মদনমোহন

এই জগতে সকলেই স্ত্রী-সঙ্গের প্রতি আসক্ত।  যেটি প্রায় সকলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।  শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে–
যন্মৈথুনাদি গৃহমেধিসুখং হি তুচ্ছৎ।
“সুখ–সংসার জীবনের তথাকথিত সুখের সূচনা হয় মৈথুন থেকে। ”
মানুষ সাধারণত বিবাহ করে তাদের কাম-বাসনা চরিতার্থ করার জন্য।  তারপর সে সন্তান-সন্ততি প্রাপ্ত হয়।  তারপর তারা যখন বড় হয়, তখন কন্যা একটি ছেলেকে বিবাহ করে এবং পুত্র একটি মেয়েকে বিবাহ করে, এবং তাও একটি মাত্র উদ্দেশ্যেই–কাম-বাসনা চরিতার্থ করা।

এইভাবে ‘শ্রী-ঐশ্বর্য-প্রজেপ্সব’– এর মাধ্যমে জড় সুখ প্রসারিত হয়।  শ্রী মানে ‘সৌন্দর্য ’, ঐশ্বর্য মানে হচ্ছে ‘ধন-সম্পদ’ আর প্রজা মানে হচ্ছে ‘সন্তান-সন্ততি’।  মানুষ মনে করে যে, সে যদি সুন্দরী স্ত্রী লাভ করে, ব্যাঙ্কে অনেক টাকা জমাতে পারে, আর পুত্র-কন্যা-নাতি-নাতনি ইত্যাদি উৎপাদন করতে পারে, তা হলেই তার জীবন সার্থক।  আর কোন পরিবারে, যদি সুন্দরী স্ত্রী, ধন সম্পদ এবং বহু সন্তান-সন্ততি থাকে, তা হলে তাকে সব চাইতে সার্থক বলে মনে করা হয়।

এই সার্থকতার অর্থ কি ? শাস্ত্রে বলা হয়েছে যে, এই সাফল্য কেবল মৈথুনের প্রসার মাত্র।  এছাড়া আর কিছুই নয়।  তা আমরা নানাভাবে রং-চং দিয়ে প্রকাশ করতে পারি, তবে এই মৈথুনের সুখ শুকরদের মধ্যেও রয়েছে।  শুকর সারাদিন যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায় আর নানা রকম কু-খাদ্য সংগ্রহ করে তার ক্ষুন্নিবৃত্তি করে।  তার সারাক্ষণের চিন্তা– “কোথায় একটু বিষ্ঠা পাওয়া যাবে ? কোথায় গেলে বিষ্ঠা পাওয়া যাবে ?” আর তারপর কোন রকম বাছ-বিছার না করেই সে মৈথুনে লিপ্ত হয়।  সে যে তার মায়ের সঙ্গে, না বোনের সঙ্গে, না কন্যার সঙ্গে লিপ্ত হচ্ছে, সেই সম্বন্ধে তার কোন বাছ-বিচার থাকে না।

তাই শাস্ত্রে বলা হয়েছে, এই জড় জগতে সকলেই কামদেবের শিকার।  কামদেব বা মদনের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে যৌন সুখ উপভোগ করা যায় না।  আর শ্রীকৃষ্ণের একটি নাম হচ্ছে মদনমোহন, অর্থাৎ ‘যিনি মদনকেও মোহিত করেন। ’ কেউ যখন শ্রীকৃষ্ণের দ্বারা আকৃষ্ট হয়, তখন তিনি মৈথুন-সুখ বিস্মৃত হন।  এটিই হচ্ছে কৃষ্ণভাবনামৃতের পথে প্রগতির পরীক্ষা।

