনই বেদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে জানিয়ে দেওয়া এবং যতক্ষণ পর্যন্ত সেই কার্যটি সাধিত না হচ্ছে ততক্ষণ বেদ অনুশীলনে কোন লাভ হয় না। শ্রীকৃষ্ণ নিজেই ভগবদ্গীতায় বলেছেন, “বেদৈশ্চ সবৈরহমেব বেদ্যো” অর্থাৎ, সমস্ত বেদের একমাত্র জ্ঞাতব্য বিষয় হচ্ছি আমি। সেই সূত্রে শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃতে বলা হয়েছে–
সর্বশাস্ত্রে কহে কৃষ্ণভক্তির ব্যাখ্যান।
জ্ঞান, যোগ, তপো-ধর্ম নাহি মানে আন ॥
সমস্ত শাস্ত্রে কৃষ্ণভক্তির ব্যাখ্যাই করা হয়েছে, কর্ম, জ্ঞান, যোগ ইত্যাদির যে বর্ণনা শাস্ত্রে পাওয়া যায় তা আনুষঙ্গিক। কৃষ্ণভক্তির অনুকূল অঙ্গরূপে সেগুলির উপযোগিতা। কৃষ্ণকেন্দ্রিক না হলে সেগুলি অনুশীলনের ফলে কোন লাভ হয় না। পক্ষান্তরে ক্ষতিই হয়।
বেদকে সাধারণত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে, কর্মকান্ড, জ্ঞানকান্ড এবং উপাসনা কান্ড। কর্মকান্ডে বর্ণনা করা হয়েছে, কিভাবে কর্ম করার ফলে কর্ম বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া যায়। কর্ম যখন নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য সাধিত হয় তখন সেই কর্মের ফল জীবকে জড় জগতের  বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখে। অর্থাৎ কেউ যখন স্বার্থ সিদ্ধির জন্য কর্ম করে তখন সেই কর্মের ফল তাকে ভোগ করতে হয় এবং সেই কর্মফলই হচ্ছে তার বন্ধন। পুণ্য কর্মের ফলে সে সুখ ভোগ করে এবং পাপ কর্মের ফলে সে দুঃখ ভোগ করে। এই সুখ এবং দুঃখ, উভয়ই বন্ধন। কিন্তু কর্ম যখন ভগবানের উদ্দেশ্যে সাধিত হয়, তখন সেই কর্মের ফল ভগবান গ্রহণ করেন, তাই সেই কর্মের ফলে কোন বন্ধনের সৃষ্টি হয় না। পক্ষান্তরে সেই কর্ম, বন্ধন-মুক্তির কারণ হয় এইভাবে বেদের কর্মকান্ড অধ্যায়ে বর্ণনা করা হয়েছে, কিভাবে ভগবানের উদ্দেশ্যে এবং ভগবানের প্রতিনিধি দেবতাদের উদ্দেশ্যে কর্মফল উৎসর্গ করার মাধ্যমে কর্ম-বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া যায়।
জ্ঞানকান্ডের উদ্দেশ্য হচ্ছে যথার্থ জ্ঞানের মাধ্যমে ভগবানকে জানার পন্থা প্রদর্শন করা। ভগবান জড়াতীত বস্তু, তাই জড় ইন্দ্রিয়ের দ্বারা তাঁকে জানা কখনই সম্ভব নয়। শ্রীপাদ শঙ্করাচার্য বলেছেন, অচিন্ত্য, খলু যে ভাবাঃ ন তংস্তর্কেণ যোজয়েৎ। যে তত্ত্ব আমাদের চিন্তার অতীত, তর্কের দ্বারা কখন তার সম্বন্ধে জানা যায় না। সুতরাং সেই তত্ত্বকে জানতে হয় শাস্ত্রের মাধ্যমে। শাস্ত্রে যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং যা বর্ণনা করা হয়েছে সেই সম্বন্ধে তর্ক-বিতর্ক না করে, শ্রদ্ধাবনত চিত্তে এবং সরল বিশ্বাসে সেগুলি গ্রহণ করতে হবে। শাস্ত্রে যদি বলা হয় যে ভগবানের গায়ের রঙ নীল, তাহলে কারও গায়ের রঙ নীল হতে পারে কিনা, তা নিয়ে তর্ক না করে মেনে নিতে হবে যে ভগবানের গায়ের রঙ নীল। এইভাবে শাস্ত্রের বর্ণনা অনুসারে ভগবানকে জানার পন্থা অবলম্বন করতে শিক্ষা দেওয়াই হচ্ছে জ্ঞানকান্ডের উদ্দেশ্য। জ্ঞানকান্ডে যে বহু শাখায় জ্ঞানের আলোচনা করা হয়েছে তাতে এইটিই কেবল বোঝানো হয়েছে যে জ্ঞানের দ্বারা ভগবানকে জানা যায় না। তাই জ্ঞানের প্রয়াস ত্যাগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেননা এই জ্ঞানে মাধ্যমে লাভ কিছুই হয় না, কেবল জঞ্জালই বেড়ে যায়।
এইভাবে জ্ঞানের স্তর অতিক্রম করা গেলে শুরু হয় ভগবানের উপাসনা। তা বর্ণিত হয়েছে, বেদের উপাসনা কান্ডে। এবং এই উপাসনা কান্ডই হচ্ছে বেদের মূল শিক্ষা। যাতে ভগবানের রূপ, গুণ, লীলা ইত্যাদি পূর্ণরূপে বর্ণনা করে ভগবানকে আরাধনা করার বা ভালোবাসার পথ প্রদর্শিত হয়েছে।

Comments are closed.

September 2015
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930  

Blog Stats

  • 140,978 hits