ঠাকুর হরিদাস যশোহর জেলার অন্তর্গত বুঢ়ন গ্রামে অহিন্দুকূলে আবির্ভূত হইয়াছিলেন। কিন্তু ভগবানের নিজজন ঠাকুর হরিদাস যৌবনের প্রারম্ভেই জন্মস্থান পরিত্যাগ পূর্বক বেনাপোলের অরণ্যে আসিয়া কৃষ্ণভজনে মনোনিবেশ করেন। প্রত্যহ তিন লক্ষ হরিনাম তাঁহার দৈনন্দিন কার্য ছিল। ভিক্ষাদি দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করিতেন। তাঁহার বৈরাগ্য ও ভজনপরায়ণতা লক্ষ্য করিয়া সজ্জনগণ সকলেই শতমুখে তাঁহার প্রশংসা করিতে লাগিলেন; বিপ্রগণও তাঁহার পাদপদ্ম বন্দনের সুযোগ পাইলে নিজদিগকে ধন্য জ্ঞান করিতেন।
সজ্জনগণের মুখে হরিদাস ঠাকুরের প্রশংসা শ্রবণ করিয়া মাৎসর্য্যানলে দগ্ধীভূত হইল রামচন্দ্র খান নামক এক প্রবল পরাক্রান্ত জমিদার। সে নিজের খল-স্বভাবের পরিচয় প্রদান করিতে উদ্যত হইল।
অহিন্দুকূলে আবির্ভূত হরিদাস ঠাকুরের প্রশংসা চতুর্দিকে বিস্তৃত হইতেছে, অথচ গ্রামে শ্রেষ্ঠ জমিদার এবং উচ্চ হিন্দুকূলে আবির্ভাব সত্ত্বেও নিজের ঐপ্রকার প্রতিষ্ঠা হইতেছে না দেখিয়া রামচন্দ্র খানের হৃদয় মাৎসর্য্যানলে দগ্ধীভূত হইতে লাগিল।
সে ঠাকুর হরিদাসের প্রতিষ্ঠা নষ্ট করিবার জন্য ঠাকুরের খুঁত অনুসন্ধান করিতে লাগিল কিন্তু কিছুই না পাইয়া অবশেষে সুন্দরী বেশ্যার সাহায্যে ঠাকুরের চরিত্র নষ্ট করিতে যত্নবান হইল। তৎপ্রেরিত বেশ্যা নানা প্রকার অঙ্গভঙ্গী দ্বারা ক্রমাগত তিনরাত্রি ঠাকুরের চিত্ত নষ্ট করিবার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করিল। ঠাকুর বেশ্যার প্রার্থনা শুনিয়া তাঁহার নাম সংখ্যা পূর্ণ হওয়ার পর্যন্ত দ্বারে বসিয়া বেশ্যাকে হরিনাম শ্রবণের জন্য উপদেশ প্রদান করিলেন। তিন রাত্রিই ঠাকুর নিরন্তর উচ্চৈস্বরে মহামন্ত্র কীর্তন করেন। দুষ্টবুদ্ধি কর্তৃক পরিচালিতা হইয়া বেশ্যা রামচন্দ্রখানের অভীষ্ট পূরণে অসমর্থ হইল। পরন্তু যে বেশ্যা ঠাকুরের চরিত্র নষ্ট করিতে আসিয়াছিল, ঠাকুর সেই বেশ্যাকে তাহার বেশ্যাবৃত্তি ছাড়াইয়া কৃষ্ণভজনে নিযুক্ত করিলেন।
বেশ্যা ক্রমাগত তিনরাত্রি মহাভাগবতের শ্রীমুখে হরিকীর্ত্তন শ্রবণের ফলে শুদ্ধান্তঃকরণ হইল। তাহার পাপময় জীবনের কথা স্মরণ করিয়া মর্মাহত হইতে লাগিল। ঠাকুরের চরণে প্রেরিতা হইয়া রামচন্দ্রখানের দুষ্টাদেশ ও তৎপালনে নিজের দুষ্ট চেষ্টার কথা নিবেদন পূর্বক ঠাকুরের নিকট ক্ষমা ভিক্ষা করিয়া আকুল ক্রন্দনে বক্ষ ভাসাইতে লাগিল।
ঠাকুর তাহাকে কৃপা করিলেন ও বলিলেন- শুধু তাহাকে কৃপা করিবার জন্যই তিনি তিন রাত্রি ঐস্থানে অবস্থান করিয়াছেন। ঠাকুরের আদেশে বেশ্যা তাহার যাবতীয় সম্পত্তি ব্রাহ্মণগণকে দান করিয়া ভিখারিণীয় বেশে একাকিনী ঠাকুরের আশ্রমে অবস্থান পূর্বক নিরন্তর কৃষ্ণ নাম কীর্তনে প্রমত্ত হইলেন। ঠাকুর বেশ্যাকে কৃপা করিয়া সেই দিনই বেনাপোল হইতে চাঁদপুরে প্রস্থান করিলেন। শ্রীচৈতন্য চরিতামৃতের ভাষায়-
“বনিকা লক্ষহীরা হইল পরম মহান্তী
কোটি কোটি লোক তাঁর দরশনে যান্তি।”
। হিতোপদেশ।
অসৎ ব্যক্তি নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য অন্যকে অসৎ কার্যে প্রেরণ করে। তাহারা বৈষ্ণবের প্রশংসা সহ্য করিতে অক্ষম। সেজন্য তাহারা বৈষ্ণবের খুঁৎ-অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হয়। কিন্তু খুঁৎ না পাওয়া গেলে তাঁর নির্মল চরিত্রে কালিমা লেপন করিতে উদ্যত হয়।
কিন্তু সর্বমঙ্গলময় বৈষ্ণবগণ, পরশমণির সংযোগে যেমন লৌহ সুবর্ণত্ব প্রাপ্ত হয়, সেরূপ তাঁদের সঙ্গদান করে, লৌহা সদৃশ হৃদয়া ব্যক্তিকে ভগবদ্ভক্তে রূপান্তরিত করেন।
এতৎ প্রসঙ্গে একটু বিচার্য এই যে মঙ্গলময় মহাদেব নীলকন্ঠই বিষ ভক্ষণে সমর্থ। অপরে বিষ ভক্ষণ করিতে গেলেই অকালে প্রাণ হারাইবেন। মহাভগবৎ হরিদাস ঠাকুর বেশ্যার চিত্তবৃত্তির পরিবর্তন করিতে পারিলেন বলিয়া যদি কনিষ্ঠ ও মধ্যমাধিকারী ঐ কার্যে হস্তক্ষেপ করেন, বেশ্যাসঙ্গ দূরে থাকুক, উপদেশ প্রদান ছলে যদি সাধারণ কামনীগণের সহিতও মেলামেশা করেন, তাহাতে তাহাদের পতন অবশ্যম্ভাবী। সেইজন্য ভগবান গৌরহরি ছোট হরিদাসকে দন্ড-প্রদান-প্রসঙ্গে জলদ-গম্ভীর-স্বরে বলিয়াছেন-
“বৈরাগী হইয়া করে প্রকৃতি সম্ভাষণ
দেখিতে না পারো আমি তাহার বদন
দুর্বার ইন্দ্রিয় করে বিষয় গ্রহণ
দারু প্রকৃতি হবে মুনেরপি মন।।”
শাস্ত্র বলেন-“মাত্রা স্বস্ত্রা দুহিত্রা বানা বিবিক্তাসনো বসেৎ
বলবানিন্দ্রিয়গ্রামো বিদ্বাংসমপি কর্ষতি।