মদন শব্দটির আরেকটি অর্থ হচ্ছে– ‘উন্মত্ত হওয়া বা প্রমত্ত হওয়া। ’ সকলেই কাম-বাসনা চরিতার্থ করতে উন্মত্ত। শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে–
পুংসঃ স্ত্রিয়া মিথুনীভাবমেতং
তয়োর্মিথো হৃদয়গ্রন্থিমাহুঃ।
এই জড় জগতে স্ত্রী এবং পুরুষের পরস্পরের প্রতি আকর্ষণের ফলেই সব কিছু সংগঠিত হচ্ছে।  পুরুষ স্ত্রীর প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে ,আর স্ত্রী পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে, এবং তারপর যখন তারা মৈথুনের দ্বারা আবদ্ধ হয়, তখন এই জড় জগতের প্রতি তাদের আসক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে।  বিবাহের পর স্ত্রী এবং পুরুষ একটি সুন্দর বাড়ি অথবা একটি ভাল চাকরির অন্বেষণ করে অথবা চাষ করার জমির অন্বেষণ করে।  কারণ অন্ন-বস্ত্রের সংস্থান করতে হলে অর্থ-উপার্জন করতে হবে।  তার পরে আসে সুত (সন্তান-সন্ততি), আত্ম (আত্মীয় স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধব) এবং বিত্ত (ধনসম্পদ)। এইভাবে জড় জগতের প্রতি আকর্ষণ গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকে।  আর তা শুরু হয় মদনের আকর্ষণের প্রভাবে, যৌন-সুখ উপভোগের জন্য। কিন্তু জড় জগতের চাকচিক্যের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া আমাদের উদ্দেশ্য নয়; আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া।  শ্রীকৃষ্ণের সৌন্দর্যের প্রতি আকৃষ্ট হলে জড় জগতের অলীক সৌন্দর্যের প্রতি আর কোন আকর্ষণ থাকে না। এই সম্বন্ধে শ্রীযামুনাচার্য বলেছেন–
যদবধি মম চেতঃ কৃষ্ণপাদারবিন্দে
নবনবরসধামন্যুদ্যতং রন্তুমাসীৎ।
তৎবধি বত নারীসঙ্গমে স্মর্যমাণে
ভবতি মুখবিকারঃ সুষ্ঠ নিষ্ঠীবনং চ ॥
“যখন থেকে আমি শ্রীকৃষ্ণের সৌন্দর্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছি, এবং তাঁর শ্রীপাদপদ্মের সেবা করতে শুরু করেছি, তখন থেকে আমি নব নব রস আস্বাদন করছি, এবং যখনই আমার স্ত্রী সঙ্গমের কথা স্মরণ হয়, তখন ঘৃণায় মুখ বিকৃত হয় এবং সেই জঘন্য চিন্তার উদ্দেশ্যে আমি থুথু ফেলি। ” এইভাবে শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন মদনমোহন– অর্থাৎ, মদনকে যিনি মোহন করেন। মদন সকলকে আকৃষ্ট করছে, কিন্তু আমরা যখন শ্রীকৃষ্ণের দ্বারা আকৃষ্ট হই, তখন আমরা এই জড় জগতকে জয় করি। তা না হলে, এই জড় জগতের আকর্ষণ জয় করা অত্যন্ত কঠিন। সেই সম্বন্ধে শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্গীতায় বলেছেন–
দৈবী হ্যেষা গুণময়ী মম মায়া দুরত্যয়া।
মামেব যে প্রপদ্যন্তে মায়ামেতাং তরন্তি তে ॥
এই জড় জগৎকে অতিক্রম করা অত্যন্ত কঠিন।  কিন্তু কেউ যদি শ্রীকৃষ্ণের শারণাগত হন এবং তাঁর শ্রীপাদপদ্মকে অত্যন্ত গভীরভাবে আঁকড়ে ধরে প্রার্থনা করেন, “কৃষ্ণ আমাকে রক্ষা কর। ” তখন শ্রীকৃষ্ণও প্রতিজ্ঞা করেন, “হ্যাঁ, আমি তোমাকে রক্ষা করব।  কোন দুশ্চিন্তা করো না।  আমি তোমাকে রক্ষা করব। ”
কৌন্তেয় প্রতিজানীহি ন মে ভক্তঃ প্রণশ্যতিঃ।
“হে অর্জুন, তুমি সমস্ত জগতের কাছে ঘোষণা করতে পার যে, আমার যে ভক্ত আমাকে সেবা করা ছাড়া অন্য কোন বাসনাই পোষণ করে না, তাকে আমি সর্বদাই রক্ষা করব। ”

দুর্ভাগ্যবশত, মানুষ জানে না যে, আমাদের একমাত্র কর্তব্য হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মের আশ্রয় গ্রহণ করা।  এ ছাড়া আমাদের আর কোন উদ্দেশ্য নেই।  এ ছাড়া আমরা যা কিছুই করি না কেন, তা কেবল আমাদের এই জড় জগতের বন্ধনে জড়িয়ে ফেলে।  মানব জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে এই জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া।  কিন্তু শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে, ন তে বিদুঃ স্বার্থগতিং হি বিষ্ণুম, “মানুষ জানে না যে, তাদের জীবনের পরম লক্ষ্য হচ্ছে ভগবান বিষ্ণু বা শ্রীকৃষ্ণকে জানা। ”

তাই এই যুগে মানুষকে কৃষ্ণভাবনায় উদ্ধুদ্ধ করা অত্যন্ত কঠিন।  কিন্তু তবুও শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু আমাদের নির্দেশ দিয়ে গেছেন এই জ্ঞান সমস্ত জগৎ জুড়ে বিতরণ করার জন্য। তাই আমাদের চেষ্টা করতে হবে।  মানুষ যদি আমাদের উপদেশ নাও শোনে, সেটি আমাদের অক্ষমতা নয়।  আমাদের একমাত্র যোগ্যতা হচ্ছে কেবল যথাসাধ্য চেষ্টা করা।  মায়া অত্যন্ত প্রবল।  তাই জীবনকে মায়ার কবল থেকে মুক্ত করাটা সহজ কাজ নয়।  আমার গুরু-মহারাজের সারা ভারত জুড়ে কত মন্দির ছিল, এবং তিনি কখনো কখনো বলতেন, “এই সমস্ত মন্দিরগুলি বিক্রি করে দিয়েও যদি আমি একজন মানুষকে কৃষ্ণভাবনায় উদ্ধুদ্ধ করতে পারতাম, তা হলে আমার উদ্দেশ্য সফল হত!” তিনি প্রায়ই এই কথা বলতেন।

বড় বড় বাড়ি করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়, যদিও কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করার জন্য এবং মানুষকে আশ্রয় দেবার জন্য কখনো কখনো তার প্রয়োজন রয়েছে; কিন্তু আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে মোহাচ্ছন্ন বদ্ধ জীবদের কৃষ্ণোন্মুখ করা।  সেটিই হচ্ছে আমাদের মূল উদ্দেশ্য।  তাই ভক্তিবিনোদ ঠাকুর এবং অন্যান্য মহান বৈষ্ণবেরা বড় বড় মন্দির বানাবার ব্যাপারে আমাদের সাবধান করে দিয়ে গেছেন।  কারণ তার ফলে আমরা জড় বিষয়ের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়তে পারি।  অর্থাৎ, আমরা শ্রীকৃষ্ণকে ভুলে যেতে পারি।

প্রকৃতপক্ষে অবশ্য কিছুই জড় নয়।  কোন কিছুকেই জড় বলে মনে করাটা এক রকমের ভ্রান্তি।  প্রকৃতপক্ষে সব কিছুই চিন্ময়।  তা হলে কোন কিছু জড় কিভাবে হতে পারে? পরমেশ্বর ভগবান হচ্ছেন পরম চেতন, এবং যেহেতু সব কিছুই তাঁর থেকেই উদ্ভুত হচ্ছে, এমন কি আমরা যাকে জড় শক্তি বলি, তাও তাঁর থেকেই আসছে এবং তাই চরমে তাও চিন্ময়।

কিন্তু অসুবিধাটা হচ্ছে এই যে, শ্রীকৃষ্ণের নিকৃষ্ট শক্তি এই জড়া প্রকৃতিতে শ্রীকৃষ্ণকে ভুলে যাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।  মানুষ এত সমস্ত কার্যকলাপে লিপ্ত– পাশ্চাত্যের দেশগুলিতে তা স্পষ্টভাবে দেখা যায়– আর তারা নানা রকম আধুনিক সুযোগ-সুবিধার উদ্ভাবন করছে।  কিন্তু পরিণামে কি হচ্ছে– তারা শ্রীকৃষ্ণকে ভুলে যাচ্ছে।  এইভাবে শ্রীকৃষ্ণকে ভুলে যাওয়াটাই হচ্ছে জড়।

প্রকৃতপক্ষে শ্রীকৃষ্ণ এবং তাঁর শক্তি ছাড়া আর কিছু নেই।  এই সম্বন্ধে নারদ মুনি বলেছেন, ইদং হি বিশ্বং ভগবান ইবেতরঃ– “এই জগৎ হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণ ভগবান। ” কিন্তু যারা অজ্ঞানের দ্বারা আচ্ছন্ন, তাদের কাছে এটিকে ভগবানের থেকে ভিন্ন বলে মনে হয়।  ভগবানের শুদ্ধ ভক্ত মহা-ভাগবতের কাছে জড় এবং চিন্ময়ের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।  কেননা তিনি সর্বত্রই শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন করেন।  আমরা যাকে জড় বলি, তিনি যখন তা দেখেন, তাকে তিনি শ্রীকৃষ্ণের শক্তির রূপান্তর রূপে দর্শন করেন (পরিণামবাদ)।  শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নি¤œলিখিত দৃষ্টান্তটি দিয়ে গেছেন–
স্থাবর-জঙ্গম দেখে, না দেখে তাঁর মূর্তি
সর্বত্র হয় নিজ ইষ্টদেব স্ফূর্তি ॥
কোন শুদ্ধ ভক্ত যখন একটি গাছকে দর্শন করেন, তিনি তখন মনে করেন না যে, সেটি একটি গাছ; তাঁর চোখে সেটি শ্রীকৃষ্ণের শক্তি।  এবং যখনই তিনি শ্রীকৃষ্ণের শক্তি দর্শণ করেন, তিনি শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন করেন।  তাই তিনি বৃক্ষটি দর্শন না করে শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন করেন।

আরেকটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে সূর্য ও সূর্যরশ্মি।  সূর্যরশ্মিকে দেখামাত্রই সূর্যের কথা মনে পড়ে।  তাই নয় কি ? সকাল বেলা যখন আমরা ঘরের জানালা দিয়ে সূর্যরশ্মিকে প্রবেশ করতে দেখি, তখনই আমাদের সূর্যের কথা মনে পড়ে যায়।  তখন আমরা স্থির নিশ্চিতরূপে জানতে পারি যে, সূর্যের উদয় হয়েছে, কারণ আমরা জানি যে, সূর্য ছাড়া সূর্যরশ্মি থাকতে পারে না।  তেমনই, আমরা যখনই কোন কিছু দর্শন করি, তখনই আমাদের শ্রীকৃষ্ণের কথা মনে করা উচিত, কারণ সেই বস্তুটি হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের শক্তিরই প্রকাশ।  আর যেহেতু শক্তি শক্তিমান থেকে ভিন্ন নয়, তাই যিনি শ্রীকৃষ্ণের শক্তির মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন করেন, তিনি শ্রীকৃষ্ণ ছাড়া অন্য কিছুই দর্শন করেন না।  তাই তাঁদের কাছে জড় জগৎ বলে কিছু নেই। শুদ্ধ ভক্তের কাছে সব কিছুই চিন্ময় (সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম)।

আমাদের চক্ষুকে তাই সর্বত্র কৃষ্ণ-দর্শন করার জন্য শিক্ষা দিতে হবে এবং এইভাবে শিক্ষা দেওয়ার নামই হচ্ছে কৃষ্ণভক্তি, যা হচ্ছে পবিত্র হওয়ার পন্থা।

সর্বোপাধিবিনির্মুক্তং তৎপরত্বেন নির্মলম্।
হৃষীকেণ হৃষীকেশ-সেবনং ভক্তিরুচ্যতে ॥

যখন আমরা কৃষ্ণভাবনাময় হই, তখন আমরা সব রকম মিথ্যা উপাধি থেকে মুক্ত হই; এবং শ্রীকৃষ্ণের সেবায় যুক্ত হওয়ার ফলে আমাদের দর্শন, স্পর্শন, ঘ্রাণ আদি সমস্ত ইন্দ্রিয়ের ক্রিয়াগুলি নির্মল বা পবিত্র হয়।  তখন আমরা সর্বত্রই শ্রীকৃষ্ণকে দর্শণ করতে পারি।  যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের চক্ষু নির্মল না হচ্ছে, ততক্ষণ আমরা শ্রীকৃষ্ণকে দর্শণ করতে পারি না।  কিন্তু ভগবানের সেবার মাধ্যমে যখন তা পবিত্র হয়, তখন আমরা শ্রীকৃষ্ণকে দর্শণ করতে পারি।  তখন শ্রীকৃষ্ণ ছাড়া আর কিছুই দর্শন হয় না।

মদন বা কামদেব হচ্ছেন ভগবানের বহিরঙ্গা শক্তি মায়ার চর।  কিন্তু যখন আমরা সম্পূর্ণরূপে কৃষ্ণভাবনাময় হই, তখন কামদেবের পঞ্চশর আর আমাদের হৃদয়কে বিদীর্ণ করতে পারে না।  তখন আর তা সম্ভব হয় না। আরেকটি খুব সুন্দর দৃষ্টান্ত হচ্ছেন হরিদাস ঠাকুর।  হরিদাস ঠাকুরের যৌবনকালে এক অতি সুন্দরী বারবনিতা একদিন মধ্যরাত্রে তাঁর কাছে এসে তাঁর সাথে মিলিত হওয়ার বাসনা জানায়।  হরিদাস ঠাকুর তখন তাঁকে বলেছিলেন, “হ্যাঁ, ঠিক আছে, দয়া করে এখন আপনি একটু বসুন।  আমি আপনার মনোবাসনা পূর্ণ করব, তবে আর কিছুক্ষণ আমাকে ‘হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র’ উচ্চারণ করে সংখ্যাপূর্বক নাম গ্রহণ সমাপ্ত করতে দিন।” ভেবে দেখুন। গভীর রাত্রে হরিদাস ঠাকুরের সামনে সেই অত্যন্ত সুন্দরী যুবতী এসে তাঁর সঙ্গে মিলিত হওয়ার আবেদন জানাল।  কিন্তু হরিদাস ঠাকুর একটুও বিচলিত হলেন না।  তিনি ‘হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে/ হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে’ জপ করে যেতে লাগলেন; আর তাঁর সেই নাম-জপ শেষ হল না, তাই সেই যুবতী রমণীটিও সফল হতে পারল না।

এইভাবে আমরা যখন কৃষ্ণভাবনায় মগ্ন হই, তখন কামদেবের পঞ্চশরও আমাদের হৃদয়কে বিদীর্ণ করতে পারে না।  ভক্তের কাছে তখন হাজার হাজার সুন্দরী রমণী আসতে পারে, কিন্তু তাঁদের একটুও বিচলিত করতে পারে না।  তিনি তাদের শ্রীকৃষ্ণের শক্তিরূপে দর্শন করেন।  তিনি মনে করেন, “এরা শ্রীকৃষ্ণের, এরা শ্রীকৃষ্ণের উপভোগের জন্য।”

ভক্তের কর্তব্য হচ্ছে সমস্ত সুন্দরী রমণীদের শ্রীকৃষ্ণের সেবায় যুক্ত করা।  ভক্ত কখনই তাদের ভোগ করার চেষ্টা করেন না।  ভক্ত কামদেবের বাণের দ্বারা আহত হন না।  কারণ তিনি সব কিছুই শ্রীকৃষ্ণ সম্বন্ধে দর্শন করেন।  সেটি হচ্ছে যথার্থ ত্যাগ। তিনি তাঁর নিজের ইন্দ্রিয়-সুখভোগের জন্য কোন কিছুই গ্রহণ করেন না, তিনি সব কিছুই এবং সকলকেই শ্রীকৃষ্ণের সেবায় যুক্ত করেন।  এটিই হচ্ছে কৃষ্ণভাবনামৃতের পন্থা।

Comments are closed.

August 2015
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  

Blog Stats

  • 140,963 hits